সে কোথায়? এক সার্জেন্ট আমার মাকে ধমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো।
কে।
তোমার স্বামী। সে এখানে এসেছিলো।
ও তো ছয় মাস ধরে লাপাত্তা। আমি কি করে বলবো সে কোথায়?
এর মধ্যে আমাদের পাশের বাড়ির এক লোক তার মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে এলেন। তার মেয়ের নাম মারকোনী। বয়স পনের ষোল। ওদের সঙ্গে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো। ওরা ইতালির লোক। মারকোনী আর আমি এক সঙ্গে পড়তাম। দুজনে দুজনার বেশ ঘনিষ্ঠও ছিলাম। অবশ্য ইতালি বা ইউরোপের অন্যান্য দেশের ছেলে মেয়েরা এ স্কুলে পড়তো। কিন্তু মারকোনীর মতো অন্য কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো না। মারকোনী ক্লাসে আমার সঙ্গে বসতো, খেলা করতো, এমনকি একই স্কুল কোচে করে আমরা স্কুলে আসা যাওয়া করতাম।
মারকোনীর বাবা ছিলেন খাদ্য ভবনের অফিসার। আমার বাবার খুব বন্ধু। আর মারকোনীর মা ছিলেন আমার মার বান্ধবী।
আপনারা কেন এসেছেন? সার্জেন্ট মারকোনীর বাবাকে জিজ্ঞেস করলো। ইউরোপীয় মনে করে উনার সঙ্গে সমীহ করেই বললো।
আমি এই ভদ্র মহিলা (আমার মা) ও তার ছেলের জামিন হচ্ছি মারকোনীর বাবা বললেন- এই মহিলার স্বামী আসামী বা দেশদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু উনাকে আমরা পনের-শোল বছর ধরে চিনি। তিনি আপনাদের ওয়াফাদার নাগরিক। তাছাড়া উনি নিজেও তো তার স্বামীর অত্যাচারে জরিত। তার ব্যাপারে আপনাদের কোন আশংকা থাকা উচিত নয়। ইনি তো শিক্ষিতও নন, সাধারণ গ্রাম্য মহিলা।
মারকোনীর বাবাকে মিথ্যা বলতে হলো। আমার মা আমার বাবার কাছে থেকে কোন দিন কোন কটু কথাও শুনেননি। অশিক্ষিত বা বুন্ধু-গ্রাম্যও নন আমার মা। উনি হায়ার সেকেন্ডারী পাশ। তবে মারকোনীর বাবার আমাদেরকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টার কৌশল মা বুঝে ফেললেন। তাই আমার মাও বুন্ধু বনে গেলেন তখন।
আপনি ইউরোপীয় বলে আপনার জামানত গ্রহণ করছি- সার্জেন্ট মারকোনীর বাবাকে বললো- আপনি মুসলমান হলে এদের সঙ্গে আপনাকেও গ্রেফতার করতাম- সার্জেন্ট বড় ঘৃণা ভরে আমার দিকে আঙ্গুল তাক করে বললো- এটা সাপের বাচ্চা। এই বয়সের ছেলেরা আমাদেরকে নাকানি চুবানি খাইয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। কয়েদীদের গাড়িতে যারা হামলা করে এদের মধ্যে এ পর্যন্ত পাঁচজন মারা গেছে। এই পাঁচজনের বয়সই সতের থেকে আঠার এর মধ্যে। আমি ওদের লাশ দেখেছি। সবার আগে ঐ হারামী বদ মুসলমানদের ছেলেগুলোকে আমাদের খতম করতে হবে।
আমার মা আমাকে ছো মেরে কাছে টেনে নিয়ে চেপে ধরলেন। বুকের সঙ্গে লাগিয়ে বুন্ধু আর মজলুম মায়ের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন—
আমার বাচ্চা এমন নয়। সে তার বাবার পথে যাবে না কখনোই। ওর বাবা চলে যাওয়াতে আমি অনেক খুশি।
ও আমার ক্লাস মেট- মারকোনীও আমার পক্ষে বললো এবং আমার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি গভীর করে যেন বললো, চুপ থাকো। কথা বললেই বিপদে পড়ে যাবে।
আমি দাঁত দিয়ে আমার ঠোঁট কাটতে লাগলাম। ফ্রান্সীরা আজ আমাদেরকে মানুষই মনে করছে না। এমন ব্যবহার করছে যেন আমরা কোন ইতর প্রাণী। আমি সার্জেন্টের দিকে তাকালাম। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের সুদর্শন যুবক। সে মারকোনীর দিকে তাকিয়ে হাসছিলো মুচকি মুচকি। মারকোনী অত্যন্ত রূপসী ছিলো। লম্বাটে শারীরিক গঠন ওর সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছিলো।
মারকোনীর সুপারিশ কাজে লাগলো। সার্জেন্ট মাকে ও আমাকে আরো কিছুক্ষণ ধমকিয়ে মারকোনীর বাবার সঙ্গে বাড়ির বাইরে চলে গেলো। আমি বাইরে বের হয়ে দেখলাম, সার্জেন্ট মারকোনীদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সিপাহীরা বাইরে গাড়িতে উঠে বসছে। সার্জেন্টের চোখ দেখেই আমি নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়ে ছিলাম যে, সে এখন মারকোনীর পিছু নেবে। অবশ্য মারকোনীর তাকে অপছন্দ করারও কিছু নেই। একে তো ধর্মে বর্ণে মিশে গেছে ওরা। তারপর এই বয়সেই ছেলেটি সার্জেন্ট পদে উন্নীত করেছে। এমন পাত্র কেই বা হাতছাড়া করতে চায়।
থাক এজন্য আমার কোন আফসোস ছিলো না। আমি বা মারকোনী আমরা কেউ তো কখনো কাউকে কোন প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাহলে এক সার্জেন্ট ওদের ঘরে যাওয়াতে আমার তো কোন কিছুর ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা চেপে বসলো, আমি আমার বাবার পথে কি করে চলবো? কে আমাকে ট্রেনিং দেবে? কার সঙ্গে আমি দেখা করবো? আমি কোথায় যাবো, কে আমাকে নিয়ে যাবে?
***
এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছ থেকে পেয়ে গেলাম। মা আমাকে প্রথম সবক দিলেন
যদি আচমকা এভাবে পুলিশ এসে পড়ে তুমিও সঙ্গে সঙ্গে ভিখিরী বিড়াল বনে যাবে। পুলিশরা গালিগালাজ করলে মাথা নামিয়ে ফেলবে। আবেগ ও জযবার আগুন তখন বুকের মধ্যে চেপে রাখবে …
আমি দেখছিলাম, ঐ পুলিশদের সামনে তোমার চেহারা রাগে লাল হয়ে যাচ্ছিলো। তুমি যদি রাগের সামান্য প্রকাশও ঘটাতে তোমাকে ধরে নিয়ে যেতো। এতে কি লাভ হতো? জাতির এক সম্ভাবনাময়ী যুবক ধ্বংস হয়ে যেতো। তোমাকে তোমার বাবার মতো দক্ষ গেরিলাদের মতো যমিনের নিচ থেকে হামলা করতে হবে। মনে রেখো, ফ্রান্সীদের পা টলে উঠেছে। ইনশাআল্লাহ বিজয় আমাদেরই হবে।
এরপর আরো কয়েক দিন সার্জেন্টকে মারকোনীদের ঘরে আসতে দেখেছি আমি। কিন্তু আমার মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। আমি জানতাম, আলজাযায়েরের কোন যুবক যদি কোন মেয়ের পাল্লায় পড়ে যায় তাহলে তার আর রেহায় মেলে না। আমি আরো আগ থেকেই বুঝতে পারতাম, ফ্রান্সীরা মুসলমানদেরকে বিলাসী জীবনে ডুবিয়ে দিতে চাচ্ছে। কোথাও যাতে ভালো-মন্দ, শালীন ও অশালীনতার ভেদাভেদ না থাকে; তারা সে চেষ্টাই করছে। মারকোনীকেও আমি তাদেরই কোন ইন্ধন মনে করতে লাগলাম।
