“আমরা ওকে সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু সবার গোচরে ওকে নিয়ে পথ চলা মুশকিল হবে। ওকে যুদি আমাদের যাত্রা পথের কোন জায়গায় শহর থেকে দূরে কোথাও আমাদের সাথে মিলিত করা যায় তবে সাথে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। অবশ্য আসেম ওকে সাথে নিয়ে যেতে বাধ সাধবে। সে দিকটা আমরা সামাল দেবো।” বলল নিরাপত্তারক্ষী।
পরদিন খুব ভোরে সূর্যোদয়ের অনেক আগেই কমান্ডার আসেম চার সঙ্গীকে নিয়ে গজনীর পথে রওয়ানা হল। তাদের সাথে নতুন যোগ হলো দাউদ বিন নসরের উপঢৌকন বোঝাই করা একটি উট। এক সৈনিকের বর্শার সাথে বেঁধে দেয়া হল সাদা পতাকা। যা শাসকদের পক্ষ থেকে দেয়া তাদের জন্যে নিরাপত্তার প্রতীক।
আসেমের কাফেলা শহর অতিক্রম করে নদী পেরিয়ে গেল। আসেম ওমর আসার সময় সাথীদের সাথে নানা খোশগল্পে পথ অতিক্রম করেছিল। সঙ্গীরা ও তার মধ্যে তেমন কোন আভিজাত্যের বিভেদ ভাব ছিল না তখন। কিন্তু ফেরার পথে সেই আসেম অন্য মানুষ। এখন সে সবার থেকে আগে আগে চলছে। কারো সাথে কোন গল্প করার মনোভাব তার নেই। কথা দু’চারটি যা বলছে, সেগুলোর সবই হয়তো সঙ্গীদের প্রতি নির্দেশ নয়তো দিক নির্দেশনামূলক। তার মধ্যে এখন রাজকীয় ভাব। মাথাটা যেন আগের চেয়ে উঁচু হয়ে গেছে এক হাত। আচরণে স্পষ্ট অহমিকার ছাপ।
সূর্য প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। একটা ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকার ভেতর দিয়ে তারা যাচ্ছে। আসেম তাদের থেকে অনেকটা আগে। হঠাৎ এক সাথী অন্যদের ইশারায় বলল, দেখো তো ঝোঁপের আড়ালে দুটি লোকের অবস্থান মনে হয় কি-না। ওদের চোখ এবং দেহের কিছু অংশ আবছা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছিল। অন্যরাও তাকে সমর্থন করল এবং বলল, মনে হয় বুযুর্গ ব্যক্তি সেই মহিলাকে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়েছে।
তারা গত রাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ হলো। তাদের একজন ঘোড়া থামিয়ে ধীরে ধীরে ঘন-জঙ্গলের দিকে অগ্রসর হল। বাকীরা আসেমের অনুগামী হল। সৈনিক একটু অগ্রসর হলেই সেই যুবতাঁকে দেখতে পেল। সে একটি ঘোড়ায় আরোহিত। সাথে একজন পুরুষ। লোকটি যুবতাঁকে সৈনিকের কাছে সোপর্দ করে নীরবে চলে গেল। যুবতাঁকে নিয়ে সৈনিক কিছুক্ষণ সেখানেই বসে রইল। এরা চোখের ভাব বিনিময় ও মুচকি হাসি ছাড়া কেউ কারো কথা পরিষ্কার বুঝতে পারে না। যুবতী ও সৈনিকের ভাষা ভিন্ন। যুবতী যখন ইঙ্গিতে সৈনিককে বলল চলুন, তখন সৈনিক তাকে চুপ করে বসে থাকতে অনুরোধ করল।
সূর্য ডুবে চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো। সাথীদেরকে তাবু টাঙ্গিয়ে বিশ্রামের নির্দেশ দিল আসেম। আসেম যখন দেখলো, লোক একজন কম তখন অন্যদের জিজ্ঞেস করল, সে কোথায়? সবাই বিস্ময় প্রকাশ করল এবং অবজ্ঞাও দেখালো কিছুটা। বলল, সব সময় পিছনে পিছনে থেকেছে। বলছিল তার কাছে নাকি মুলতান খুবই ভাল লেগেছে। সে থেকে যাবে। আরেকজন বললো, কে জানে কোন বারবণিতাকে নাকি ভাল লেগেছে তার। ওখানেই ফিরে গেছে হয়তো।
আসেম ওদের প্রতি খুবই ক্ষোভ প্রকাশ করল। ওরাও আসেমের কথায় দৃশ্যত অনুতাপ করল। একজন বলল, “ওকে খোঁজা অর্থহীন। পশ্চাদ্ধাবন করেও কোন লাভ নেই। কে জানে কখন পালিয়েছে। আমরা তো স্বপ্নেও ভাবিনি ও এমন করে পালাবে।”
দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেল আসেমের চেহারা। বহুক্ষণ পর বলল, “ঠিকই বলেছ, ওকে খোঁজা অর্থহীন। তার চেয়ে বরং ও যেখানে যেতে চাইছে সেখানেই চলে যাক।”
এতো গুরুত্বপূর্ণ একজন সাথীর হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিও খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি আসেমকে। কারণ তার নিজের প্রাণই তো পড়ে রয়েছে দাউদের প্রাসাদে। তার তনু মনে এখনও পেয়ালা আর রমণীর উষ্ণতার অনুভব।
নিরাপত্তারক্ষী যদি কোন রমণীকে মন দিয়ে থাকে তো আর বেশি কি দিয়েছে। আসেম নিজেকেই তো বিক্রি করে দিয়েছে দাউদের কাছে। ঈমান বিলীন করে দিয়েছে তরুণীর দেহের উষ্ণতায় মদের পেয়ালায়। শরীরটা শুধু যাচ্ছে গজনীর দিকে, আসেমের মনটা বাঁধা মুলতানের প্রাসাদে। তাই সাধারণ একজন সৈনিকের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তাকে কতটুকু আর প্রভাবিত করবে। নিজের কাছেই আসেমকে রাজা রাজা মনে হচ্ছে। সৈনিক তো দূরের কথা, খোদ সুলতানেরই কোন গুরুত্ব নেই তার কাছে।
কল্পনাও করতে পারেনি আসেম– সে যখন তিন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বিশ্রাম করছে, তখন তার হারিয়ে যাওয়া সৈনিক এক যুবতাঁকে নিয়ে গজনীর পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
– প্রথম খণ্ড সমাপ্ত –
২.১ জনকের প্রায়শ্চিত্ত
ভারত অভিযান (মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান) (দ্বিতীয় খণ্ড) / এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ – শহীদুল ইসলাম
সুলতান মাহমুদ গজনবীর ঐতিহাসিক সিরিজ উপন্যাস।
.
উৎসর্গ
গর্বিনী মা রেখে যাবে বীরপ্রসবিনী, এই তো সকল মায়ের চিরন্তন চাওয়া। কিন্তু মাত্র সাত মাস বয়সেই ‘ঈশাত নাশরা’ মা বাবার কোল খালি করে চলে গেলো। রেখে গেলো রাজ্যের শূন্যতা।
অসীম দয়াময় আল্লাহর কৃপাধন্য হোট মনিদের ছোটাছুটিতে ভরে ওঠুক মায়ের বিরহী কোল।
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোর ছোটাছুটি আর জীবন্ত কোলাহলে উদ্ভাসিতহোক মায়ের উজাড় আঙিনা–এই আমাদের প্রত্যাশা।
অনুবাদক
.
প্রকাশকের কথা
আলহামদুলিল্লাহ। বর্তমানে এদেশে উর্দুভাষী ঔপন্যাসিক এনায়েতুহ’র পরিচয় দেয়ার নিয়োজন, দ্রুপ বিশিষ্ট লেখক গবেষক ও অনুবাদক শহীদুল ইসলাম-এরও বিশেষ পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নেই।
