আমরা যে যেখানে ছিলাম উপযুক্ত আড়াল দিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। বোম্বারটি এত নিচ দিয়ে উড়ে গেলো যে, আমরা রাইফেলের গুলিতে বিমানটি ফেলে দিতে পারতাম। বিমানটি আবার ফিরে এলো। তারপর আমাদের পজিশনের ওপর দিয়ে কয়েকবার চক্কর কেটে যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে ফিরে গেলো। বিমানটি আসলে এসেছিলো কয়েদী গাড়িগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত কিনা তা দেখার জন্য। আমাদের জন্য এটা ছিলো দুঃসংবাদ। আমাদের নড়াচড়ার কারণে আমাদেরকে যদি দেখে ফেলে তাহলে সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
ইদানিং ফ্রান্সীদের চৌকিগুলোর ওপর মুক্তিযোদ্ধা- মুজাহিদদের হামলা এত বেড়ে গেছে যে ফ্রান্সীরা সৈন্যদের হেফাজতে যুদ্ধ বিমান ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে।
বিমান ফেলার মতো কোন অস্ত্র আমাদের ছিলো না। এ ক্ষেত্রে আমরা নিরস্ত্র ছিলাম। কিন্তু আমাদের অস্ত্র ছাড়াই লড়তে হবে। আমাদের কমাণ্ডার বলতেন, মুসলমান লড়াই করে ঈমানের জযবায়। আর এতো কুফর ও ইসলামের লড়াই।
আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে এক মাইল দূর পর্যন্ত সড়ক দেখা যায়। আমি সেদিক তাকিয়ে রইলাম। কয়েদীদের প্রথম গাড়িটি আমার নজরে পড়লো। টিলায় অবস্থিত আমাদের ঘাটি থেকে আমার বাবার চিৎকার শোনা গেলো, খবরদার … গাড়ি অনেকগুলো।
অর্থাৎ কয়েদীদের গাড়ির সংখ্যা বেশি। কয়েদী গাড়ি আমরা দেখলেই চিনতে পারতাম। এগুলো লোহার গ্রিল দেয়া থাকতো। এতে ফায়ার করার সময় আমাদের সাবধানে থাকতে হতো। না হয় কয়েদীদের গায়ে গুলি লাগার সম্ভাবনা ছিলো।
খবরদার ওপরে জঙ্গি বিমান- আমাদের কমাণ্ডারের সতর্কবাণী শোনা গেলো। গাড়িগুলো কমপক্ষে ষাট মাইল স্পিডে আমাদের পজিশনের কাছাকাছি এসে গিয়েছিলো। এর মধ্যে একটি বোম্বার গাড়িগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে গেলো। আমি সামনের গাড়ির ড্রাইভারকে টার্গেট করা শুরু করে দিলাম। একশ গজ দূরত্বে থাকতেই আমি ট্রিগারে আঙ্গুলের চাপ বাড়ালাম। গাড়ির স্ক্রীন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যেতে দেখলাম আমি। গাড়ি এগিয়ে গেলো। আমি ক্ষিপ্রগতিতে গুলি করে টায়ার দুটি ফাটিয়ে দিলাম। এর সঙ্গে সঙ্গেই আমার অন্য সঙ্গীরাও ফায়ারিং শুরু করে দিলো।
সামনের গাড়িটি হঠাৎ ডান দিকে ঘুরলো এবং উল্টে গেলো। গাড়িটি সড়কের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে পড়াতে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলো। কয়েদীদের গাড়ি শুধু দুটি। আর বাকী চারটি ছিলো গার্ডদের। গার্ডরা সংখ্যায় ছিলো আশি নব্বই জন। প্রত্যেকের কাছে মেশিনগান ছিলো। আর আমরা মাত্র পনের জন। উল্টানো গাড়িটি ছিলো গার্ডদের। গাড়ি উল্টাতেই ওপর থেকে আমাদের ষ্টেনগানগুলো গাড়ির ওপর গুলি বৃষ্টি শুরু করে দিলো। একজন গার্ডকেও উঠতে দিলো না।
অন্য গাড়ির গার্ডরা এবার জবাব দিতে লাগলো। পজিশন আমাদের সুবিধাজনক হলেও জঙ্গি বিমান আমাদের পজিশনের সুবিধা নিতে দিলো না। গার্ডরা হয়তো ওয়ার্লেস দিয়ে বিমানের পাইলটকে জানিয়ে দিয়েছিলো তারা আক্রান্ত হয়েছে। বোমার বিমানটি গোত্তা খেয়ে আমাদের পজিশনের কাছাকাছি এসে মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করে গেলো। বিমান এসেছিলো দুটি। দুটোই কোন বিরতি না দিয়ে ফায়ার করে গেলো। আমাদের মনোযোগ তখন ছিলো নিচের দিকে। কিন্তু বোম্বারের বার বার ফায়ারের কারণে আমাদের পজিশন দুর্বল হয়ে গেলো। বিমান আসলেই আমরা লুকিয়ে পড়তাম। এই সুযোগে পুলিশরা সুবিধাজনক পজিশন বেছে নিতে পারতো। এ ভাবে অনেক ফ্রান্সী পুলিশ টিলার ভেতর ঢুকে পড়লো।
আমি আমার পজিশন পাল্টে একটু ওপরে চলে গেলাম। দুই টিলার মাঝখানে দুই ফ্রান্সীকে দেখতে পেলাম। আমার পজিশন ওদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো না। অস্তমিত সূর্যের ক্ষীণ আলোতেই ওদের একজনকে আমি চিনতে পারলাম। সে হলো মারকোনীর স্বামী সার্জেন্ট। তার হাতে স্টেনগান। টিলার গা ঘেষে আসছিলো। আমি সহজেই রাইফেল দিয়ে টার্গেট করতে পারলাম।
আমি তোমাকে ধোকা দেবো না- আচমকা মারকোনীর আওয়াজ আমার কানে ভেসে এলো- তুমি সত্য পথেই আছে। তাই তোমাকে আমি ধোকা দিতে চাই না।
আমার আঙ্গুল রাইফেলের ট্রিগার থেকে সরে গেলো। মারকোনী সত্যিই আমাকে ধোকা দেয়নি। সে রাতে যদি ও আমাকে আমাদের বাড়িতে পুলিশি রেডের কথা না জানাতো, তাহলে আমার বাবা ধরা পড়ে যেতেন। আমাদের বাড়ি থেকে একটি পিস্তল ও দুটি খঞ্জর উদ্ধারের অভিযোগে আমাকেও জেলের ভয়ংকর কারেন্ট সেলে নিয়ে ভরতো।
আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, আমি কি মারকোনীকে বিধবা বানিয়ে দেবো, না তার অনুগ্রহের বদলা দেবো। সহসাই আমার মনে পড়ে গেলো আমার প্রিয় দেশবাসীর হতভাগা বিধবাদের কথা। যাদের স্বামীদেরকে ফ্রান্সীরা নির্বিচারে শহীদ করছে। অবশ্য আলজাযায়েরের প্রতিটি ঘরের প্রত্যেক বধূই বিধবা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে।
আমরা আঙ্গুল ট্রিগারের ওপর চলে গেলো। আমি আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে ট্রিগার টিপে দিলাম। মারকোনীর স্বামী সার্জেন্ট তীরের মতো হয়ে গেলো। তারপর একদিকে পড়ে গেলো। দেরী না করে সার্জেন্টের সঙ্গীকেও আমি জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলাম।
কয়েদীদেরকে আমরা ছাড়াতে না পারলেও ত্রিশ পঁয়ত্রিশজন ফ্রান্সীকে মারতে পেরেছি। বাকিরা কয়েদীদের গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছে। বোম্বার বিমান চলে গিয়েছিলো। কিন্তু আবার উড়ে আসতে দেখা গেলো। তবে সাঝের আঁধার আমাদেরকে লুকিয়ে ফেললো। টার্গেট করার মতো কাউকে না পেয়ে বিমান চলে গেলো।
