“আপনার জবাবে আশ্বস্ত হতে পারলাম না। আপনার কাছ থেকে এ জবাব নিয়ে গেলে সুলতান নিশ্চিত হতে পারবেন না। সেনারা তো আপনার মতো আমার মতো সেনাপতিদের কমান্ডে অগ্রাভিযান চালাবে, কাজেই সমূহ বিপদ আশংকার বিষয়টি আমাদেরকেই ভাবতে হবে। আমি আসার সময় এ অঞ্চলের পথ ঘাট দেখে এসেছি। এলাকাটি আমাদের জন্য নিরাপদ হলেও পাহাড়ের চূড়া থেকে তীরন্দাজদের টার্গেট হওয়ার আশংকা প্রবল। কাজেই সেনাবাহিনীর জন্যে পথটি মোটেও সুগম নয়। আপনার কাজ হবে আগে থেকে আপনি আপনার তীরন্দাজ সেনা ইউনিটকে ওই এলাকায় পাহারায় নিয়োগ করবেন, যাতে আমাদের সেনারা নিরাপদে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো অতিক্রম করতে পারে।”
“এ কাজ করতে হলে আমাদের তীরন্দাজদেরকে আমাদের প্রশাসনিক এলাকার বাইরে হিন্দুদের এলাকায় পাঠাতে হবে।” বলল দাউদ বিন নসর।
“লুগমান ও গজনী কখনও জয়পালের এলাকা ছিল না। অবশ্য লুগমান ও হিন্দ আমাদের এলাকাও ময়। কিন্তু জয়পাল আমাদের এলাকাতে সেনা অভিযান করেছে, এর জবাবে আমরা তাদের এলাকায় অভিযান চালাচ্ছি। আপনি কি একথা ভুলে গেছেন, যে এলাকা এরা শাসন করছে তা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা আমাদের ভূমি তাদের দখলমুক্ত করতে চাচ্ছি।”
গভীর চিন্তায় তলিয়ে গেল দাউদ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আসলে আপনার সুলতানের চাহিদার জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া মুশকিল। এজন্যে আমার ভাবতে হবে। উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করতে হবে। আপনি এখানে চারদিন অপেক্ষা করুন। শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখুন, আমি আমার উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে নেই। আজ থেকে আপনি রাজকীয় অতিথি। আজ রাতে আপনার সম্মানে ভোজসভা হবে। সেই সভায় আপনার সম্মানে বড় ধরনের আপ্যায়ন ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে।”
সত্যিই নৈশভোজের আয়োজন ছিল রাজকীয়। অনুষ্ঠানের বিলাসী আয়োজন দেখে আসেম ওমরের চোখ ছানাবড়া।
প্রাসাদের বাগানে আয়োজন করা হলো নৈশভোজের। রঙ-বেরঙের ঝাড়বাতি, জরিদার শামিয়ানা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মনমাতানো প্যান্ডেল। ঝাড়বাতিগুলো দেখে আসেমের কাছে মনে হলো, সোনা ও রুপার তৈরি কতগুলো জ্বলন্ত তারা। বহু বর্ণের ফানুস এবং জরিদার কারুকার্যময় শামিয়ানার সাথে ঝুলানো ঝাড়বাতিগুলোর নীচে অবস্থানরত মানুষগুলোর গায়ের রং যেমনই হোক না কেন সবাইকে ফর্সা আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী মনে হচ্ছিল।
অভাবিত এই মজলিসের বর্ণাঢ্য আয়োজনে আসেম এমনই প্রভাবিত হয়ে পড়ল যে, সে ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল। মনে হতে লাগল, সে কোন স্বপ্নলোকে বিচরণ করছে। তবলার ও ঢোলের হাল্কা বাজনার তালে মঞ্চে একটি নর্তকী নাচের নানা মুদ্রা উপস্থাপন করছে। যেন একটি নাগিনী ফনা তুলে খেলছে শিকার নিয়ে। নর্তকী ষোড়শী যুবতী। দুই বাহু সম্পূর্ণ খোলা, পরনের কাপড় অতি সূক্ষ্ম। নাভীর নীচে কতগুলো রেশমী সূতোর পাকানো ঝালর দোল খাচ্ছে নাচের তালে তালে। এমন দোলনীতে তার উরুসন্ধি বারবার প্রকাশ পাচ্ছে। বুকের স্বল্পবসন তরুণীর যৌবনকে ফুটন্ত গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত করছে। তরুণীটি হয়তো এমনিতেই সুন্দরী, কিন্তু আলোর বর্ণাঢ্য রঙ-এর প্রতিবিম্ব ওকে এভোই মায়াবী ও মোহনীয় করে তুলেছে যে, ওর রেশমী চুলের বাহার আর রুপোর মতো দাঁতের মুক্তা ঝরানো হাসিতে অনুষ্ঠানের সকল পুরুষের দৃষ্টি ওর দিকে নিবদ্ধ হতে বাধ্য।
নর্তকীটি বাজনার উচ্চাঙ্গ তালে নাচতে নাচতে আসর কাঁপিয়ে হারিয়ে গেল। যেন কোন জলপরী জলতরঙ্গের মধ্যে খেলা করে হঠাৎ জলরাশির মাঝে তলিয়ে গেল। বাজনা বদলে গেল। নতুন করে শুরু হল অন্য সুর। এবারের বাজনার তাল লয় ভিন্ন, আরো উগ্র, আরো তীব্র। ঠিক এ সময়ে জলরাশির ভেতর থেকে যেন হঠাৎ করে দৃশ্যমান হলো আরেক নর্তকী। যেন কোন জলপরী পানির তলা থেকে ভেসে উঠেছে। এটি আগের তরুণীর চেয়ে আরো স্বল্পবসনা, আরো বেশি উদ্দীপক। এর নাচ ও তাল আরো মোহনীয়।
আসেম বিন ওমর দাউদ বিন নসর থেকে দূরে। শত শত মেহমানের সাথে উপবিষ্ট। সবাই জানে, আজকের এ আয়োজন সুলতান মাহমূদের বিশেষ দূতের সম্মানে। কিন্তু কে কোথায় আর মেহমানই বা কে সে খবর নেয়ার খেয়াল নেই কারো। সবার দৃষ্টি মঞ্চের নৃত্যরত কিশোরীদের দিকে। ওদের নাচ আর যন্ত্রীদের বাজনা সমবেত সবাইকে আবেগের শৃঙ্গে পৌঁছে দিল। যুবতীদের নাচের মুদ্রা আর শারীরিক কসরত থেকে চোখ ফেরানো কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। আসেম ওমর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নর্তকীর প্রতি। এতো সুন্দর, এতো আকর্ষণীয় হতে পারে নারী, সে তা কখনও ভাবতেই পারেনি। নর্তকীর নিক্কনের ঝংকারে কোথায় যে হারিয়ে গেল আসেম তার খবর কে রাখে।
এর আগে শরীরের কাঁপুনি ঝাঁকুনি আসেম দেখেনি তা নয়, তবে সেই কাঁপুনি ঝাঁকুনি নর্তকীর নয়। যুদ্ধ ময়দানে আহত মৃত্যু পথযাত্রী সৈনিকদের, যুদ্ধরত সিপাহীদের যারা আহত হয়ে মাটিতে-মরুতে কিংবা পাহাড়ী পাথুরে জমিনে তড়পাতে তড়পাতে নিস্তেজ হয়ে চিরদিনের জন্যে স্থির হয়ে গেছে। গত বিশ বাইশ বছর যাবত আসেম দেখেছে যুদ্ধাহত সৈনিকের মৃত্যু যন্ত্রণার ছটফটানি। সেখানে দোস্ত-দুশমনের একই রঙ, একই কাতর ধ্বনি।
