***
এর মাসখানেক পর ঐ সার্জেন্টের সঙ্গে মারকোনীর বিয়ে হয়ে গেলো। তত দিনে আমি লুকিয়ে ছাপিয়ে মোটামুটি ফৌজি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়েছি। আরো সপ্তাখানেক পর মারকোনী তার স্বামীর সংসারে চলে গেলো।
এক রাতে আমার বাবা আবার সেই ভিখিরীর বেশে এলেন। তিনি মাকে বললেন,
আমি তোমার শাসকে নিয়ে যাচ্ছি। ওকে খোদা হাফেজ বলল। কখনো কখনো আমার মতোই এসে দেখা করে যাবে।
মার দুচোখ ভরে অশ্রু নেমে এলো। ফুপানির অস্ফুট শব্দ শুনতে পেলাম। আমাকে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। আমার মুখে গালে চুমো খেলেন। তারপর কান্নাভেজা কন্ঠে বললেন
তুমি যদি শুধু আমার সন্তান হতে তোমাকে আমি কোথাও যেতে দিতাম না। কিন্তু তুমি মহান এক জাতির সন্তান। মুসলমান মেয়েরা তাদের সন্তানদের নিজেদের অধিকারভুক্ত কোন সম্পত্তি মনে করে না। তাদের সন্তানরা তো আল্লাহ তাআলার আমানত… যা বেটা! আল্লাহর দরবারে আমি আমার সন্তানকে সোপর্দ করছি।
চেষ্টা সত্ত্বেও চোখের অশ্রু আমি আড়াল করতে পারলাম না। বাবাও ধরা গলায় আমার মাকে বললেন
কোন পুলিশ এসে ওর কথা জিজ্ঞেস করলে তুমি কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। আর বলবে আমার ছেলে পালিয়ে গেছে।
বাবার সঙ্গে আমি বেরিয়ে পড়লাম। শহর থেকে বের হলাম লুকিয়ে ছাপিয়ে। শহর থেকে মাইল খানেক দূরে অন্ধকারের মধ্যে এক লোক দুটি উট নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তিনি ছিলেন আমার বাবার কোন এক সহযোদ্ধা। একটি উটে বাবা ও আমি সওয়ার হলাম। আরেক উটে সে লোক সওয়ার হলো। তারপর আমরা সেই মনযিলের দিকে রওয়ানা হলাম আজ যেদিকে আমি আশ্রয় গ্রহণ করেছি।
মাঝ রাতের পর আমরা এমন এলাকায় পৌঁছলাম যেখানে মাটি ও বালির উঁচু উঁচু বেশ কিছু টিলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছু টিলা মোটা স্তম্ভের মতো চৌকোণা। কিছু মোটা দেয়ালের মতো। আবার অনেকগুলোর আকৃতি এমন যেন প্রাচীন কোন মহলের ধ্বংসাবশেষ। উট এগুলোর মাঝখান দিয়ে ঘুরে ঘুরে, ঘন ঘন মোড় বদল করে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। সেখানে দুটো ল্যাম্প জ্বলছে। অনেকগুলো মানুষ বসে গল্প গুজব করছে।
আমার সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পর এক লোক আমার হাতে কুরআন শরীফ দিয়ে এই শপথ নিলো
আমি মহান আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে কসম করছি, আমার মাতৃভূমি আলজাযায়েরের জন্য কোন ধরনের আত্মত্যাগ থেকে পিছপা হবো না। হোক এই ত্যাগ আমার প্রাণের।… আর আমি এই পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে কসম করছি যে, আমি শত্রুদের অত্যাচারের চাপে কোন তথ্য ফাঁস করবো না। কয়েদী হলে সব রকম কষ্ট নির্যাতন সহ্য করবো; কিন্তু নিজের সঙ্গীদের কোন সন্ধান দেবো না।
এ ছিলো এমন এক অঙ্গীকার যা আমার বয়সের চেয়ে আমাকে আরো পরিণত করে তুললো। আমি যে এক অফিসারের ছেলে ছিলাম। ফ্রান্সী স্কুলে লেখাপড়া করেছি এসব আমি ভুলে গেলাম। নিজের প্রতি আমি নিজে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠলাম।
দুতিন দিন পর থেকে আমাকে দুশমনের গুপ্ত বাহিনীর ওপর হামলা করার ট্রেনিং দেয়া হতে থাকে এমনভাবে, যেমন বাঘ তার বাচ্চাকে শিকার ধরার টেনিং দিয়ে থাকে। ফ্রান্সীরা মরুর কোথাও কোথাও চৌকি বানিয়ে রেখেছে। যেগুলো মাটির দেয়াল ঘেরা ছোট ছোট কেল্লার মতো। আমরা সেগুলোর ওপর ফায়ার করতাম। ঐ সব চৌকিতে আমরা ফায়ারিং করতাম। চৌকিগুলোতে সৈন্যদের রেশনবাহী ট্রাক যেতো। আমরা ট্রাকে হামলা করে রসদ পৌঁছানোতে বিঘ্ন ঘটাতাম।
এ পর্যন্ত আমি বেশ কয়েকটি নৈশ হামলায় অংশ নিয়েছি। তিনবার ভিখিরীর বেশে মার সঙ্গে সাক্ষাত করে এসেছি। শহরে উপশহরে এবং গ্রামে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি থাকলেও আমাদের কেউ মারা গেলে আমরা শহীদদের তাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে পাঠাতাম না। মরু ভূমিতেই দাফন করে দিতাম। কারণ, আত্মীয়স্বজনের কাছে লাশ পাঠালে ফ্রান্সী পুলিশ তাদেরকে হয়রানীর মধ্যে ফেলতো।
কয়েকটি গেরিলা যুদ্ধে আমি অংশগ্রহণ করেছি। একদিন গুপ্তচরের মাধ্যমে খবর এলো, কিছু কয়েদীকে জেল থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েদীদের সবাই মুক্তিযোদ্ধা। কমপক্ষে তিনটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হবে কয়েদীদের। জেল থেকে গাড়িগুলো রওয়ানা হবে সন্ধ্যার আগে।
আমাদের লিডার সেই গাড়ির ওপর হামলা করার জন্য আমাকেও তালিকাভুক্ত করেছেন। জানতে পারলাম আমার বাবাও এই কমাণ্ডে দলে আছেন। তিনিই আমাকে দলে নিয়েছেন। পনের জনের ছোট একটি গেরিলা দল। যে পথ দিয়ে কয়েদী গাড়িগুলো যাবে তার দুপাশে ছোট পাহাড়। কাছেই ছিলো দুটি গ্রাম।
সময় মতোই আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেলাম। কমাণ্ডার আমাদেরকে পজিশনে বসিয়ে দিলো। এম্বুশের জন্য এলাকাটি দারুণ ছিলো। টিলার চড়াই উত্রাই এবং চূড়া খুব চমৎকার ছিলো লুকানোর জন্য। তবে গাছ ছিলো না একটাও। আমার বাবা আমাকে এমন পজিশনে বসিয়ে দিলেন যেখান থেকে সড়ক খুব নিকট থেকে দেখা যায়। আমার কাজ ছিলো, সামনের গাড়ির ড্রাইভারকে গুলি করা। গুলি লক্ষভ্রষ্ট হলে গাড়ির টায়ারে ফায়ার করতে হবে। আমার কাছে ছিলো দূরপাল্লার রাইফেল। অন্যদেরও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয়া হয়ে গিয়েছিলো।
মরু অঞ্চলের এই সড়কটি টিলার ওপর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত। পনের বিশ মিনিট পর দূর থেকে গুরু গম্ভীর গুঞ্জন শোনা গেলো। আওয়াজটি খুব দ্রুত কাছে চলে আসছে। এটা যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ। দূর থেকে দেখা গেলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটা বোম্বার বিমান খুব নিচু দিয়ে আসছে। আমাদের কমাণ্ডারের চিৎকার শোনা গেলো- লুকিয়ে পড়ো।
