এর ছয় মাস পর। এক রাতে বাবা আমাদের বাড়িতে এলেন। তিনি জাগালেন আমাকে। খুব তাড়াহুড়া করছিলেন। ঘরের আবছা আলোয় দেখতে পেলাম, তার স্বাস্থ্য অনেকটা ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু চোখ দুটো হয়েছে আরো তীক্ষ্ম, ক্ষুরধার। মুখের পেশীগুলো আরো দৃঢ়। সমস্ত অবয়ব থেকে যেন কঠিন কোন অঙ্গীকারের দীপ্তি ঠিকরে বেরোচ্ছিলো।
আমার প্রিয় বেটা! কোন ভূমিকা ছাড়াই তিনি আমাকে বলতে লাগলেন আমাকে ভুলে যেয়ো। কিন্তু আমার কথাগুলো ভুলো না। আমাদের আর মিলন নাও হতে পারে। জেলখানা থেকে পালিয়ে এসেছি আমি তাই এখন আর প্রকাশ্যে এদিকে আসতে পারবো না।…
আমি মারা যাই বা জীবিত থাকি তোমার দায়িত্ব হলো এদেশ স্বাধীন করা। তোমাকে কি করতে হবে তোমার মা তোমাকে বলে দেবে। আমার ওসিয়ত মনে রেখো। আর মাথা থেকে বের করে দাও, তুমি কোন অফিসারের ছেলে। তোমাদেরকে আমি যে সুখের জীবন দিয়েছিলাম তাও ভুলে যাও।…
তোমাকে হয়তো মরুর তপ্ত বালিতে কোন ফ্রান্সীর গুলিতে বা ক্ষুৎ পিপাসায় মরতে হতে পারে। কিন্তু মরাটা কোন বাহুদুরী বিষয় নয়। মেরে মরার মধ্যে বীরত্ব আছে। নিশ্চিত মৃত্যুর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পরে শত্রুকে ঘায়েল করে জীবিত ফিরে আসাকেই বীরত্ব বলে … আমি দেরী করতে পারবো না। পুলিশ আমার পিছু নিয়েছে- মনে আছে আমার বাবা আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে উঠেন- জেগে উঠো আমার বেটা! জেগে উঠো। যে কওমের নওজোয়ানরা ঘুমিয়ে পড়ে সে কওমের ভাগ্যের চাকাও থেমে যায়।
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর আমার মাকে বললাম, মা! কাল রাতে স্বপ্নে বাবাকে দেখেছি। বাবা আমাকে এই এই বলেছেন স্বপ্নে। মা মুচকি হেসে বললেন, স্বপ্নে নয় বাস্তবেই তুমি তাকে দেখেছে।
তিনি কাল রাতে এসেছিলেন- মা বললেন, তিনি যা বলে গেছেন তা ভুলবে না কখনো। তোমার বাবাকে গতকাল রাতে এক জেল থেকে স্থানান্তর করে আরেক জেলে নিয়ে যাচ্ছিলো ফ্রান্সীরা। কয়েদীদেরকে রাতেই জেল বদল করা হয়। কারণ, দিনে মুক্তিযোদ্ধারা তা জেনে ফেলে এবং গাড়িতে হামলা করে কয়েদীদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু রাতের বেলা হলে মুক্তিযোদ্ধারা আর টের পায় না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা এখন এটা জেনে ফেলেছে। তোমার বাবাকে নিয়ে গাড়ি যখন অতি নির্জন এক জায়গায় দিয়ে যাচ্ছিলো তখন গাড়িতে আচমকা হামলা হয়। কয়েকজন কয়েদী মারা যায়। মারা যায় কয়েজন পুলিশও। হামলাকারীদের একজন শহীদ হয়। তোমার বাবা অক্ষত অবস্থাতেই পালাতে সক্ষম হন। তারপর লুকিয়ে ছাপিয়ে এখানে এসে তোমাকে ওসিয়ত করে যান।
বাবার লাগেনি তো? আমি পেরেশান হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
না, সামান্য আচড়ও লাগেনি। লাগলে কি এখানে আসতে পারেন- মা বললেন সামান্য হেসে।
মার কথায় ও চেহারায় আফসোস বা চিন্তার সামান্য লক্ষণও ছিলো না। তার পর বাবা রাতে আমাকে যা বলেছিলেন মা সেগুলো আবার আমাকে মনে করিয়ে দিলেন।
***
তোমার বাবার পথ ধরে তোমাকে যেতে হবে- মা বললেন, তিনি শহীদী জীবন ও মুক্তিযোদ্ধাদের পথে তার স্মৃতি চিহ্ন রেখে গেছেন গতকাল রাতে। এই চিহ্ন তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে এই পদচিহ্ন শেষ হয়ে যাবে সেখান থেকে শুরু হবে রক্ত ফোঁটার পিচ্ছিল পথ। এটা হবে তোমার বাবার রক্ত। জাতির সন্তানদের পথ নির্দেশ করে তাদের পিতার রক্তমাখা পদচিহ্ন।
আমার জন্মের পূর্বেই ফ্রান্সীরা আল জাযায়ের দখল করে বসে। কিন্তু তখন সেসব বীর যোদ্ধা মহিয়সী নারীরা কোথায় ছিলো যারা দেশের মুক্তির জন্য নিজের স্বামী, প্রিয়জন, গর্ভের সন্তানকে উৎসর্গ করে দিতো। আসলে যে ধর্ম যে ইসলাম তাদের প্রাণের আদর্শ ছিলো, অস্তিত্বের ভিত্তি ছিলো তা তারা বিক্রি করে দিয়ে ছিলো। বিধর্মীদের রঙ-সজ্জায় তাদের জীবনকে রঞ্জিত করতে চেয়েছিলো। তাদের আদর্শহীন ও নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষাক্ত শরাব আকণ্ঠপান করতে শুরু করলো।
অবশেষে জাতির পিতাদের অন্তরের সুপ্ত ঈমানের প্রায় নিভে যাওয়া প্রদীপ পূর্ণমাত্রায় প্রজ্জলিত হয়। জেগে উঠে দেশের সন্তানরা। মায়ের বুকের সন্তানকে উত্সর্গ করে দেয় গোলাবারুদের ছায়াতলে। স্ত্রীরা নিজেদের ভালোবাসা অর্পণ করে কওমের রক্তাক্ত কদমে।
এর পরের রাতের ঘটনা। মা আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। বাড়ির বাইরে গাড়ির ব্রেক করার শব্দ হলো। আম্মার চেহারায় ভয়ের ছায়া নেমে এলো। তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে ফিস ফিস করে বললেন- ঐ যে এসে গেছে।
কে? আব্বা? আমি খুব খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
না …।
পুলিশ … মনে হয় ফৌজ।
দরজার শুধু কড়া নড়ে উঠলো না; যেন দরজা ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম করলো। কেউ চিৎকার করে বললো- দরজা খুলে দাও, না হয় আমরা ভেতরে ঢুকে গুলি করব।
মা ক্রুদ্ধ হয়ে বড় দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি তার পেছন পেছন গেলাম। মা দরজা খুলতেই চারজান আর্মি এক ঝটকায় ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লো। ঢুকেই সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লো। প্লেট গ্লাস, কাপ পিরিচ, ফানির্চার রাইফেলের বাট দিয়ে গুড়ো করতে লাগলো। সারা বাড়িতে ছয়টি কামরা ছিলো। প্রতিটি কামরার আসবাবপত্র ছিন্নভিন্ন করে ফেললো। ছাদেও গেলো। কোথাও তাদের কাংখিত কোন কিছু পেলো না।
নিচে এসে মাকে ও আমাকে আসামীর মতো তাদের সামনে দাঁড় করালো। আমার দেহের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগলো তখন। ফ্রান্সীরা তো আমার আজন্ম শত্রু। কিন্তু সেদিন আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম, এই ঘৃণ্য শত্রুরা আমাদের আত্মসম্মান ও জাতীয় ইজ্জত আবরুর ওপর নোংরা পা দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মহান এক ধর্মের অনুসারী হয়েও ঐ কাফেরদের চোখে আমরা অতি নিকৃষ্ট প্রাণীরও অধম।
