“আর কদিন কি এখানে আছেন না আপনি?”
“কর্তব্যের খাতিরে আমাকে যেতে হচ্ছে। নয়তো আমার আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না।”
“কর্তব্যের ব্যাপার হলে সেই কর্তব্য আমি যেভাবে বলি সেভাবে পালন করুন। আপনি সুলতানকে এ পথে এনে আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন। আপনি আমাদের এখানে এলে সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব সোপর্দ করা হবে আপনাকে। আর আরাম-আয়েশ যা পাচ্ছেন সেসব সব সময়ের জন্যে স্থায়ী করে দেয়া হবে।”
“আপনি যদি মাহমূদকে আমাদের পাতানো ফাঁদে আটকে দিতে পারেন, তবে আমি আপনাকে এ অঙ্গীকার দিচ্ছি, আমার রাজ্যের কিছু এলাকা ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন শাসন কাজ চালানোর ব্যবস্থা করে দেবো আপনাকে। যুদ্ধ ময়দানে এতে কৃতিত্ব অর্জনের পর জীবনে কিছুটা আরাম-আয়েশ করার অধিকার অবশ্যই আপনার আছে। মানুষতো আর দুনিয়াতে বারবার আসে না!”
শ্বেত শুভ্র শ্মশ্রুধারী লোকটি যে ধরনের কথা বলেছিল দাউদের মুখেও সে ধরনের কথা শুনতে পেল আসেম। দাউদ বলল, “হিন্দুদের চেয়ে পরোপকারী কোন সুহৃদ আপনি ইহজগতে পাবেন না। আপনি হিন্দুদের সাথে মিশে দেখুন না! সুলতানের ইচ্ছার বলী হয়ে জীবনটাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে কি লাভ? আগামীকাল সকালেই চলে যান। সুলতানকে গিয়ে বলুন–দাউদ বিন নসর আপনাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে এবং অগ্রাভিযানের পথও বলে। দিয়েছে।”
সেই দিন বিকেলের ঘটনা। আসেম ওমর তার কক্ষে চার নিরাপত্তারক্ষীকে ডেকে পাঠাল। তাদের বলল, “আগামীকাল সকালেই আমি রওয়ানা হবো।” আসেম তাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়ে বিদায় গ্রহণ করল।
তারা মহলের একটি গলিপথে নিজেদের থাকার ঘরে ফিরে যাচ্ছিল। এমন সময় পিছন দিক থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারা একটি মহিলাকে তাদের দিকে আসতে দেখল। মহিলাটি তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দিকে না তাকিয়েই অনুচ্চ আওয়াজে নিজের ভাষায় ও ইঙ্গিতে বলল, “তোমাদের একজন এখনই ওই বুযুর্গ ব্যক্তির বাড়িতে চলে যাও, যার বাড়িতে তোমরা মেহমান হয়েছিলে।” মহিলাটি আর কোন কথা না বলে তার মতো করে ওদের অতিক্রম করে চলে গেল।
তাদের একজন তখনই গিয়ে সেই বুযুর্গ ব্যক্তির দরজায় কড়া নাড়ল। তিনি নিজেই দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিলেন।
“আসেম ওমর কেরামাতীদের ফাঁদে আটকে গেছে।” বললেন বুযুর্গ। “সে দাউদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চুক্তি মতো তাকে একটি মানচিত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে, যে পথে সুলতানের বাহিনী নিয়ে আসবে সে। আপনারা আগামীকাল সকালেই এখান থেকে রওয়ানা হচ্ছেন। আপনারা সুলতানকে গিয়ে বলবেন, যাকে আপনি মুসলমান ও সুহৃদ মনে করছেন সে শত্রুতায় হিন্দুদের চেয়েও জঘন্য। কোন অবস্থাতেই আসেমের বলা পথে সেনাভিযানের চিন্তা যেন সুলতান করেন। আপনি জলদি এ দেশ থেকে চলে যান। পথে কোন সময় নষ্ট করবেন না।”
“আচ্ছা ওই মহিলাটি কে? যিনি আমাদের একজনকে আপনার সাথে দেখা করার সংবাদ দিলেন?” জিজ্ঞেস করল নিরাপত্তারক্ষী।
“সে এক ভাগ্য বিড়ম্বিতা নারী।” বললেন বুযুর্গ।
“আপনারা হয়তো তার সৌন্দর্য দেখে থাকবেন। তাকে তার মা-বাবা মোটা অংকের পণের বিনিময়ে এক চরিত্রহীন ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে বিয়ে দেয়। লোকটি দাউদের সাথে সুসম্পর্ক অটুট রাখার স্বার্থে নিজের স্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেয়। দাউদ দু’বছর তাকে হেরেমে রেখে রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করে। মেয়েটি যেমন সুন্দরী তেমনই বুদ্ধিমতি, পড়ালেখাও জানে। সে ছিল আমার মেয়ের সহপাঠিনী। এই সুবাদে সে আমার বাড়িতে প্রায়ই আসে। আমার মেয়ের সাথে সময় কাটায়, কথাবার্তা বলে। ভাগ্যবিড়ম্বনার জন্য প্রথম দিকে সে খুব কান্নাকাটি করতো, কিন্তু আমার মেয়ের মাধ্যমে আমি তাকে যখন বলেছি, এই জাহান্নামের ভেতরে থেকেও তুমি ইচ্ছে করলে ইসলামের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পার, তখন সে দুঃখ বুকে চেপে আমাদের সহযোগিতা করতে শুরু করে। এর মাধ্যমে সব ধরনের শাহী ফরমান ও পরিকল্পনা আমরা আগেই জানতে পারি। সে যথাসময়ে আমাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেয়। প্রশাসনিক কাজে সে খুবই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে এবং নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে রাজমহলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ দাউদ বিন নসর যখন আসেমকে ডেকে একান্তে হিন্দুদের তৈরি মানচিত্র দিয়ে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকাতে রাজ্যদানের টোপ দিল তখন এই মেয়েটি তাদেরকে পানীয় ও শরাব পরিবেশন করছিল। দাউদের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করে এই মেয়ে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল তাদের কথাবার্তা। ওখানকার কাজ শেষ হলেই সে আমার এখানে এসে সব বলে গেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুলতানকে আপনার আস্থায় নেয়া যে, আসেম ওমর যে প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছে তা প্রতারণার ফাঁদ আর আপনি যা বলবেন তা সঠিক।”
“এই মহিলা কি নিয়মিত আপনার নিকট যাতায়াত করে?” জিজ্ঞেস করল নিরাপত্তারক্ষী। “সে কি রাজমহল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায়? তাকে কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার কথা কি আপনি কখনও ভেবেছেন? কোন মুসলমান যদি ওকে নিয়ে কোন নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে চায় এবং বিয়ে করে। তা কি সম্ভব?”
“অনেকবার ওকে এই নরক-যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করার কথা ভেবেছি। কিন্তু নির্ভরযোগ্য এমন কোন মুসলিম যুবক পাইনি যে তাকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সংসার গড়তে পারে। আজকেও সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনাদের কেউ যদি সাহস করেন তবে সে আপনাদের কারো সাথে গজনী চলে যেতে আগ্রহী। ওকে কেউ বিয়ে না করলেও কোন বুযুর্গ ব্যক্তির সেবা করেও জীবন কাটিয়ে দিতে রাজী।”
