রাজা যখন রাজমহলের পার্শ্ববর্তী বাগানে উপনীত তখন সবাই এটা দেখে আশ্চর্য হলো যে ওখানে চিতা তৈরি করা হয়েছে। চিতায় কাঠের স্তূপ করে রাখা হয়েছে হিন্দু মরদেহ পোড়াতে যেভাবে রাখা হয়। কিন্তু সেদিন রাজমহলের কারো মৃত্যুর কথা কেউ জানে না। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই বিস্ময়াভিভূত। চিতায় রাজা পৌঁছার আগেই চিতায় তেল ঢেলে দেয়া হয় এবং চিতার পাশে জ্বলন্ত মশাল হাতে এক ব্যক্তি দাঁড়ানো। আরো ক’জন লোক কোন মরদেহ সকারে অপেক্ষা করছে।
কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই রাজা জয়পাল কাউকে কিছু না বলে চিতায় উঠে দাঁড়াল। মশালের দিকে হাত বাড়ালে লোকটি জ্বলন্ত মশাল রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা তেলে ভেজানো কাঠের স্তূপে দাঁড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। জয়পালের ছেলে দৌড়ে রাজাকে চিতা থেকে নামানোর জন্যে এগিয়ে গেল কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে ফেলেছে রাজাকে। প্রজ্জ্বলিত আগুনের পাশে যাওয়া সম্ভব হলো না আনন্দ পালের।
কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনায় পাওয়া যায়, জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়ার আগে রাজা ছেলে আনন্দ পালকে নির্দেশ দিয়েছিল, সে যাতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কখনও যুদ্ধ প্রস্তুতি না করে এবং সুলতান মাহমুদকে চুক্তির শর্তানুযায়ী আড়াই লাখ দিনার পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সুলতানের সমবয়স্ক আনন্দ পাল উপদেশ উপেক্ষা করে বাবার জ্বলন্ত চিতার পাশে দাঁড়িয়েই চুক্তি ভঙ্গের ঘোষণা দিয়ে পিতার পরাজয় ও অপমৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নিল। বলল, “গজনীবাসীকে আমি এক দিনারও দেবো না এবং বাবার প্রতিশোধ আমি নেবই।”
১.৫ এক রাতের স্বর্গবাস
এক রাতের স্বর্গবাস
মুলতান। উপমহাদেশের একমাত্র বসতি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময় থেকে আজ পর্যন্ত নানা উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া, দখল-মুক্তির শত পট-পরিবর্তনেও যা অমুসলিমদের পদানত হয়নি। উপমহাদেশ থেকে মোগল শাসনের অবসান ঘটলেও মুলতান ছিল সব সময় ইংরেজ বেনিয়াদের কজামুক্ত। এগারো শতকে উপমহাদেশ জুড়ে হিন্দুদের দাপট থাকলেও মুলতান ছিল পৌত্তলিক পঙ্কিলতা মুক্ত। অথচ তখন মুলতানের আশপাশের সব রাজ্যে ছিল হিন্দু পৌত্তলিকদের জয়জয়কার।
১০০২ খৃস্টাব্দের ঘটনা। মুহাম্মদ বিন কাসিমের পর ভারতের পৌত্তলিকদের গড়া রাম-রাজ্যের ভিত্তিমূলে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানেন সুলতান মাহমুদ গজনবী। মাহমুদ গজনবীর আঘাতে কেঁপে উঠল পৌত্তলিকদের স্বর্গ-সিংহাসন। ভারতের সবচেয়ে প্রতাপশালী হিন্দু রাজা জয়পালের তিনটি হামলা প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেন। চিরতরে স্তব্ধ করে দেন জয়পালের আগ্রাসী থাবা। জয়পালকে রণাঙ্গনে বন্দী করে ফেলেন। জয়পাল আর যুদ্ধ না করার অঙ্গীকার করে মোটা অংকের মুক্তিপণের চুক্তি করে মুক্ত হয়ে রাজধানীতে ফিরে ছেলে আনন্দ পালকে সিংহাসন সোপর্দ করে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়। আনন্দ পালকে জয়পাল মুক্তিপণ আদায় করতে এবং ভবিষ্যতে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকতে ভবিষ্যদ্বাণী করে। মাহমুদ গজনবী পেশোয়ারের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে পেশোয়ার কেন্দ্রিক শাসন ক্ষমতা নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে নেন। যার ফলে মাহমূদের রাজধানী গজনী অনেকটা বহিঃশত্রুর আক্রমণ আশংকা থেকে নিরাপত্তা লাভ করে।
সুলতান মাহমুদ রাজা জয়পালকে বন্দী করার পর আড়াই লাখ স্বর্ণমুদ্রা মুক্তিপণের শর্তে মুক্ত করে দেন। সেই সাথে পঞ্চাশটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি যুদ্ধ খরচ বাবদ দেয়ার অঙ্গীকার করে জয়পাল। জয়পাল রাজধানীতে ফিরে যথারীতি সুলতানের কাছে পঞ্চাশটি হাতি এবং আড়াই লাখ স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর কথা বলে চিতায় আত্মাহুতি দেয়। কিন্তু আনন্দ পাল পিতার জ্বলন্ত চিতার পাশে দাঁড়িয়েই। সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আনন্দ পাল সেই সামবেশেই তার পিতার প্রতিশ্রুত মুক্তিপণ ও যুদ্ধ জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে।
রাজা জয়পালের আত্মাহুতির ঘটনাটি ঘটে ১০০২ খৃস্টাব্দে। দেখতে দেখতে দু’বছর চলে গেল। জয়পালের প্রতিশ্রুত জরিমানা নিয়ে আসার পরিবর্তে সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দারা খবর নিয়ে এল, আনন্দ পাল মুক্তিপণ পরিশোধের পরিবর্তে তার বাবার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে।
… “এটা আমার কাছে আদৌ আশ্চর্যের কোন খবর নয়” বললেন সুলতান। মানসিকভাবে এমনটির জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। আমি এ জন্যই জয়পালের এলাকা কজা করেছি যে, জয়পালের চেলা ও পরামর্শদাতাদের কাছে গজনী এখন আসমানের তারার চেয়েও দূরবর্তী মনে হবে। আল্লাহর রহমত ও আমার জানবাজ যযাদ্ধাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শুধু গজনী নয় ওদের আজীবন লালিত দুঃস্বপ্ন খানায়ে কা’বাকে আমি ওদের আগ্রাসন থেকে নিরাপদ করতে পেরেছি।”
“জয়পাল পরাজিত হয়ে কাপুরুষের মতো আত্মাহুতি দিয়েছে। এখন সিংহাসনে বসেছে ওর ছেলে, ওদের আমরা মোটেও পরোয়া করি না।” বলল এক সালার।
“দুশমনকে এভোটা খাটো করে দেখতে নেই বন্ধুরা! দুশমনদের ব্যাপারে সবকিছু গভীরভাবে ভাবতে হয়।” বললেন সুলতান। “রাজা ভয়পালের মৃত্যুতে পৌত্তলিকতার পূজারীরা সব মরে যায়নি। ভারত থেকে বিলীন হয়ে যায়নি মূর্তিভক্তি। এটা দু’টি আদর্শের লড়াই। হিন্দুরাজা যুদ্ধ করতে না চাইলেও ওদের ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তাদেরকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে। ওদের এলিট শ্রেণী এবং মাতাব্বররা কখনও শাসকদের নির্বিকার থাকতে দেবে না। দুশমনের শক্তিকে কখনও ছোট করে দেখবে না। বরং এখন তোমাদের ভাবতে হবে, এই জাতশত্রুদের পা কিভাবে চিরদিনের জন্যে ভেঙে দেয়া যায়।”
