কারামাতীরা এক পর্যায়ে পবিত্র হাজরে আসওয়াদকে কা’বা গাত্র থেকে সরিয়ে বসরায় স্থানান্তরিত করে। প্রায় বিশ বছর হাজরে আসওয়াদ বসরায় ছিল ওদের কজায়। এরপর আল্লাহ্ ওদের শাস্তি দিতে শুরু করেন। হালাকু খান ওদের মৃত্যুদূত হিসেবে আভির্ভূত হন। হালাকু খানের আক্রমণে কারামাতীদের অধিকাংশ অনুসারী নিহত হয়। যারা বেঁচে থাকে তারা পালিয়ে ইরানে পাড়ি জমায়। ইরানেও ওরা স্থির থাকতে পারেনি। ইরানী স্থানীয়দের তাড়া খেয়ে শেষ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে। ওই বিতাড়িত কারামাতীদের উত্তরসূরীদেরকেই আজ আপনারা দাউদ বিন নসরের সুরতে দেখছেন।
দাউদ বিন নসরের দাদা আহমদ খান কারামাতী মুলতানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। সে ইসলামের সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে হত্যা করে, জুলুম অত্যাচার চালিয়ে এমন ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যে, ওদের মোকাবেলায় দাঁড়াবার মতো কেউ আর বেঁচে ছিল না। সকল প্রতিদ্বন্দ্বি শক্তিকে নিঃশেষ করে কারামাতীরা প্রচার করতে শুরু করে, আমরা যে ইসলাম প্রচার করি সেটিই সত্যিকার ইসলাম। অত্যাচার উৎপীড়ন ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আহমদ খান একটি অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করে নেয় এবং মুলতানে কারামাতী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের স্মৃতিবাহী এই মুলতান। সারা দুনিয়ার ইহুদী খৃস্ট শক্তি এদের সহযোগী। কিন্তু বাইরে থেকে মুসলমানরা এদের অপকর্ম ততোটা অনুধাবন করতে পারে না বলে এদেরকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের পদাঙ্ক অনুসারী মনে করে বিভ্রান্তির শিকার হয়। প্রকাশ্যে এরা হিন্দুদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখলেও নেপথ্যে দাউদ বিন নসর হিন্দুদের প্রধান সহযোগী এবং হিন্দু পৃষ্ঠপোষকতাই তার প্রধান শক্তি। কারামাতীদের দীর্ঘ ইতিহাস আপনাদেরকে এজন্য শুনাচ্ছি যে, যদি দাউদ সুলতানকে সহযোগিতার ওয়াদা করে তবে তা মারাত্মক প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনারা যাতে এদের ভালভাবে চিনতে পারেন এজন্যই আমার এতোসব বলা।”
“আসেম ওমর কি পয়গাম নিয়ে এলেন এ ব্যাপারে আপনি অবগত হলেন কিভাবে?” প্রশ্ন করল এক নিরাপত্তাকর্মী। “আপনি কি করে জানলেন, রাতের বেলায় সে মদ পান করেছে? আপনি কি এখানে গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করছেন?”
“না। আমি কোন গোয়েন্দা নই। আমি সুলতান মাহমূদেরও নিয়োগকৃত গোয়েন্দা নই। আমি মুহাম্মদ বিন কাসিমের আত্মার সন্তান। তারই উত্তরসূরী। আমরা সেই মহান ব্যক্তিদের বংশজাত– মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাথে যারা এখানে এসে সত্যিকার ইসলাম প্রচারে আত্মনিবেদন করেছিলেন। আমরা কারামাতীদের বিপরীতে সত্যিকার ইসলাম প্রচারে গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছি। আমাদের নিজস্ব লোক রাজমহলের ভেতরে কাজ করে। ভেতরের সকল সংবাদ তাদের মাধ্যমে আমরা পেয়ে থাকি। দাউদ বিন নসর ব্যক্তিগতভাবেও জানে, তার বিরুদ্ধে একটি গোপন শক্তি সক্রিয় রয়েছে, কিন্তু সে আমাদের কখনও চিহ্নিত করতে পারেনি। আমরা খুবই সতর্কভাবে কাজ করি। আমাদের প্রত্যেক সদস্য সুশিক্ষিত, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। পুরুষ ছাড়াও অনেক মহিলা রয়েছে আমাদের সংগঠনে। তারা প্রত্যেকে ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদায় বিশ্বাসী। তারা সৎ, আমানতদার ও পরহেযগার। দাউদ যদি আমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করে তবে আগেই আমরা এর খবর পেয়ে যাই, তার পক্ষে আমাদের কার্যক্রম চিহ্নিত করা মোটেই সহজ নয়।”
“এখন আমাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত?”
“আগে আপনাদেরকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে, দাউদ আপনাদের সুহৃদ নয়, সে হিন্দুদের সুহৃদ। সেই সাথে আপনাদের দূতবেশী কমান্ডারের উপরও রসা ত্যাগ করতে হবে। সে যদি সুলতানের কাছে মুলতানে সেনা অভিযানের পরিকল্পনা পেশ করে তবে আপনারা সুলতানকে দাউদের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বলবেন। তিনি যদি হিন্দুদের পদানত করতে সেনা অভিযানে আগ্রহী হন তবে সর্বাগ্রে মুলতানের কারামতী আখড়াকে নির্মূল করতে হবে।
আমি আপনাদের এ আশ্বাস দিচ্ছি, ইসলামের নামে প্রতারণা করে কেউ রক্ষা পায়নি। দাউদেরও শেষ রক্ষা হবে না। যারাই ইসলামের নামে প্রতারণা করেছে ধ্বংস হয়েছে। দাউদের ধ্বংসও অনিবার্য।”
“তাহলে আমাদের আগে দেখতে হবে, কমান্ডার আসেম ওমর কি করেন।” বলল এক নিরাপত্তারক্ষী। তিনি তো দাউদের ফাঁদে পা নাও দিতে পারেন। যদি দেখি তিনি দাউদের ফাঁদে পা দিয়েছেন, তাহলে আপনি যা বলেছেন সে তথ্য সুলতানকে জানাব।”
* * *
দাউদ বিন নসরের সামনে উপবিষ্ট আসেম ওমর। তাদের সামনের টেবিলে একটি মানচিত্র।
“এ মানচিত্র আপনি সাথে নিয়ে যেতে পারেন।” বলল দাউদ। “আমি আপনাকে সুলতানের সেনাবাহিনীর জন্যে নিরাপদ পথ বলে দিলাম। চুন্নাব নদী পার হওয়ার জায়গাটিও বলে দিয়েছি।”
“আপনি যে পথের কথা বললেন, সে পথে আনন্দ পাল ও বিজি রায়ের সৈন্যরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। আমার কাছে তো পথটি অনিরাপদ মনে হচ্ছে। এ জটিল পথে আপনি কিভাবে আমাদের নিরাপত্তা দেবেন?” বলল আসেম।
দাউদের উত্তরে আশ্বস্ত হতে পারল না আসেম। দাউদের কথা ও তার প্রতিশ্রুতিকে সামরিক দৃষ্টকোণ থেকে যাচাই করতে শুরু করল আসেম। আসেমের মনে দাউদের কথায় সন্দেহ উঁকি দিল। সন্দেহ নিরসনকল্পে বহু প্রশ্ন করল আসেম। আসেমের অভাবিত জিজ্ঞাসায় দাউদ ভেবাচেকা খেয়ে গেল।
