“এসব আদব রক্ষা না করা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তবে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ এ আদব সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। আমি কি উপঢৌকন পেশ করতে পারি?” বলল আসেম ওমর।
“হ্যাঁ, অনুমতি দেয়া হলো।”
“দরবারের বাইরে আসেম ওমরের চার সাথী দাঁড়ানো। উপঢৌকন ছিল তাদের কাছে। আসেম দ্রুত পায়ে দরবার থেকে বেরিয়ে তাদের গিয়ে বলল, তোমরা এগুলো নিয়ে চল। উপহার সামগ্রীর মধ্যে কিছু ছিল খুব দামী হিরা মণিমুক্তার অলংকার এবং গজনী এলাকার দামী আসবাব। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি জিনিস ছিল রাজা জয়পালের তরবারী। এই তরবারীটি সর্বশেষ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণের সময় সুলতানের কদমে উৎসর্গ করেছিল জয়পাল এবং বলেছিল, “দয়া করে আমাকে প্রাণভিক্ষা দিন। আর জীবনে কখনও আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দুঃসাহস করব না।”
আসেম ওমর অগ্রসর হয়ে তরবারীটি দাউদ বিন নসরের পায়ের কাছে রেখে দিল।
“কোন পয়গাম আছে কি?”
“আমাকে কি একাকী কথা বলার সুযোগ দেয়া হবে?”
দরবারীদের দিকে চোখ ফেরাল দাউদ। সবাই উঠে চলে গেল বাইরে। রয়ে গেল মাত্র দুটি যুবতী। এরা দাউদের কুরসীর পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে বাতাস করছিল। দাউদের ইশারায় তার সিংহাসনের কাছে রাখা একটি আসনে গিয়ে বসল আসেম। ‘
“এই দরবারের নিয়ম-কানুন আমাকে রক্ষা করতেই হয়, না হয় শাসন কাজ চালানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।” কিছুটা নমনীয় কণ্ঠে বলল দাউদ। “এসব নিয়ম রক্ষা করা আমাদের একটা সমস্যা। আর আপনার জন্যে সমস্যা হয়েছে এসব আইন-কানুন সম্পর্কে জানা না থাকা। আচ্ছা, আপনি কি লিখিত কোন পয়গাম এনেছেন?”
“জ্বী-না। পথে শত্রুদের হাতে সংবাদ হস্তগত হওয়ার আশংকায় সুলতান কোন লিখিত পয়গাম দেননি। আমি সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার। যেহেতু পয়গামটিও সামরিক কৌশল বিষয়ক, এজন্য সুলতান আমাকে পাঠিয়েছেন মৌখিক পয়গাম দিয়ে, লিখিত পয়গাম দেননি।”
“আপনি জানেন, রাজা জয়পাল পর পর তিনবার আমাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকবার সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। প্রত্যেকবারই সে মোটা অংকের জরিমানা দিয়ে আর যুদ্ধ না করার অঙ্গীকার করেছে কিন্তু কোন অঙ্গীকারই সে রক্ষা করেনি। শেষ পর্যন্ত তাকে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে হলো। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুত মুক্তিপণ তার স্থলাভিষিক্ত পুত্র আনন্দ পাল আজো পর্যন্ত আদায় করেনি। বরঞ্চ পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তার সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেয়ার খবর পেয়েছি আমরা।”
যে দুই যুবতী দাউদ বিন নসরের পিছনে দাঁড়িয়ে বাতাস করছিল এরা উৎকর্ণ হয়ে উঠল।
“আপনি জানেন যে, আমাদের রাজধানীকে নিরাপদ করতে আমরা লুগমান ও পেশোয়র কজা করে নিয়েছি। চুক্তি মতে পাঞ্জাব আমাদের শাসনাধীন। আনন্দ পাল ও পাটনার শাসক বিজে রায় আমাদের নিয়োজিত শাসক। সুলতানের অনুমোদন ছাড়া তাদের কোন নির্দেশ জারি করার অধিকার নেই–এরা আমাদের সুলতানের অধীনে তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করবে মাত্র। কিন্তু উভয়েই রাজা জয়পালের কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। তাই অন্যান্য হিন্দু রাজাদের নিয়ে এরা যাতে আবার সেনা অভিযান চালাতে না পারে সেজন্য সুলতান ইচ্ছা করছেন লাহোরে । অগ্রাভিযান করবেন। সুলতানের উদ্দেশ্য দুটি। শাসকদের পীড়ন থেকে সাধারণ নাগরিকদের মুক্তি দেয়া এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বহু ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত একটি মুসলিম রাজ্য আজ মূর্তির বাগাড়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে আবার তাওহীদের তাকবীর ধ্বনি উচ্চকিত করাই সুলতানের উদ্দেশ্য।”
“এ পরিকল্পনায় আমরা কি করতে পারি।” জিজ্ঞেস করল দাউদ।
“যেহেতু আমি সৈনিক, এজন্য সামরিক ঢংয়ে কথা বলছি। আমরা বিজি রায় এবং আনন্দ পালের অবস্থানের মাঝামাঝি স্থানে একটি ঘাঁটি স্থাপন করতে চাচ্ছি। আপনি যেহেতু উভয়ের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করছেন এজন্য আপনার এলাকাকে ঘাঁটি স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বিবেচনা করছি। আমরা ঘাঁটি স্থাপন করেই মুসলমান অধিবাসীদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে শুরু করব। এতে আপনাদের যেমন ফায়দা হবে আমরাও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব। এটা হবে উভয়ের জন্যে উপকারী। আমরা এখানে এলে আপনার দিকে চোখ। তুলে তাকানোর সাহস পাবে না পৌত্তলিকরা। প্রয়োজনের সময় আমরা একে অন্যের সহযোগিতা করতে পারব। এ ব্যাপারে সুলতানের প্রয়োজন আপনার পক্ষ থেকে নিশ্চিত আশ্বাস। আপনার কাছ থেকে আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা চাই যে, আমরা যখন পেশোয়ার থেকে মুলতানের দিকে অগ্রাভিযান করে আপনার এলাকা অতিক্রম করব তখন যদি বিজি রায় কিংবা আনন্দ পাল আমাদের পথ রোধ করে তবে পিছন থেকে অথবা এ পাশ থেকে আপনি ওদের উপর হামলা করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবেন। তাহলে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে আমাদের সুবিধা হবে। আমরা কখন-ই আপনাকে একা ছেড়ে দেবো না। প্রয়োজনে আপনার জন্য আমরা আমৃত্যু লড়ে যাব।”
”সুলতান মাহমূদ অভিযান পরিচালনা করতে চাইলে তিনি তা করতে পারেন। আমরা তো আর তাকে বাধা দিতে পারব না। কিন্তু দুই রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো সৈন্য আমাদের নেই।” বলল দাউদ বিন নসর।
