আমার পনের জন সঙ্গীর মধ্যে শহীদ হলো আট জন। কয়েকজন যখমী হলো। এর মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন। রাতে আমরা লাশ উঠিয়ে আমাদের আস্তানায় ফিরে গেলাম। গনীমত হিসেবে ফ্রান্সীদের কিছু অস্ত্র আমরা পেলাম।
***
সাত আট দিন পর ভিখিরীর বেশে আমার মাকে দেখতে গেলাম, মা আমাকে জানালেন, মারকোনীর স্বামী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেছে। সে খুবই শোকাহত। মাকে জানালাম না যে মারকোনী আমার হাতেই বিধবা হয়েছে। মাকে বললাম, তিনি যেন যে কোন ছুতোয় মারকোনীকে এখানে নিয়ে আসেন।
কোন ছুতো বা বাহানা লাগলো না। আমার আমার কথা শুনতেই মারকোনী আমাদের বাড়িতে চলে এলো। মারকোনীকে আমি অন্য এক কামরায় নিয়ে গেলাম। মারকোনী খুবই বেদনাহত ছিলো। চোখ দুটি ছিলো ফোলা ফোলা।
মারকোনী! আমি ওকে বললাম- আমার জাতির দেয়া দায়িত্ব আমি পালন করেছি। যার কারণে তুমি বিধবা হয়ে গেছে। তোমার স্বামী আমার গুলির নিশানা বনে গেলো। না … কিছুই করার ছিলো না … এছিলো আমার দেশের প্রতি দায়িত্ব বোধের প্রতিফলন। এখন আমি ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ঋণ আদায় করতে চাই- আমি আমার কাপড়ের ভেতরে লুকানো পিস্তলটি বের করলাম এবং সেটা মারকোনীর দিকে বাড়িয়ে দিলাম- এই নাও। তোমার স্বামীর খুনের বদলা নাও। তোমাকে আমি এজন্যই ডেকেছি। তোমার অনুগ্রহের বদলা তো আমি দিতে পারবো না। অবশ্য আমার জানটা দিয়ে দিতে পারবো।
পিস্তল নিয়ে মারকোনী যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো। শূন্য চোখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। মারকোনীর এ দৃষ্টির সামনে আমি যেন হতবাক হয়ে গেলাম। কতক্ষণ এ অবস্থায় রইলো মনে নেই। হঠাৎ মারকোনী আমার চুলির মুঠি ধরে ঝাঁকাতে লাগলো। কিছুক্ষণ এভাবে ঝাঁকিয়ে ছেড়ে দিলো। তারপর কাঁদতে লাগলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
হায় শামস্! কাঁদতে কাঁদকে বললো মারকোনী- আমি কত বড় ত্যাগ স্বীকার করলাম আর তুমি? অবশ্য আমার ব্যাপার তো ব্যক্তিগত। আর তোমার? তোমার জাতীয় ব্যাপার, দেশের ব্যাপার।
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, মারকোনী কি বলতে চায়।
মারকোনী! তুমি কি বলছো, আমি বুঝতে পারছি না- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
শামস! তুমি বিশ্বাস করো আর নাই করো, আমি আজ সত্য বলতেই এখানে এসেছি। মারকোনী কান্নাসিক্ত কণ্ঠে বলে গেলো, শামস! তুমি আমার খেলার সাথী, স্কুলের সাথী, সুখে দুঃখে সবসময় আমরা পরস্পরের একান্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ছিলাম। তোমাদের বাড়ির বারান্দা মনে হতো আমাদের। তোমারও হয়তো এমনই অনুভূতি ছিলো। এমন ঘনিষ্ঠতার মধ্যে যে দুটি ছেলে মেয়ে বড় হলো তাদের মধ্যে কি হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক আরো পাকাপোক্ত হয় না। অর্থাৎ, বুঝার মতো বয়স হবার পর অনুভব করলাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি …।
তুমিও কি আমাকে ভালোবাসনি তুমি মুসলমান আমি খ্রিস্টান ধর্মের দেয়ালের এ বাঁধা আমার কাছে তেমন কিছু ছিলো না। তোমাকে নিয়ে যখন স্বপ্ন দেখা শুরু করি তখনোই সিদ্ধান্ত নিই, যে কোন সময় আমি মুসলমান হয়ে তোমার ঘরে চলে আসবো …।
কিন্তু বিধি বাম। তোমার আব্বা এর মধ্যে বিদ্রোহী হিসেবে ধরা পড়ে গেলেন। তার পর হলেন ফেরারী। এর পরই তোমাদের বাড়ি রেইড হলো। আমার স্বামী সার্জেন্ট ডোনাল্ড তোমাকে গ্রেফতার করার সব রকম প্রমাণাদি নিয়েই এসেছিলো। আমার বাবাও আমার তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে সেদিন তাকে নিরস্ত্র করা গেলেও তার আসল মিশন কিন্তু ছিলো তোমাকে গ্রেফতার …।
তুমি নিশ্চয় ডোনাল্ডকে আমাদের বাড়িতে যেতে দেখেছিলে। সে তোমার প্রতি আমার মনোভাব বুঝতে পারে এবং আমাকে একা পেয়ে বলে, কোন মেয়ে এমন ছেলেকে ভালোবাসতে পারে যে নাকি এক দেশদ্রোহীর ছেলে, ঐ ছেলে নিজেও দেশদ্রোহী। সবরকম প্রমাণ আমার হাতে দিয়েই তাকে গ্রেফতার করার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে। তোমরা যতই ছাফাই গাওনা কেন জাত সাপ আমরা চিনি। তাকে গ্রেফতার করা মানেই হলো, মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া … তবে আমি তাকে বাঁচাতে পারি এক শর্তে।
বলুন কী শর্ত আমি বলে উঠি।
আমাকে বিয়ে করতে হবে, না হলে তোমার বাবাকেও বিদ্রোহী হিসেবে জেলে পুরা হবে এবং তোমাকে এখন জোর করে আমি বিয়ে করবো।
সত্যি বিশ্বাস করো শাম! মারকোনী আবার ফুঁপিয়ে উঠলো- আমার রাজি হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। ডোনান্ডের সঙ্গে বিয়েতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে যদি তোমাকে ও বাবাকে বাঁচানো যায় তাহলে বিয়েই তো আমার শেষ ও তোমাদের বাঁচার পথ। কিন্তু ডোনাল্ড আমাকে সত্যিই ভালো বেসেছিলো। প্রথম দিকে ওকে আমি ঘৃণাই করতাম। ওর নিখাদ ভালোবাসার কারণে আমি ক্রমেই ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম …।
শামস! আমি সেটাই বলছিলাম। তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি আমার ভালোবাসাকে বিসর্জন দিতে পারলাম। আর তুমি আমার বিধবা হওয়ার কথাটাও চিন্তা করতে পারলে না! মারকোনী! আমি বললাম- তুমি জানো, যুদ্ধের ময়দানে পিতা পুত্রও যদি মুখোমুখি হয় তখন আর পিতা পুত্রের সম্পর্কের কথা মনে থাকে না বা থাকতে নেই। যদি সেই সম্পর্ক বা সূত্র বড় হয়ে দাঁড়ায় তখন সে হয় তার স্বজাতির সঙ্গে বেইমানী করা এক মুনাফিক।…
হ্যাঁ, আমি জানি শামস্! তোমার করার কিছুই ছিলো না।
এ সময় আমার মা কামরার ভেতরে ঢুকে মারকোনীকে জড়িয়ে ধরলেন। মারকোনী মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ফুপাতে লাগলো।
