“তাহলে ভয়ের ব্যাপারটি কি?”
“আশংকার ব্যাপার হলো, আসেম সুলতানের বিশেষ দূত হিসেবে এসেছে বটে, কিন্তু সে দাউদ ও হিন্দুরাজাদের কাছে আত্মবিক্রি করে তাদের চর হিসেবে গজনী ফিরে যাবে। আসেম সুলতানের জন্যে এক কঠিন প্রতারণার ফাঁদে পরিণত হবে। আমি ভাবছিলাম, কি করে আসেম অথবা আপনাদের সাথে সাক্ষাত করি। কোন সুযোগই করতে পারছিলাম না। সৎ উদ্দেশ্য থাকলে যে কোন কাজে আল্লাহ্ সাহায্য করেন। আপনারা শহর দেখতে বের হলেন, আর এই সুযোগে আল্লাহ আপনাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ করালেন। আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা এখন দূর হয়ে গেল।”
“আমাদেরকে বলা হয়েছে, মুলতান একটি ইসলামী রাজ্য।” বলল একজন নিরাপত্তারক্ষী। অপর একজন বলল, “মুসলমান হওয়ার কারণে সুলতান সুবক্তগীনের সময় থেকেই দাউদ বিন নসর আমাদের সুহৃদ।” ।
“আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছি এই ভেবে যে, সবকিছু জানা থাকার পরও সুলতান মাহমুদ কি করে আপনাদের এখানে পাঠালেন এবং প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখলেন!
তো আমার কাছ থেকে জেনে রাখুন। যাতে আপনারাও আপনাদের কমান্ডারের মতো ওদের জালে আটকা না পড়েন।”
“… মুলতানের শাসন ক্ষমতা কেরামতীদের হাতে। এরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে বটে কিন্তু তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী। যেমন– এরা আখেরাত বিশ্বাস করে না। এরা বিশ্বাস করে, বেহেশত দোযখ দুনিয়াতেই। আখেরাতে শাস্তি-পুরস্কার বলতে কিছু নেই। এরা ইসলামের হারাম হালালকে অস্বীকার করে। ব্যভিচার ও মদপানে উৎসাহিত করে। তারা মনে করে, মানুষকে আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টিই করেছেন ভোগ-বিলাসের জন্যে এবং ইসলামের হারাম হালালের বিষয়টি সম্পূর্ণ অবান্তর। এরপরও মুসলমানদের ধোঁকা দিতে এরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে। প্রকৃতপক্ষে এরা হিন্দু, খৃস্টান ও ইহুদীদের চেয়েও জঘন্য, ছদ্মবেশী ভয়ংকর দুশমন। আব্দুল্লাহ এবং মাইমুন নামের দু’ আরব এ মতবাদের উদ্ভাবক। কোন আরব দেশ থেকে তৃতীয় হিজরী শতকে এদের উত্থান শুরু। তবে এই মতবাদের মূল জনক এক খৃস্টান যাজক। ইহুদীদের সমর্থন ও সহযোগিতাও রয়েছে এদের পিছনে। কারো মতে ইরানের এক বড় অংশ এই কেরামতী মতবাদের অনুসারী।
এ থেকেই বোঝা যায়, এই বাতিল ফেরকা কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসলাম যখন রোম সাগর পেরিয়ে অর্ধেক পৃথিবী তৌহিদের আলোকে উদ্ভাসিত করে তুলে, তখন খৃস্টান ও ইহুদী পাদ্রী ও ধর্মযাজকদের টনক নড়ে। এরা বুঝেছে, কোন সত্য ধর্মকে তার অনুসারীদের হত্যা করে নিঃশেষ করা যায় না। তারা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছে, সত্য ধর্মের অনুসারীদের যদি ধর্মের আবরণে বিভ্রান্ত করা যায় তবেই তাদের ঈমানী শক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়া সহজ। এ হলো একটা পদ্ধতি। অন্য পদ্ধতি হলো, সেই ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও শাসকবর্গকে ধৰ্ম-বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করা। শাসকদেরকে ভোগবাদী ও বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলা ।…
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দৈহিক চাহিদা। যৌন চাহিদা মানুষের সহজাত বিষয় এবং তা পবিত্র বিধিমালার আওতায় প্রশংসনীয় বটে কিন্তু এটাই আবার বিধি-নিষেধের পরিপন্থী পন্থায় চরিতার্থ হলে চরম কদর্য হয়ে দাঁড়ায় । আল্লাহর কাছে তা মারাত্মক অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। তাই আমাদের চির শত্রুরা আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও শাসকবর্গকে বিপথগামী করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে নারী, মদ ও বিত্ত-বৈভব।
ইহুদী খৃস্টানরা আব্দুল্লাহ্ ও মাইমুনকে অপরিমেয় ধন-সম্পদ ও তাদের প্রশিক্ষিত নারী সরবরাহ করে ভৃত্যে পরিণত করে। এরা এদেরকে ব্যবহার করে মুসলিম শাসকবর্গকে বিলাসী ভোগবাদিতায় অভ্যস্ত করতে সক্ষম হয়। ওদের কাজকর্ম সম্পূর্ণ ইসলাম বিবর্জিত হলেও সব বিষয়ে ইসলামের লেবেল এঁটে দেয়। যার ফলে মুসলমানরা বিভ্রান্তির শিকার। দৃশ্যত এরা ইসলামের নাম ব্যবহার করে ভেতরে ভেতরে ইসলামের মৌল আকীদা, হারাম-হালাল, পরকালের আযাব-গযব ও জবাবদিহিতার অনুভূতিটুকুও মানুষের মন থেকে মুছে দিতে তৎপরতা চালায়। আর প্রচার করে, এটাই প্রকৃত ইসলাম। ধর্মান্ধ মুসলমানরা নাকি ইসলামের প্রকৃত রূপ বদল করে মানুষের কাছ থেকে ভোগবাদিতার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। কত জঘন্য এদের কর্মকাণ্ড! কারামাতীরা প্রচার করে, মৃত্যুর পর জান্নাত জাহান্নাম বলতে কিছু নেই। এ সবই নাকি আলেমদের মনগড়া বিষয়। প্রত্যেক মুসলমানের মৌলিক অধিকার রয়েছে দুনিয়াতে সবকিছুর স্বাদ নেয়া এবং ভোগ করার। দুনিয়াতেই জান্নাত জাহান্নাম। যে কেউ ইচ্ছে মতো তার জীবনকে জান্নাতী সুখে ভরে নিতে পারে।…
স্বভাবত মানুষ ভাল কাজের দিকে ধীর লয়ে অগ্রসর হয়, কখনও পিছিয়েও আসে। কিন্তু মন্দ কাজের প্রতি মানুষ খুব দ্রুত অগ্রসর হয়। কারামাতীরা মানুষের এই সহজাত শক্তিটাকে কৌশলে ব্যবহার করছে। ২৯০ হিজরী সনে কারামাতীরা সিরিয়ার ব্যাপক জনসংখ্যাকে বিভ্রান্ত করে সেখানে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঘটাতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে সেখানে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়। ৩১১ হিজরী সনে এরা বসরা ও কুফা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালিয়ে শহর দুটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। আবু তাহের নামের এক কুখ্যাত দস্যুকে তারা সে সময় ক্ষমতায় বসিয়ে মক্কা মুয়াজ্জিমাকেও দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল এই কারামতী গোষ্ঠী।
