আসলে এটা মানুষের সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা। পাপ যখন পূর্ণ অবয়বে মানুষকে গ্রাস করে ফেলে তখন তার সাধারণ বোধটুকুও লোপ পেয়ে বসে, পাপকাজকেই তখন আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। পাপ কাজের পক্ষে তখন যুক্তি খুঁজে ফিরে মানুষের মন। অপরাধকে যৌক্তিকতার লেবেল এটে আরো অপরাধের গভীরে তলিয়ে যেতে যুক্তি সংগ্রহ করে মানুষ । আসেম ওমরের মন থেকেও ইসলামের বিধি-নিষেধ লোপ পেয়ে গেল। ভোগবাদিতায় গা ভাসানোর জন্যে তার পক্ষে দরকার ছিল কিছু যৌক্তিক সাপোর্ট। কিন্তু তা আসেমের মাথায় ছিল না। এই পণ্ডিত লোকটি সেই হারামকে হালাল করণের যৌক্তিক ভিত্তিগুলোই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছিল। আসেমের এ মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল ভোগবাদের পক্ষে এ ধরনের যৌক্তিক বিশ্লেষণ। বুড়ো তাই পরিবেশন করছিল। আরো নিবিড়ভাবে গ্রহণ করতে শুরু করল আসেম বুড়োর যুক্তিগুলো।
আসেম ওমর ছিল সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীর অন্যতম সেরা কমান্ডার। তাকে বিপথগামী করতে পারলে সহজেই সুলতান বাহিনীর বড় একটি অংশকে যুদ্ধবিমুখ করা সম্ভব। সে লক্ষ্যকেই সামনে রেখে হিন্দু রাজা আনন্দ পাল ও বিজি রায়ের নিয়োজিত প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ করেছিল দাউদ।
আসেম ওমর কুচক্রীদের ফাঁদে ফেঁসে গেল। তার কাছে দাউদ পয়গাম পাঠাল, আজ রাজকীয় মেহমান হিসেবে গজনীর বিশেষ দূতকে শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়া হবে। আসেমের জন্যে রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি আনা হয়েছে। যে গাড়িতে স্বয়ং দাউদ চড়ে থাকে। গাড়িটি চারটি বিশেষ ঘোড়া টেনে নেবে। সাথে দেয়া হলো দাউদের বিশেষ নিরাপত্তা রক্ষীদের ক’জন। বিশেষ পোশাকে সজ্জিত এরা। আসেমকে নিয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম হলো সমুদ্রতীরের মনোরম দর্শনীয় জায়গায়।
রাজকীয় বিলাসী ব্যবস্থাপনায় আসেম ভুলে গেল নিজের কর্তব্য কাজ। সে এখন নিজেকে বিশেষ সম্মানিত বোধ করতে লাগল। তার মধ্যে জন্ম নিল রাজা রাজা মনোভাব। সাথীদের খোঁজ-খবর নেয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করল না সে। তারা কোথায় আছে, কিভাবে আছে, সে খবর নেয়ার সুযোগ তার নেই। ওদেরকেও রাজপ্রাসাদ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, আজ তাদের দূরে ভ্রমণের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে তারাও এই সুযোগে শহর ঘুরে দেখতে পারে। সুযোগ পেয়ে তারাও শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ল।
* * *
একজন ভাবগম্ভীর, সুদর্শন বুযুর্গ লোকই মনে হচ্ছিল তাকে দেখে। পরিধেয় পোশাক, মুখের দাড়ি আর কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল, লোকটি বড় ধরনের আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তি। একটি উঁচু দেয়াল ঘেরা বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে থেমে গেল, যখন তার চোখে পড়ল চারজন সৈনিক ধরনের লোকের আগমন। ওদের পোশাক দেখেই তিনি আন্দাজ করেছিলেন, এরা মুসলমান সৈনিক এবং এখানে নবাগত। এদের মুলতানের অধিবাসী মনে হলো না, ভারতীয় মনে করাও কঠিন। বুযুর্গ লোকটি চারজনের পথ রোধ করে দাঁড়াল। মুচকি হেসে বলল, “আপনারা গজনীর অধিবাসী?”
তারা চারজন থেমে গেল এবং হেসে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল ।
“আপনারা কি একটু সময়ের জন্যে আমার ঘরে আসবেন? আমাকে আপনাদের মেহমানদারী করার সুযোগ দিয়ে ধন্য করবেন?” ফারসী ভাষায় বললেন তিনি।
“পরবাসে নিজের মাতৃভাষার আহ্বানে কালবিলম্ব না করে সবাই তার অনুগামী হল। আপ্যায়নের ফাঁকে অতিথিরা জানাল তারা কমান্ডার আসেম ওমরের নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে গজনী থেকে এখানে এসেছে। কমান্ডার আসেম ওমর সুলতানের বিশেষ বার্তা নিয়ে দাউদ বিন নসরের এখানে এসেছেন।
“আসেম ওমর এ মুহূর্তে কোথায়?” জিজ্ঞেস করলেন বুযুর্গ।
“আমরা তাকে শাহী গাড়িতে সওয়ার হয়ে ভ্রমণে বের হতে দেখেছি।” জবাবে বলল এক নিরাপত্তারক্ষী।
“আমি আসেম ওমরের সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছিলাম কিন্তু জানতে পারলাম, সে এখন তার নিরাপত্তারক্ষীদের সাথেও সাক্ষাতের প্রয়োজন বোধ করছে না।” বলল লোকটি।
“কেন? কি হয়েছে?” বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জানতে চাইল এক নিরাপত্তারক্ষী। “এমন কিছু ঘটেনি তো যে তাকে বন্দী করে ফেলা হয়েছে? আর বন্দিশালায় না খেয়ে কষ্ট যাতনায় মৃত্যুবরণ করতে হবে তাকে!”
“সে বন্দিদশা অনেক ভাল যে বন্দিদশায় মানুষ কষ্ট দুর্ভোগ পোহায়, কষ্ট যাতনায় মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু যে জিঞ্জিরে আপনাদের কমান্ডারকে বাঁধা হয়েছে, তা খুব জটিল। এই জিঞ্জিরে মানুষ কষ্ট পায় না বটে কিন্তু তার ভেতরের বিবেক বোধ, ঈমানী শক্তি মরে যায়, সৈনিকের মধ্যে জন্ম নেয় ভীরুতা। এটা এমন এক জিঞ্জির যা হলো নারীর রেশমী চুল আর ঘোড়শী যুবতীদের দেহবল্লরীর মাদকতার বাঁধন। যে কোন সৈনিক এ ধরনের বন্দিদশার শিকার হলে সে সৈনিকের আর যুদ্ধ করার মুরোদ থাকে না, সে হয়ে পড়ে নারীর আঁচলে বাধা পোষা জন্তু। আচ্ছা, গতরাতের নৈশভোজে কি আপনারাও অংশগ্রহণ করেছিলেন?”
“না। আমাদেরকে ভিন্নভাবে খাবার দেয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আমাদের নেয়া হয়নি।” বলল এক নিরাপত্তাকর্মী।
“ওকে গতরাতে শরাব পান করানো হয়েছে এবং গতরাত সে এমন এক যাদুকন্যার বাহুডোরে ছিল যাকে এক কথায় আমরা মায়াবিনী বলে জানি।” বললেন বুযুর্গ।
“আপনিও কি সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন?”
“না, আমি ওখানে যাইনি। দাউদ শাহীর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমার কান ও চোখ সময় সময় শাহী মহলের দিকে তাক করা থাকে। ভেতরের সব খবর আমার জানা। দাউদের কাছে আসেম কি পয়গাম নিয়ে এসেছে সে খবরও আছে আমার কাছে।”
