আমার মা আমার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন।
এর তিন মাস পরের কথা। একদিন মারকোনী আমাদের ঘরে এলো। সার্জেন্টের আনাগোনার পর থেকে মারকোনী আমাদের বাড়িতে খুব কমই আসতো। আগে তো তার দিন রাত আমাদের এখানেই কাটতো। মারকোনী এসে আমাকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলো
তোমাদের ঘরে বিপদজনক কিছু নেই তো? … মানে কোন অস্ত্রট বা ইমোনেশন?
আমাদের বাড়িতে এসব কোত্থেকে আসবে? আমি কিছুটা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে বললাম।
শামস! মারকোনী যেন অনুনয় করলো- আমার কাছে কোন কিছু গোপন করার চেষ্টা করো না। আমি যা বলছি সত্য বলছি এবং তোমার ভালো চাই বলেই বলছি। এতে তোমার মারও সম্মান নিহিত রয়েছে। আমি জানি তুমি কি করছো?
মনে হচ্ছে ফ্রান্সী সার্জেন্ট তোমার আপাদ মস্তকই পাল্টে ফেলেছে আমি বিদ্রূপ করে বললাম- শেষ পর্যন্ত তুমি গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিয়েছে।
শামস! সে আমাকে একটা ঝটকা দিয়ে বললো- আমি সত্যিই গোয়েন্দাগিরি করছি। আমি গোপন একটি তথ্য দিতে এসেছি। আজ রাতে তোমাদের বাড়িতে পুলিশ রেড করবে। ঘরে যদি এমন কিছু থেকে থাকে তা মাটির নিচে দাবিয়ে দাও। অথবা আমার কাছে দিয়ে দাও। না হয় কোথাও গায়েব করে দাও।
মারকোনী চলে গেলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মারকোনীর কথা বিশ্বাস করা উচিত কি না তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম। মাকে জানালাম। মা বললেন, কোন অমুসলিম মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। ইউরোপের কোন লোকের ওপরই ভরসা করা যায় না। আসলে মারকোনী জানতে এসেছিলো আমাদের বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র কিছু আছে কিনা।
তবুও আমাদের ঘরে দুটি খঞ্জর ছিলো। ফ্রান্সীদের আইনে এটা রাখাও অপরাধ। এছাড়া ছিলো ৩২ কিলোবোর এর একটি পিস্তল। যার মেগাজিনে এক সঙ্গে এগারটি গুলি ভরা যেতো। দশ-বার দিন আগে পিস্তলটি আমাদের ঘরে আসে। আমার মার জানাশোনা এক লোক এটি নিয়ে এসে ছিলো। এটা না কি আমার বাবা আমার জন্য পাঠিয়েছিলেন। বাবার জীবন কাটছে এখন মরুর ধূলিকণার মধ্যে।
***
মারকোনী যেদিন আমাকে সতর্ক করতে এসেছিলো সেদিন সন্ধ্যাতেই অতি নোংরা কাপড়ের এক ভিখিরী আমাদের দরজায় এসে হাক ছাড়লো। আমি দরজা খুলতেই তিনি আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তার লম্বা দাড়ি ও চুল থেকে বিকট গন্ধ আসছিলো। কাপড়ও দুর্গন্ধযুক্ত এবং শত স্নি। আমি তাকে বাধা দিতে চাইলাম। কিন্তু তিনি ভেতরের কামরায় ঢুকে পড়লেন এবং হো হো করে হেসে উঠলেন।
যদি নিজের ছেলেও আমাকে চিনতে না পারে তাহলে ফ্রান্সী পুলিশের বাপেরও সাধ্য নেই যে আমাকে চিনবে- হাসতে হাসতে বললেন তিনি তাহলে আমার ছদ্মবেশ ভালোই হয়েছে।
আপনার এখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত নয়- আমি বাবাকে বললাম।
ফ্রান্সী সার্জেন্টের ঘটনা ও মারকোনীর সঙ্গে তার নতুন পরিনয়ের সম্পর্ক, সর্বশেষ আজ মারকোনী কি বলে গেছে বাবাকে সব খুলে বললাম।
বাবা আমাকে কিছু টাকা দিলেন। তারপর বললেন- ঐ মেয়ের উদ্দেশ্য যাই থাক, তবে সে মিথ্যা বলেনি। এই আমার এখানে আর থাকা উচিত হবে না। আমি আবার আসবো ইনশাআল্লাহ। ঘরে যাই আছে লুকিয়ে ফেলে।
বাবা চলে গেলেন। এর এক ঘণ্টা পরই আমাদের বাড়ির দরজায় কি যেন ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। এর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ছাদের ওপর কয়েক জোড়া পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলো। মা দরজা খুললেন। চারজন পুলিশ চোখ ধাধনো টর্চের আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকলো। আরো দুজন ছাদ থেকে নেমে এলো। তারপর সবাই এক যোগে বাড়ির ভেতর তল্লাশি শুরু করলো।
আমি খঞ্জর ও পিস্তলটি বাড়ির বাগানের এক কোণে মাটি চাপা দিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। পুলিশ আমাদের ঘরের আসবাবপত্রের এমন হাল করলো যেন ডাকাত দল ডাকাতি করে গেছে। পুলিশের এই দলের সঙ্গে অন্য একজন সার্জেন্ট ছিলো। সার্জেন্ট আমাকে ও মাকে তার সামনে এনে দাঁড় করালো। যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
তুমি স্কুলে যাওয়া কেন বন্ধ করলো সার্জেন্ট আমাকে রূঢ় কণেষ্ঠ জিজ্ঞেস কলো।
ওকে আমিই স্কুল থেকে ফিরিয়ে এনেছি- মা জবাব দিলেন, আপনি নিশ্চয় জানেন, ওর বাবা জেলখানায় পড়ে আছে। আয় রোজগার সব বন্ধ। ওকে কি দিয়ে পড়াবো আমি? তা ছাড়া বাইরের অবস্থা খুব খারাপ। আমি চাই না, আমার একমাত্র ছেলে এই জটিল পরিস্থিতির শিকার হোক।
তোমার স্বামী জেল থেকে পালিয়েছে- সার্জেন্ট বড় তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো- তুমি ভালো করেই জানো সে কোথায় আছে এখন। তার এই ছেলে বিদ্রোহীদের কাছে যাতায়াত করে। যদি তোমার স্বামীর সন্ধান দিয়ে দাও তাহলে শান্তিতে কাটাতে পারবে বাকি জীবন। আর এই ছেলের ওপর নজর রেখো। যদি সে ধরা পড়ে তাহলে সারা জীবনেও ওকে ফিরে পাবে না।
ফেরাউনি দম্ভ দেখিয়ে ওরা চলে গেলো। মা অনেক্ষণ পর্যন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিড় বিড় করে বললেন,
আমি আমার একমাত্র ছেলেকে আমি আল জাযায়েরের মাটিতে উৎসর্গ করে দিলাম।
একটু পর মারকোনী এসে উপন্থি হলো।
এখন তো আমাকে বিশ্বাস করতে পারবে শামস! আমি ফ্রান্সী না, ইতালিয়ান মারকোনী বললো।
তাহলে ঐ সার্জেন্ট তোমাদের ঘরে কেন আসে? তুমি ওর সঙ্গে বাইরে বাইরে ঘোড় ফেরা করো কেন? আমি সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
বাবা আমাকে উনার সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন… এ বিয়ে ফেরানো যাবে না- হঠাৎ করেই তার গলা ধরে এলো- কিন্তু আমি তোমাকে ধোঁকা দেব না। তুমি আমার শৈশবের সঙ্গী। অতীত স্মৃতিগুলো ভুলে যাও… আর হ্যাঁ, তুমি সত্য পথেই আছে। আমার বিয়ে হচ্ছে এক ফ্রান্সী সার্জেন্টের সঙ্গে। ফ্রান্সের হুকুমমতের সঙ্গ নয়- এবার কেঁদেই ফেললো- আমাকে ভুলে যাও… আমার যে এছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না- একথা বলে মারকোনি ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।
