আমরা নিজেদের প্রিয় মাতৃভূমির সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে মারা যাচ্ছি। আহ! এটা যে কতটা গর্বের … সম্মানের।
এর কয়েক মিনিট পরই মোল্লা আব্দুল্লাহ শহীদ হয়ে গেলো। জড়িপ করে দেখা গেলো, অস্ট্রেলিয়ান বাহিনীর ৭৭ জন নিহত হয়েছে এবং শতাদিক আহত হয়েছে।
দুই তুর্কির ঝং ও মর্চে ধরা রাইফেল, গুলির তিনটি খালি বেষ্ট, আইস ক্রিমের বক্স এবং সহস্র ছিন্ন পতাকাটি আজও নিউ সাউথ ভিলেজ মিউজিয়ামের দর্শকদের বিস্ময়াভিভূত করে যাচ্ছে। যেন আজও পতপত করে উড়ছে তাদের ঝান্ডাটি।
প্রেম ও যুদ্ধ
প্রেম ও যুদ্ধ
আমার সামনে এই যে আদিগন্ত মরুর বিস্তৃতি, আমার চারপাশে তরঙ্গায়িত বালির সমুদ্র, এটাই আমার দুনিয়া। এটাই আমার জীবন। এই ধূলির বিছানাতেই আমার মৃত্যু। এই বালির দুনিয়া আমার খুনের পিয়াসী নয়। কিন্তু আমি একে আমার রক্ত পান করাবো।
বালিময় এ মরু আমার-আমাদের। ফ্রান্সের নয়।
নিজ দেশের ধূলিকণা অন্য দেশের সোনার চেয়ে দামী-পবিত্র।
আমি এসব কথা জানতাম না। শুধু জানতাম, আলজাযায়ের আমার দেশ। ফ্রান্সীরা তা অন্যায়ভাবে দখল করে আমাদের মাথার ওপর রাজত্ব করছে। তারা আমাদের ভূমির উৎপন্ন ফসলের মালিক বনে যাচ্ছে জোর জবরদস্তি করে। মালিক আমাদের ইজ্জত সম্মানের; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের লালিত ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের।
আমি এও জানি, আমাদের নেতারা, যুবক ভাইয়েরা ফ্রান্সীদের এদেশ থেকে তাড়ানোর জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে দিয়েছেন। এ হলো পরাধীনতা থেকে মুক্তির যুদ্ধ, যুদ্ধ স্বাধীনতার। কিন্তু দখলদারদের মতে এ হলো বিদ্রোহ। দেশদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ। এর জন্য এরা যে শাস্তি বরাদ্দ রেখেছে তা শুনলে সারা শরীর থর থর করে কেঁপে উঠবে।
আরেকটা রহস্যের কথা জানি আমি। আড়াই বছর ধরে আমার বাবা আমাদের বাড়ি থেকে গায়েব। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো- এজন্য আমার মা মোটেও চিন্তিত ছিলেন না। মা আমাকে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলেন, ফ্রান্সীদের বিরুদ্ধে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে আমার বাবা সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি এই পুলিশের ওপর হামলা করছেন তো আবার কয়েদও হচ্ছেন। কৌশলে আবার ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছেন। গ্রেফতার হলে আবার জেল থেকে পালিয়ে আসছেন। এসে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে নতুন উদ্যম নিয়ে রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। সয়ে যাচ্ছেন ফ্রান্সী পুলিশের অমানবিক নির্যাতন।
যার ভেতরে তার দেশের শুধু ভালোবাসা নয় বরং ভালোবাসার উন্মত্ততা আছে এবং নিজের রক্তাক্ত মাথায় প্রিয় মাতৃভূমির পতাকাটি সমুন্নত রাখার সংকল্পে শক্তিমান দৃঢ়চেতা একটি মন আছে; তারাই পায়ে সব নির্যাতন অত্যাচার হাসিমুখে বরণ করে নিতে।
অনেক কথা আমার বাবাও আমাকে বলেছেন। আমার কাছে মনে হতো এসব স্বপ্নযোগে পাওয়া কোন দৈব বাণী। যেন স্বপ্নে আমার বাবা এসেছিলেন এবং আমার রক্তে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে চলে গেছেন। ঘুম থেকে জাগার পর মা জানাতেন, হ্যাঁ সত্যিই গত রাতে তোমার বাবা এসেছিলেন।
এটা দুবছর আগের কথা। আমার বয়স তখন উনিশ। কয়েক মাস বেশিও হতে পারে। আমি ছিলাম গভীর ঘুমে। বাবা আমাকে জাগালেন। বড় কষ্টে আমার চোখের পাতা খুললো। মা ঋজু ভঙ্গিতে বাবার বাহু পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেক দিন পর বাবাকে দেখছিলাম আমি। কিন্তু আমার চোখ ঘুমে ভারী হয়ে আসছিলো। বাবার ভ্রূক্ষেপ ছিলো না সেদিকে। তিনি বলে যাচ্ছিলেন বড় দ্রুত। সব কথা মনে থাকার কথা নয়। পরে মা অবশ্য আমাকে বলে দিয়েছিলেন। সেদিন বাবার মধ্যে আমি কী যে এক অপার্থিব তেজ দেখেছিলাম।
সে রাতেই আমি জানতে পেরেছিলাম, বাবা গ্রেফতার হয়ে গিয়ে ছিলেন। একটা কথা বলা উচিত এখানে যে, বাবা কোন মামুলি লোক ছিলেন না। কাষ্টমূস প্রশাসনের অফিসার ছিলেন তিনি। আরবীর মতো ফ্রান্সও বলতে পারতেন চমৎকার। যে স্কুলে আমাকে ভর্তি করানো হয়েছিলো সেখানে বড় বড় অফিসার ও আমীর ঘরনার ছেলে মেয়েরা পড়তো। ফোর্থগ্রেড গভর্নিং বডির ছেলে মেয়েরাও আমাদের সঙ্গে পড়তো। ফ্রান্সী ছাড়াও ইতালি, জার্মানি, স্পেনিশ ও ইংলন্ডের ছেলে মেয়েরাও পড়তো এখানে। অর্থাৎ আমিও আমীর ঘরনার সন্তান ছিলাম। ছিলাম এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছেলে।
আমি আসলে বলতে চাই, জাতির নেতৃস্থানীয় ও বুদ্ধিজীবীরা যদি মনে করতে থাকে, ত্যাগ, সগ্রাম ও অত্যাচার সহ্য করা শুধু গরিবদের কাজ তাহলে সে জাতির অন্য জাতির বর্বর শ্রেণীর গোলাম বনে গিয়ে জীবন যাপন করতে হয়। কিন্তু আলজাযায়েরের মুসলমানরা সে রকম ছিলো না। আমরা আমাদের ভূখণ্ড একদিন না একদিন ঠিকই স্বাধীন করে নেবো। কারণ, আমাদের আমীর, ফকির, অফিসার, কেরানী, দুর্বল, সবল সব এক ঝাণ্ডা তলে সমবেত হয়েছে।
চাকুরিতে থাকতেই বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা শুরু করেন। বাবার কাজ ছিলো, ফ্রান্সীদের অস্ত্র গোলাবারুদ ও যুদ্ধের অন্যান্য রসদপত্র যেসব গাড়িতে বহন করে নিয়ে যেতো সেগুলোর খবর তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিতেন। অনেক ফৌজি তথ্যও সরবরাহ করতেন। গেরিলা মুজাহিদদের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিলো। মা আমাকে বলেছেন, ফ্রান্সের গোয়েন্দা পুলিশের সন্দেহভাজন তালিকায় বাবার নাম উঠে যায়। তারপর একদিন বাবা গ্রেফতার হয়ে যান।
