জেগে উঠলো মারাকেশের অন্তরসত্তাও। আবদুল করীম আল খাত্তাবীর রূপ ধারণ করে জেগে উঠলো। যিনি স্বাধীনতার এক অদম্য শ্লোগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তার পিতা ওকে শিক্ষা দিয়েছিলো সর্বোচ্চ শিক্ষা। সেটা হলো আইনের শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও সম্মানজনক জীবিকার দ্বার তার জন্য উন্মুক্ত হলো না। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান।
আব্দুল করীমদের বাড়ি হলো মারাকেশের স্পেনীয় এলাকায়। আইনের কোন চাকুরি না পেলেও আবদুল করীম অন্য একটা চাকরি পেয়ে গেলেন। স্পেনিশ আর্মির অফিসারদের ইংরেজির মাধ্যমে মারাকেশি ভাষা শিক্ষা দেয়া। কৈশোর থেকেই আব্দুল করীমের মধ্যে আযাদীর স্বাধীনতার সহজাত চেতনা ও উন্মত্ততা ও বিদেশী মুনিবদের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিলো। যেটা তিনি কখনো চেপে রাখতে পারতেন না।
এক দিন স্পেনিশ আর্মি অফিসারদের পড়াচ্ছিলেন। ক্লাশে স্পেনিশ সেনাবাহিনী প্রধান স্নেষ্টারও ছিলেন। এক অফিসার আবদুল করীমের বেশ কয়েকিট প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারেনি বলে আব্দুল করীম তাকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। জেনারেল স্লেষ্টার এটা সহ্য করতে পারলেন না। গোলাম হয়ে তার মুনিবদের ধমকে উঠবে? এত বড় স্পর্ধা
নিজেকে তুমি কর্মচারী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারবে না। ভদ্রতা নিয়ে কথা বলতে শিখে এসো- জেনারেল ষ্টোর যেন চাবুক মারলেন।
আব্দুল করীম মোটেও বিচলিত হলেন না। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। চোখে তীব্র চাহনি দিয়ে প্রথমে জেনারেলকে আঘাত করলেন আব্দুল করীম। তারপর উল্টো চাবুক ছুড়লেন
এর চেয়ে অসভ্যতা আর কি হতে পারে যে, তুমি তোমার শিক্ষককে ধমকাচ্ছো?
জেনারেল স্লেষ্টার তখন অকথ্য ভাষায় তাকে গালাগাল করলো। আব্দুল করীম তাকে বললেন–
স্পেনীয় অফিসাররা শুনে রাখখ, মারাকেশ মুসলমানদের দেশ। তোমাদের নয়। একদিন না একদিন তোমাদের এখান থেকে পালাতে হবে- আবদুল করীম এই বলে ক্লাশ থেকে বেরিয়ে গেলেন- আমি তোমাদের এই চাকরির ওপর অভিশাপ দিচ্ছি।
আব্দুল করীম ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেন না। জেনারেলকে তিনি যে কথা বলেছিলেন সেটা ছিলো বিদ্রোহের নামান্তর। আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে বের হতেই তাকে গ্রেফতার করা হলো এবং মামলা ছাড়াই জেলখানায় বন্দি করা হলো।
গ্রেফতারির মাত্র বিশ দিন অতিবাহিত হয়েছে। সকাল বেলা জেলখানার অফিসারদের কাছে রিপোর্ট করা হলো, আব্দুল করীম গত রাতে ফেরার হয়ে গেছেন।
আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি, আবদুল করীম জেলখানার ওই দুর্ভেদ্য প্রাচীর কি করে অতিক্রম করলো। কর্তব্যরত প্রহরী ও পুলিশদের ভয়ংকর শাস্তি দেয়া হলো। বহু জায়গায় তল্লাশি চালানো হলো। আব্দুল করীমের ছায়াও কেউ মাড়তে পারলো না। এমনকি তিনি কি করে জেলখানা থেকে ফেরার হলেন তাও বহু তদন্ত করে বের করতে পারলো না। কারণ, সেই জেলখানা থেকে কোন কয়েদীর পালানো একেবারেই অসম্ভব ছিলো।
আব্দুল করীমের ব্যাপারে সংবাদ পাওয়া গেলো, এক পাহাড়ি এলাকায় স্বাধীনতাকামীদের হেড কোয়ার্টার ও ট্রেনিং ক্যাম্প বানিয়েছেন। কিন্তু সে পাহাড়ি এলাকা কোনটা সেটা কেউ খুঁজে বের করতে পারলেন না।
আব্দুল করীম গোপন আন্দোলনের এমন চমৎকার নকশা তৈরী করলো যে, অল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য মুজাহিদ তার ঝাণ্ডা তলে সমবেত হয়। ফ্রান্সী ও স্পেনীয়দের অসহনীয় জুলুম নির্যাতন মুসলমানদের জেগে উঠতে বাধ্য করে। বিশেষ করে দুই দখলদার বাহিনীর ফৌজদের জনসাধারণের সঙ্গে ছিলো হিংস্র জানোয়ারের মতো আচরণ।
মারাকেশের মুজাহিদদের একটা দুর্বলতা ছিল। সেটা হলো- তাদের কাছে অন্ত্রভাণ্ডার ছিলো না। অথচ একই সঙ্গে স্পেন ও ফ্রান্সীদের মতো দুই পরা শক্তির সঙ্গে তাদের লড়তে হচ্ছিলো। এদিকে ফ্রান্সীরা বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচার করে দিয়েছে, মারাকেশের আসল শাসন ক্ষমতা মারাকেশি মুসলমানদের হাতেই রয়েছে। ফ্রান্সী ফৌজ শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় মারাকেশের শাসন শৃংখলা অক্ষুণ্ণ রাখার কাজে সহায়তা করছে। কারণ, বিপথগামী কিছু বেদুইন গোত্র বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে।
এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডার জবাব দেয়ার মতো কোন কিছুই ছিলো না মারাকেশিদের হাতে। পুরো খ্রিষ্ট জগতই তখন তাদের বিরুদ্ধে। ক্রুসেড়ে সালাহ উদ্দিন আইয়ূবির কাছে পরাজিত হওয়ার বদলা নিচ্ছিলো খ্রিস্ট জগত।
আব্দুল করীম তার সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধার দলে সব রকম বৈচিত্ৰই আনার চেষ্টা করছিলেন। তাই তিনি তার দলের মধ্য থেকে একদল গুপ্তচরও তৈরী করেন। এক বছরের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের এক সেনা বাহিনী দাঁড়িয়ে যায়। তবে অস্ত্রবিহীন বাহিনী। অস্ত্র সংগ্রহ তাই জরুরী ছিলো। যার একমাত্র মাধ্যম ছিলো, ছোট ছোট ফৌজি চৌকিগুলোর ওপর নৈশ হামলা চালানো। আর এজন্য জানবার্য বাহিনীর প্রয়োজন ছিলো। মুজাহিদরা প্রস্তুত হয়ে গেলো জানবাযির জন্য।
এক গুপ্তচর আবদুল করীমকে সংবাদ দিলো, স্পেনিশ জেনারেল ষ্টোর অমুক দিন অমুক ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছেন। সে ক্যাম্পে রয়েছে এক হাজার সৈন্য এবং সব ধরনের আধুনিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ।
এ ধরনের শক্তিশালী বাহিনীর ওপর দিনের বেলা হামলা করা আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আব্দুল করীম জেনারেল ষ্টোরের নাম শুনতেই তার রক্তের মধ্যে বিপুল আলোড়ন অনুভব করলেন। তার ভেতর জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের আগুন। সেই তো আব্দুল করীমকে অন্যায়ভাবে জেলে ভরে ছিলো। সব মুজাহিদকে এক জায়গায় একত্রিত করে ঘোষণা দিলেন, ক্যাম্পে এই জেনারেল থাকতে থাকতেই হামলা করতে হবে। আর এই জেনারেলকে মেরে ফেলতে পারলে স্পেনীয়দের পা উপড়ে যাবে।
