জামিলা! আমরা অপরাধী। পাপী। পাপীর কোন ঠিকানা নেই। দুনিয়াতে পাপীরা জীবনকে পাপাচারে ভোগ করে আর পরকালে আগুনে পুড়ে ভোগের প্রায়শ্চিত্ত করে।
জামিলা! আমরা পথচ্যুত হয়েছি। আমাদের সাথীরা সত্যপথের উপর রয়েছে। ওই হিন্দু মেয়ে ও তার ভাই সত্যের ঠিকানা পেয়েছে। মাটির মূর্তির পূজা ছেড়ে তারা আল্লাহ্র পথের দিশা পেয়েছে। ওরা ঠিক তাদের গন্তব্যে পৌঁছবে, কিন্তু আমরা ভ্রষ্টতার শিকার। আমাদেরকে এই বিজন প্রান্তরেই মরতে হবে।”
কাসেম বেদিশা হয়ে পড়েছিল। জীবনের করুণ পরিণতি আর অতীতের সুকীর্তি তাকে এতই বিপর্যস্ত করে তুলেছিল যে, তার আওয়াজ চড়ে গেল। জামিলা ভড়কে গেল কাসেমের উন্মাদনা দেখে। জামিলা হাত দিয়ে কাসেমের মুখ বন্ধ করতে চেষ্টা করল। বাকরুদ্ধ হয়ে কাসেম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। জামিলাও জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা খুইয়ে ফেলেছে। তবুও কাসেমকে সান্ত্বনা দিতে নিজের ভাষাতেই বলতে শুরু করল :
“কাসেম! স্থির হও। এখনও আমরা চেষ্টা করলে বাঁচতে পারব। তোমাকে সাহায্য করার সামর্থ আছে আমার। যে কোন রাজ্যে আমরা দু’জন স্বাচ্ছন্দে জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা আমাদের হাতে রয়েছে। তুমি নিরাশ হয়ো না। আমার দিকে তাকাও। উঠ।”
“আমি জানি না তুমি কি বলছো জামিলা! আমি কি বলি তাও বুঝতে পার না তুমি।” নিজের মত করে বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল কাসেম। জামিলাকে হাত ধরে টেনে তুলে বলল, “মৃত্যু ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন বিকল্প নেই। এসো, মরার জন্য আরো ভাল কোন জায়গা পাওয়া যায় কি-না দেখি?”
ইমরানের কাফেলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সমতল ভূমিতে চলে এসেছিল। পথিমধ্যে তারা আরো এক জায়গায় পানির সন্ধান পেয়েছিল। তাদের কাফেলার গতি ছিল মন্থর। কেননা দু’জনকে পায়দল চলতে হতো। হঠাৎ একটি ঘোড়া দেখতে পেল নিজাম। ঘোড়ার গায়ে গদি আঁটা। কিন্তু আশপাশে কোন আরোহীকে দেখা গেল না।
ইমরানকে ডেকে বলল নিজাম, ইমরান! তুমি বলেছিলে কোন ঘোড়া পাওয়া গেলে আরোহীকে হত্যা করে হলেও ঘোড়া ছিনিয়ে নেবে। ওই দেখ! একটি ঘোড়া দেখা যাচ্ছে।
নিজামের ইঙ্গিতে মরুভূমির দিকে তাকাল ইমরান। গদি আঁটানো একটি ঘোড়া আপন মনে ঘাস খাচ্ছে।
“আমার দৃষ্টিভ্রম না হলে বলতে পারি ঘোড়াটি আমাদেরই।” বলল ইমরান।
তারা একটু এগিয়ে দেখল, সত্যি ঘোড়াটি তাদেরই। যে দুটো ঘোড়া নিয়ে কাসেম পালিয়েছিল এটি সে দুটোর একটি। কিন্তু ধারে-কাছে কোথাও মানুষের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল না।
ইমরান ও নিজাম তরবারী কোষমুক্ত করে নিল। কারণ, হঠাৎ কোন আড়াল থেকে তাদের উপর কাসেমের আক্রমণ করার আশংকা রয়েছে। কিন্তু আশে পাশে বহু খোঁজাখুঁজি করেও জামিলা ও কাসেমের দেখা পাওয়া গেল না। খুঁজে না পেয়ে ইমরান ও নিজাম কাসেমকে ডাকতে শুরু করল।
“কাসেম! আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো। অতীতের সবকিছু আমরা ভুলে যাবো। তোমাকে বন্ধুর মতোই বরণ করে নেবো। কাসেম লুকিয়ে থেকো না, আমাদের সাথে চলে এসো!”
বহু ডাকাডাকির পরও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
“ইমরান! ওদিকে দেখ। শকুন উড়ছে।” বলল নিজাম।
বিস্তীর্ণ মাঠের কোথাও শকুনের ঝাক উড়তে দেখার মানে ওখানে কোথাও মৃতের অস্তিত্ব রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদেহে শকুনের আক্রমণ বহুবার দেখেছে নিজাম। ইমরানেরও রয়েছে এ অভিজ্ঞতা। কাফেলাকে দেখে ঘোড়াটি মুখ উপরে তুলে হ্রেষাব করল। কিন্তু পালাতে চেষ্টা করল না। নিজাম ধীর পায়ে এগিয়ে ঘোড়ার বাগ হাতে নিল। অমনি ইমরান এক লাফে সওয়ার হলো ঘোড়ায়। নিজামও তার পিছনে চড়ে বসল। ঘোড়াটি বেশ ফুরফুরে। বোঝা যায় পর্যাপ্ত ঘাস ও পানি খেয়েছে সে। হয়তো বিশ্রামের কাজটিও সেরে নিয়েছে ইতিমধ্যে। তারা দ্রুত অগ্রসর হল শকুনের পালের দিকে। শকুনেরা কি যেন নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।
কাছে গিয়ে ইমরান ও নিজাম কয়েকটি ঢিল ছুঁড়ে দিল শকুনের দিকে। ঢিল খেয়ে দূরে সরে গেল শকুনেরা। কাছে গিয়ে দেখল, দুটি লাশ অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে রয়েছে। মরদেহ দু’টি আর কারো নয় কাসেম ও জামিলার। শকুন দল এরই মধ্যে ওদের পেট ফেড়ে নাড়ীভুড়ি বের করে ফেলেছে। স্বর্ণ ও মুদ্রার থলেটি কাসেমের মুষ্টিবদ্ধ। ইমরান মুষ্টি খুলে থলেটি ছাড়াতে চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই মুষ্টি খুলতে পারছিল না ইমরান। খুব বেশি আগে মরেনি এরা। শরীর এখনও তাজা। গা থেকে কোন দুর্গন্ধও ছড়ায়নি।
নিজাম ইমরানের উদ্দেশে বলল, “ইমরান! রেখে দাও ওসব। এগুলো ওদের হাতেই থাক। এই সোনা আর দেহই তো এদের মৃত্যু ডেকে এনেছে। এসব ওদের কাছে থাকুক। আমাদের এ দিয়ে দরকার নেই। গজনী সালতানাতের সম্পদ নয় এগুলো। এগুলো না নিলেও আমাদের অপরাধ হবে না। হতভাগাদের আত্মা হয়তো এতে কিছুটা সান্ত্বনা পাবে। এসো। আমরা চলে যাই।” একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছেড়ে করুণ দৃষ্টিতে একবার উভয়কে দেখে চলে এলো ইমরান। “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিরামহীন পলায়নে ক্ষুধা, পিপাসায় এদের মৃত্যু হয়েছে। যদি ডাকাতের আক্রমণে মরত তাহলে কাসেম অক্ষত থাকতো না, জামিলাকেও ডাকাতেরা রেখে যেত না। তাছাড়া স্বর্ণ ও মুদ্রার থলেটি এদের কাছে পাওয়া যেত না।” বলল ইমরান।
“আহ! কি দুর্ভাগ্য এদের । আর একটু অগ্রসর হলেই পানি পেয়ে যেত এরা। এদের বাঁধনমুক্ত হয়ে ঘোড়া পানি ও ঘাসের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু এদের ভাগ্যে পানি জুটেনি। বন্ধুরা! … এদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রাও এদের জীবন রক্ষা করতে পারল না। বরং অনেক সময় টাকা ও সোনা-গয়না মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।” ঋষিকে ইঙ্গিত করে বলল ইমরান।
