মা! আমি শুনেছি তোমরা যা বলছিলে- আমার মা বললেন, তুমি যদি আমাকে আপন মনে করে থাকো তাহলে তোমাকে আমি একটা পরামর্শ দেবো।
জি খালাম্মা বলুন আপনার পরামর্শ আমি মেনে নেবো- মারকোনী বললো।
তাহলো মা তোমার মনে যেহেতু একবার মুসলমান হওয়ার বাসনা জেগেছিলো তাই সেই কল্যাণময়, বাসনাটি পূরণ করে ফেলল। মনে রেখো, শামসের সঙ্গে তোমার ভালোবাসা উপলক্ষ ছিলো, কিন্তু তোমার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তোমার মধ্যে তার মহান মায়ের প্রতিচ্ছবি অংকিত করে দিয়েছেন। যে মা কওমের জন্য গর্বিত এক মা উপহার দেবে।…
মারকোনী মা! তোমাকে আমি বিধবা থাকতে দেবো না। তোমাকে শামসের বউ করে আমার ঘরে নিয়ে আসবো। তুমি শামসের সংগ্রামী জীবনের সহযোদ্ধা হতে রাজী? মারকোনী এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। পরম আবেগে আবার মার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
বিজয় কত দূর
বিজয় কত দূর
১৯২২ সাল। মারাকেশ তখন গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ এক রাষ্ট্র। এক দেশের গোলাম নয়। দুই দেশের গেলাম। মারাকেশের এক অংশের দখলদার স্পেনিশরা। অন্য অংশের দখলদার ফ্রান্সীরা। ফ্রান্সীদের দখলেই ছিলো বেশির ভাগ অংশ।
১৯২২ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। মারাকেশের স্পেনীয় এক এলাকায় এক সেনা ক্যাম্প ছিলো। ক্যাম্পে সৈন্যসংখ্যা ছিলো হাজারখানেক। স্পেনিশ জেনারেল সেলিষ্টার সেদিন ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। জেনারেলের আগমন উপলক্ষে পুরো ক্যাম্প জুড়ে সাজ সাজ রব। প্রত্যেক সৈনিক ও প্রতিটা জিনিস জেনারেলের সামনে পরিদর্শিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
জেনারেল সেসিষ্টার ক্যাম্প পরিদর্শন করছিলেন। আচমকা ক্যাম্পে চিৎকার চেঁচামেচি আর হৈ হৈ রোল উঠলো। মুহূর্তেই তা কেয়ামতের বিভীষিকার রূপ নিলো। আসলে ক্যাম্পে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। হামলাকারীরা হলো মারাকেশের মুজাহিদরা। সংখ্যায় তারা স্পেনিশ ফৌজের দশভাগের এক ভাগ। তাদের অস্ত্র হলো, লাঠি, তরবারি, বর্ষা ও খঞ্জর। এসব দিয়ে তারা এমন ফৌজের ওপর হামলা করলো যাদের কাছে আছে দূর পাল্লার রাইফেল, মেশিনগান, হাত বোমা, পিস্তল ও তোপ কামান।
মুজাহিদদের হামলা যেমন আচমকা ছিলো তেমনি ছিলো তীব্র আর অপ্রতিরোধ্য। এই হামলায় সবচেয়ে বড় যে হাতিয়ার ব্যবহৃত হচ্ছিলো সেটা হলো স্বাধীনতার তীব্র আকুতি ও মুক্তির দৃঢ় অঙ্গিকার। এই জযবা ও চেতনাদীপ্ত হামলা এতই শক্তিশালী ছিলো যে, অধিকাংশ স্পেনিশ সেনা অফিসার মারা গেলো বা যখমী হলো। অল্প কিছু পালাতে পারলো। সৈনিকদের মধ্যে দেড় দুইশ পালাতে পারলো। প্রায় সাতশর মতো মারাত্মকভাবে হলো আহত। বাকিরা সব মারা গেলো। মুজাহিদরা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র গনীমত হিসেবে পেলো। তারপর তাদের গোপন ক্যাম্পে ফিরে গেলো।
এ ছিলো মারাকেশের মুজাহিদদের প্রথম হামলা। তাদের নেতা ছিলো গুমনাম এক লোক। যে নাকি পরবর্তীতে সারা দুনিয়ায় বীর আবদুল করীম নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ফ্রান্স ও স্পেনের ফৌজরা তার নাম শুনলে কেঁপে উঠতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চার বছর পূর্বে নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাত দিয়ে ফ্রান্সী ফৌজ মারাকেশে প্রবেশ করে। ধোঁকা প্রতারণা আর ষড়যন্ত্র করে এবং ফৌজি শক্তি খাঁটিয়ে মারাকেশের বড় একটি অংশ দখল করে নেয়। স্পেনিশরাও এভাবে জবর দখল চাপিয়ে মারাকেশের কিছু অংশ দখল করে নেয়। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স আলজাযারের সঙ্গে মারাকেশকেও নয়া প্রদেশ বানিয়ে ফেলে। নিজেদের সেনা সংখ্যাও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে সেখানে। এভাবে মারাকেশে তারা ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের উদ্বাস্তু লোকদের আমদানী করতে থাকে। আরেকদিকে স্পেনিশরাও সমান হারে স্পেনিশ নাগরিকদের মারাকেশে আবাদ করতে থাকে।
এই দুই জবরদখলকারী সাম্রাজ্যবাদীদের জাতাকলে পড়ে মুসলমানরা নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসলো। তারা বেঁচে থাকার সব উপকরণ যেন মুসলমানদের জন্য হারাম করে দিলো। এই দুই অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদী দেশের উদ্দেশ্য ছিলে একটাই। সেটা হলো, মারাকেশকে যেন বিশ্বের কেউ মুসলমান রাষ্ট্র বলতে না পারে।
ফ্রান্সের কমান্ডার ছিলেন জেনারেল লাইটে। যিনি ছিলেন বিশ্ব স্বীকৃত চালবাজ। তিনি মারাকেশের মুসলমানদের গোলাম বানানোর জন্য সেই পুরনো ফর্মুলাই কাজে লাগান যা ইংরেজরা উপমহাদেশে দখলের সময় আবিষ্কার করেছিলো। সে হলো, জেনারেল লাইটে মারাকেশের নেতৃস্থানীয় মুসলমান যারা বিভিন্ন গোত্র ও এলাকার প্রধান ছিলেন। তাদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ ও হিংসা-বিদ্বেষ উস্কে দিলো এবং প্রত্যক্ষ শত্রুতার অবস্থা সৃষ্টি করে জাতিগত ঐক্য ধ্বংস করে দিলো। তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতাধর ছিলো তাদেরকে দিলো অঢেল সম্পদ। কাউকে কাউকে দেয়া হলো জায়গীর। আর সাধারণ লোকদের দুবেলার রুটি খাওয়ার অধিকারও ছিনিয়ে নিলো।
এ অবস্থায় যেকোন দেশ-জাতি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য রুখে দাঁড়ায়। লড়াই করে। কিন্তু মারাকেশের বেলায় ঘটলো উল্টো ব্যাপার। মনে হচ্ছিলো, এদেশ থেকে স্বাধীনতার সামান্য অনুভূতিও মুছে গেছে। যেন গোলামির শিকলকে ফুলের মালা বলে গলায় ধারণ করে নিয়েছে।
জীবন্ত এক জাতি সত্বা সন্তানরা মরে যায় কিন্তু জাতির ঐতিহ্য কখনো মরে না। জীবন্ত থাকে জাতির অন্তর-সত্তা। যা কোন এক মানবের রূপ ধারণ করে জেগে উঠে।
