আবারো পানপাত্র থেকে গ্লাস ভরে মুখের কাছে ধরল তরুণী। তরুণীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারল না আসেম। পান শেষে যখন গ্লাস রেখে দিল তখন তরুণী আসেমের গণ্ডদ্বয় হাতে নিয়ে আদুরে স্পর্শে চোখে চোখ রাখল।
“এটাই জীবন জনাব! এটাই ইসলাম! এতে কোন সাজাও নেই কোন দেনাও নেই।” মাদকতা মেশানো ভঙ্গিতে বলল তরুণী।
আসেমের সামনে অর্ধনগ্ন তরুণী। সে তার ভুবন ভুলানো মোহিনী হাসি আর শরীরের মিষ্টি গন্ধে আপুত। আরো ঘনিষ্ঠ হলো তরুণী। আসেম তরুণীর উষ্ণতায় ভুলে গেল নিজের অবস্থান, কর্তব্য ও আত্মপরিচয়। তার মাথা গুলিয়ে গেল কাম তৃষ্ণায়। তার ঈমানের প্রদীপ নিভে গেল মদ, নারীর দমকা ঝাঁপটায়। ভেসে চলল আসেম আদিমতার নেশায়, জীবনের রঙীন ভেলায়।
সন্ধ্যায় যে সময়টায় মেহমানরা ভোজসভায় আসতে শুরু করে তখন। রাজপ্রাসাদে দাউদকে বাতাসকারিণী দুই তরুণীর একজন নির্জন কক্ষে এক প্রৌঢ়কে বলছিল– “মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিশেষ দূত দাউদ বিন নসরকে কি পয়গাম দিয়েছে। সেই তরুণীই নৃত্য চলার সময় আসেম বিন ওমরকে আপ্যায়নে সহযোগিতা করছিল আর প্রৌঢ় লোকটি দাউদের পাশে বসে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছিল, আপ্যায়নও গ্রহণ করছিল।
সেই লোকটি দাউদকে বলল, “সুলতান মাহমুদের পয়গামে আপনার ভয় পাওয়ার কি আছে! রাজা আনন্দ পাল এবং বিজি রায় মহাশয়দ্বয় আপনার রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাদের প্রতিনিধি হিসেবেই আপনার এখানে রয়েছি আমি। যে কোন সমস্যায় আপনার জন্যে রাজাদের ভরপুর সহযোগিতা নিতে পারব আমি। সুলতান মাহমূদ একজন সাম্রাজ্যবাদী। রাজ্য বিস্তারে হিন্দু মুসলমান তার কাছে সমান। আপনার লাভ ক্ষতিতে তার কিছু যায় আসে না। সে তার নিজের স্বার্থে আপনাকে ব্যবহার করতে চায় মাত্র।”
“আপনি কি আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না?” প্রৌঢ়কে প্রশ্ন করল দাউদ। “আপনাদের সাথে যে মৈত্রীর বন্ধন যে কোন মূল্যে তা অক্ষুণ্ণ রাখতে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আপনি কি খেয়াল করেননি, ইসলামের আত্মশক্তিকে আমি কিভাবে বিদায় করেছি আমার প্রশাসন থেকে আপনি খেয়াল করেননি, মুসলমানদের হৃদয় থেকে আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের বিষয়াদি আমি কত কৌশলে নির্মূল করছি? আপনাকে কে ধারণা দিল যে, আমি সুলতান মাহমুদের প্রত্যাশা পূরণ করব? দেখুন না ওর জন্যে কি ব্যবস্থা আমি করেছি! যে মেয়েটিকে আমি দূতের সেবায় নিয়োগ করেছি, যে কোন কঠিন আদর্শের অধিকারী পরহেযগার মুমেনকেও সে তার যাদুকরী কৌশলে ঈমানহারা করতে সক্ষম। তাকে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়ে সেভাবেই তৈরি করেছি। দেখবেন সে দূত বেচারাকে ভেড়া বানিয়ে ছাড়বে।”
“এটাই যথেষ্ট নয় জাঁহাপনা! এই ব্যক্তি যেমন সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা, আমিও সামরিক বাহিনীর অফিসার। আমিও আপনাকে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেই পরামর্শ দিচ্ছি। আমার বিশ্বাস, আপনি সুলতান মাহমূদকে মোটেও পছন্দ করেন না। আপনি এটাও আশা করেন যে, সুলতান মাহমুদের মতো আপদকে দূরে রেখেই যাতে ঠাণ্ডা করে দেয়া যায়। এজন্য আপনি এই দূতকে ব্যবহার করতে পারেন। আপনি দূতকে বলে দিন, সুলতান মাহমুদের অগ্রাভিযানে তার সৈন্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন আপনি। এ আশ্বাসের ভিত্তিতে ওরা যখন এগিয়ে আসবে, তখন আনন্দ পালকে বলে তার সৈন্যদের আমি সুবিধা মতো জায়গায় বসিয়ে রাখবো। ধারণাতীতভাবে আনন্দ পালের সৈন্যরা খেল খতম করে দেবে।”
“দূতের ব্রেন ওয়াশের ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। দেখেননি, শরবত মনে করে কতো গ্লাস খাঁটি মদ গিলেছে বেটা। এরপর যেটুকু হুশ-জ্ঞান থাকবে, সেটুকুও দূর হয়ে যাবে মেয়েটির কৌশলী পরিচর্যায়।” বলল দাউদ।
আসেম ওমরের চার দেহরক্ষী দাউদ বিন নসরের দেহরক্ষীদের সাথে আহার করল। ওরা ঘুর্ণাক্ষরেও জানল না, তাদের দূত দাউদ বিন নসুরের বালাখানায় এক রাতের স্বর্গবাসে মত্ত।
যে আসেমের ঘুম ভাঙতো অতি প্রত্যূষে, সেই আসেম সূর্যোদয়ের সময়ও গভীর ঘুমে তলিয়ে রইল। বেলা অনেক উপরে উঠার পর চোখ মেলল আসেম। চোখ মেলেই ঘাবড়ে গেল সে। গত রাতের ঘোর কেটে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠল তার কাছে। ঠিক এ সময়ে ঘরে প্রবেশ করল সেই তরুণী। তার মুখে স্মিত হাসি আর হাতে তশতরী।
আসেম তাকে লক্ষ্য করে বলল, “গত রাতে তুমি আমাকে গুনাহগার করে । দিলে। এখানে আমি বিশেষ এক কাজে এসেছিলাম। কিছুটা আতংকিত কণ্ঠ আসেমের।
তরুণী তশতরী টেবিলের উপর রেখে দুধের একটি গ্লাস আসেমের হাতে ধরিয়ে দিল কিন্তু আসেম টেবিলে রেখে দিল গ্লাস। বলল, “গত রাতে কি ঘটেছিল তা না বলা পর্যন্ত তোমার হাতের কিছুই আমি স্পর্শ করব না।”
“তুমি জাহান্নাম থেকে জান্নাতে এসেছে! বুঝলে? এটার নাম জীবন, এটাই জিন্দেগী। বেঁচে থাকার সার্থকতা এখানেই।” বলল তরুণী।
এমন সময় এক শ্বেতশুভ্র শশ্রুধারী দীর্ঘ জুব্বা পরিহিত সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ প্রবেশ করল সে কক্ষে। স্বগতোক্তি করতে লাগল– “হতভাগ্য তোমাদের বাদশাহ! যাকে তোমরা সুলতান বলে থাকে। তার প্ররোচনায় জীবনের এই স্বাদ এই প্রাপ্তিকে তোমরা পাপ বলছে। অথচ জীবনে এতটুকু ভোগ করার অধিকার তোমাদের প্রাপ্য। কিন্তু সে তোমাদের জীবনকে বিষাদময় করে দিয়েছে। জীবনের স্বাদকে তোমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে নিজের স্বর্গবাসকে নিশ্চিত করতে চায় সে। এজন্য তোমাদের দিয়ে সে যুদ্ধ করায়, রক্তের হোলি খেলে। আর নিজে থাকে নিরাপদে। কে তোমাদের বলেছে যে, ইসলামে আরাম-আয়েশ, এতটুকু বিনোদন হারাম?” বুদ্ধের বলার ঢঙ এবং ভাষার কারুকাজ এতো নিপুণ এবং কণ্ঠ এতো মধুর যে, আসেম ওমর রাতের তরুণীর মতো বুড়োর কাছে নিজেকে কখন সঁপে দিল টেরই পেল না। সে এতোটাই বুড়োর কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ল যে, বুড়োর প্রতিটি কথাকে তার মনে হচ্ছিল জীবনের প্রতিচ্ছবি, সত্য ও বাস্তবতার প্রতীক।
