মাটি আর খুন এই দু’য়ের সাথে ছিল আসেমের মিতালী। রণাঙ্গনের ভয়াবহ দৃশ্য আসেমের প্রিয়। মরা এবং মারা এই ছিল আসেমের নেশা, ভালবাসা । আসেম তার সুলতানের চরিত্রেও এই রঙ-ই দেখে আসছে। সুলতানের দরবারে আসেম ধুলোবালির যে আস্তরণ দেখে, সেই ধুলো মাটির চরিত্র-আদর্শ সে সুলতানের মাঝেও দেখেছে। সুলতানের দরবারে এ ধরনের রঙিন ফানুস কল্পনা করাও মুশকিল।
দাউদ বিন নসরের দরবারে আসেম নৃত্যরত নর্তকীদের যে নাচের মুদ্রা দেখেছে, উদ্ভিন্ন যৌবনা উর্বষী তরুণীদের স্নায়ু উদ্দীপক যে অঙ্গভঙ্গি আসেম প্রত্যক্ষ করল, তাতে তার মধ্য থেকে যোদ্ধার আদর্শ বিলীন হয়ে মনের ভেতর ভোগবাদী লিপ্সা জেগে উঠেছে। ভেতর থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে আসেমের ঘুমিয়ে থাকা কাম প্রবৃত্তি। যুদ্ধ ময়দানের বীভৎস রক্তাক্ত রূপের প্রতি তার মনে জন্ম নিতে লাগল প্রচণ্ড ঘৃণা। যুদ্ধাহত সৈনিকের রক্ত-রাঙা চেহারা আর তপ্ত খুনের গন্ধ তার মনের মধ্যে তীব্র বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করল, তদস্থলে জন্ম নিল ভোগের উন্মাদনা। দাউদ বিন নসরের এই কামোদ্দীপক রগরগে আয়োজন আসেমের ভেতরকার যোদ্ধাকে অল্প সময়ের মধ্যে আমূল বদলে দিল। সে অনুভব করল যুদ্ধের ক্লান্তি, ক্ষুধা-পিপাসার যাতনা। তার দু’পা এখন রণাঙ্গনের অশ্বারোহণে অক্ষম। তার তাবৎ সাহস, শক্তি ও প্রশিক্ষণ বিলীন হয়ে সেখানে উঁকি দিল ভীরুতা এবং যুদ্ধাবেগের স্থান দখল করল যৌবনের উন্মাদনা।
তরুণী দু’টি নৃত্য প্রদর্শন করে চলে যাওয়ার পর এলো চৌদ্দ পনেরো বছরের এক বালক। বালক হলেও তার চেহারা তরুণীদের চেয়ে আরো বেশি মোহনীয়। বালকটি আরো বেশি যৌন উদ্দীপক নৃত্য প্রদর্শন করতে শুরু করল। বালকের সাথে সমান তালে সহযোগী হলো অন্য দুটি তরুণী। এরা প্রত্যেকেই স্বল্পবসনা। এদের যৌথ নৃত্য উপস্থাপনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল আসেম । তার দৃষ্টি ওদিকেই নিবদ্ধ। আশপাশের কোন খেয়াল নেই, কে কোথায় কি করছে।
ঠিক এ মুহূর্তে তার কানের কাছে রিনঝিন শব্দ। উপরের দিকে চোখ তুলল আসেম। দেখল, নর্তকীদের মতোই এক উষী যুবতী শ্বেত শুভ্র রুপালী তশতরী হাতে তার সামনে দণ্ডায়মান। হাতে একটি পানপাত্র। তরুণীর ঠোঁটে ঈষৎ মুচকী হাসি, এমন মোহনীয় হাসি কখনও প্রত্যক্ষ করেনি আসেম। তরুণীর সলজ্জ গ্রহণের আবেদন আর আপ্যায়নের মাদকীয় ভঙ্গি আসেমকে মর্তে নামিয়ে দিল।
আসেম তরুণীকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলল, “এটা হয়তো শরাব। আমি শরাব পান করি না। আমি মুসলমান।”
“শরাব নয় শরবত।” আসেমের সামনের টেবিলে তশতরী রেখে শৈল্পিক ভঙ্গিতে পানপাত্র সুরাহী থেকে ভরে দিল তরুণী।
একটা শংকা মনে চেপে রেখেই পানপাত্র হাতে নিল আসেম। চুমুক দিল পান পাত্রে। মুহূর্তের মধ্যে অনুভব করল এক অজানা ভাল লাগার অনুভূতি। আসেম ওমর অনুভব করল এক অভাবিত স্বাদ-তৃপ্তি। সে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাল তরুণীর দিকে আহ্! কি স্বাদ! এ কি শরবত না জান্নাতের নেয়ামত! কিন্তু জিজ্ঞেস করার অবকাশ হলো না। তরুণীর চোখে চোখ পড়তেই ওর মাদকীয় হাসিতে হারিয়ে গেল আসেমের কণ্ঠ। আরো গভীর আবেশে তলিয়ে গেল আসেম । পুনরায় সোরাহী থেকে পানপাত্র পূর্ণ করে দিল তরুণী। অব্যক্ত ভঙ্গিতে নিবেদন করল, পান করুন সম্মানিত মেহমান! আপনাকে পান করিয়ে মাতাল করাই আমার কাজ। ভেসে চলুন স্বপ্নময় আগুনের দিকে। ইত্যবসরে আসেমের সামনে হাজির হল আরো বড় ধরনের একটি তশতরী নিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর বালক। এ তশতরিতে ভুনা করা পাখি। তশতরী থেকে ভাপ উঠছে। মন ভুলানো স্বাদের গন্ধ। সে গন্ধে যে কোন ভোজনবিমুখ মানুষও আহারে প্রলুব্ধ হতে বাধ্য।
আশপাশে একবার চোখ বুলাল আসেম। সমবেত প্রত্যেক মেহমানের সামনে এ ধরনের পাখি ভুনার করা পাত্র রাখা হচ্ছে।
তরুণী ও বালক চলে গেছে। এবার সাগ্রহে আসেম তশতরী থেকে তুলে নিল একটি ভুনা পাখি। এক লোকমা মুখে পুরে চুমুক দিল পেয়ালায়। পাখির স্বাদ আর শরবতের তৃপ্তি বিস্মৃত করে দিল আপন কর্তব্য। একের পর এক পাখি ও আর পানপাত্র ভরে গলাধঃকরণ করতে থাকল আসেম। তৃপ্তির সুখে ভাসতে অ লাগল অন্য এক আসেম।
এই ফাঁকে বার কয়েক তার কাছে এলো সেই তরুণী ও বালক। খালিপাত্র তুলে নিল আর ভর্তি পাত্র রেখে দিল। সেদিকে খেয়াল ছিল না আসেমের। ৬ কতগুলো পাখি আর কত গ্লাস পানীয় পেটে চালান করেছে সে আন্দাজও ছিল না তার। চোখ দুটো গোল হয়ে এলো। মাথা কিছুটা ভারী ভারী মনে হল। খাবার পরিবেশনকারিণী তরুণী তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল একটি কক্ষে। অস্বাভাবিক সুন্দর পরিপাটি সাজানো কক্ষ। বিশাল এক পালঙ্ক। তুলতুলে তোষকের উপর রেশমী গালিচা। আসেম ঠিক মতো পা ফেলতে পারছিল না। কক্ষের দরজায় গিয়ে অনুভব করল, সে হয়তো ভুল করে শাহী কক্ষে ঢুকে পড়েছে। এমন বিলাসী বিছানা সে কল্পনা করতে পারছে না। কিন্তু তরুণী তাকে হাত ধরে বসিয়ে দিল পালঙ্কের উপর। মাথা থেকে পাগড়ী খুলে রেখে দিল পাশের। টেবিলে।
“আহ! যা পান করালে সেটাতো শরবত নয় শরাব!” জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাল সে তরুণীর দিকে।
“আমরাও মুসলমান। এখানে ওই ধরনের শরাব পান করা হয় না, কাফের বেঈমানরা যেসব শরাব পান করে। আমরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরী। আমরা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি।” বলল তরুণী।
