“আপনি যদি আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করেন, তবে অভিমত হলো– এখনই আমাদের লাহোরের দিকে অগ্রাভিযান করা উচিত। তবে এর আগে হিন্দুস্তানে আমাদের একটি ঘাঁটি তৈরি করতে হবে, যাতে আমরা আরো অগ্রসর হতে পারি এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারি।” বলল অপর এক সালার।
“ঘাটি আমাদের আছে।” বললেন সুলতান। “মুলতানকে আমরা ঘাটি মনে করতে পারি। মুলতানের শাসক আবুল ফাতাহ দাউদ বিন নসর একজন মুসলমান এবং আমাদের সুহৃদ।”
“জাঁহাপনা! দাউদ বিন নসর মুসলমান বটে, কিন্তু সে একজন কারামাতী, আপনি কারামাতীদের অতীত ইতিহাস জানেন, তাদের উপর ভরসা করা ঠিক নয়।” বলল উজীর।
“সে তো সুলতান সুবক্তগীন মরহুমের সাথে মৈত্রীচুক্তি করে প্রয়োজনের সময় একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। সে আমাদের ধোকা দিতে পারে না।” বললেন সুলতান।
“আলীজাহ! চিহ্নিত দুশমনের উপর নির্ভর করা যায় কিন্তু, স্বজাতির গাদ্দারদের বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।” বলল উজির।
“আগামীকাল প্রত্যূষে একজন দূত পাঠিয়ে দিন। আমার বিশ্বাস, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয় ভূমি থেকে আমরা আশানুরূপ সহযোগিতা পাব। দাউদ বিন নসর হিন্দু বেষ্টিত এলাকায় থাকে, সে হিন্দুদের মনোভাব আমাদের চেয়ে ভাল জানে। আমার মনে হয়, আমাদের অভিযানের সংবাদে সে খুশি হবে। তার সহযোগিতা আমাদের যেমন প্রয়োজন, তারও আমাদের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। আমার ইচ্ছা, সেখানে সামরিক দূত পাঠাব।”
“এ কাজে আসেম ওমর সবচেয়ে উপযুক্ত। বাহাদুর, উদ্যমী এবং চৌকস সেনা অফিসার। কথা বলার কৌশল জানে ভাল।”
“আসেম ওমর। কে যেন আমাকে বলেছিল, সে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভদ্রলোক।” বললেন সুলতান।
“যুদ্ধ-কৌশল ও সামরিক বিষয়াদি সম্পর্কে আসেম ভাল জ্ঞান রাখে। সে একটা বিষয় যেমন বুঝে অপরকেও বোঝাতে পারে। রণাঙ্গনে শত্রুসেনাদের সামনেও সে স্বাভাবিক ভাবটা ধরে রাখতে পারে। এটা তার একটা বড় গুণ।” বলল সিপাহসালার।
“আপনি যদি মনে করেন সে-ই উপযুক্ত, তবে আমার দ্বিমত নেই। ওকে ডেকে পাঠান।” বললেন সুলতান। “আমি তাকে মৌখিক পয়গাম দেবো । কোন লিখিত পয়গাম দেবো না। কারণ, তাকে শত্রু এলাকা অতিক্রম করে যেতে হবে। লিখিত পয়গাম শত্রুদের হাতে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।”
আসেম ওমর সুলতানের পয়গাম নিয়ে মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসরের দরবারে হাজির হয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। দাউদ বিন নসর-এর দরবারের জাঁকজমক দেখে আসেমের মনে হলো, দাউদ বিন নসর যেন সারা ভারতবর্ষের মহারাজা। সুলতান মাহমূদ এবং সুলতান সুবক্তগীনের রাজদরবারে আসেম ওমরের মতো কর্মকর্তা কেন সাধারণ সৈনিকেরাও সুলতানের পাশাপাশি বসে কথা বলতে পারে, কিন্তু দাউদ বিন নসরের দরবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুউচ্চ রাজ আসনে বসা দাউদ বিন নসর। আসনের নীচে সব কর্মকর্তা দাঁড়ানো।
অবস্থা দৃষ্টে আসেম নিজেকে দাউদ বিন নসরের সামনে অতি নগণ্য মনে করল। কী শান-শওকাত দাউদ বিন নসরের। তার দু’পাশে পরীর মত অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতীরা পাখায় বাতাস করছে। মাথার উপরে বাহারী শামিয়ানা, রঙ বেরঙের ঝাড়বাতি। নীচে সামনে অতি সাধারণ কয়েকটি আসনে মন্ত্রীপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বসার ব্যবস্থা। ওরা দাউদ বিন নসরের সামনে পাথরের মূর্তির মতো স্থির।
“প্রজাদের ত্রাণকর্তা, মহামান্য রাজা! সুলতান মাহমুদ বিন সুবক্তগীনের দূত দরবারে উপস্থিত।” উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করল একজন ঘোষক।
আসেম ওমর এদিক সেদিক তাকাল। কিন্তু ঠাহর করতে পারল না, এ আওয়াজ কোত্থেকে এলো।
“গজনীর দূতকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।” বলল দাউদ। “কি সংবাদ নিয়ে এলে?”
“আপনার জন্যে কিছু উপঢৌকন নিয়ে এসেছি।” হতচকিত হয়ে বলল আসেম। নিজেকে সামলিয়ে বলল, “আগে আপনার খেদমতে সেগুলো পেশ করার অনুমতি চাচ্ছি।”
“সুলতান মাহমূদ কি তোমাদেরকে রাজ-দরবারের আদব শেখায়নি?” কিছুটা তাচ্ছিল্য মেশানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল দাউদ!
“আলীজাহ্! আমাদের ওখানে এমন দরবারের ব্যবস্থা নেই। সুলতানের অধিকাংশ মজলিস হয় কোন ময়দান কিংবা সাধারণ ঘরে। সেখানে আমরা সবাই একসাথে বসে কথা বলি।”
“এটা কোন যুদ্ধ ময়দান নয় সম্মানিত অতিথি! আমার এখানে কোন লোকের আমার অনুমতি ছাড়া কাশি দেয়াও বেয়াদবী।”
“সুলতান হয়তো আমাকে কোন ভুল জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাকে বলা হয়েছিল, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয় স্মৃতিবাহী ভূমির সর্বশেষ শাসকের কাছে আমাকে পাঠানো হচ্ছে। আমি তো মনে করেছিলাম, শত শত মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করে আসা আরব মুজাহিদের মতো মুহাম্মদ বিন কাসিমের স্মৃতিবাহী এ রাজ্যের শাসকও হবেন আরব যোদ্ধাদের মতো তাবুর অধিবাসী।”
“তোমাকে কে বলল, আমি মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরী। তোমরা ইতিহাস সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। আমরা এখানকার বিজয়ী শাসক। আমার দাদা আহমদ খান লোদী এই এলাকা জয় করে শাসন ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলে কারামতী আদর্শের প্রবর্তক। তবুও আজকের জন্য তোমাকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের রাজ্য বলার অধিকার দেয়া হলো। আমরা মুসলমান। আমাদের ভিন্নধর্মী মনে করার কারণ নেই। কিন্তু আমাদের রাজদরবারের একটা নিজস্ব নিয়ম-কানুন রয়েছে বৈকি।”
