ক্লান্ত অবসন্ন কাসেমের দু’চোখ বুজে এলো ঘুমে। তাকাতেই পারছিল না। এক পা নড়ার শক্তিও নেই দেহে। একটি চওড়া পাথরে পা টানটান করে শুয়ে পড়ল কাসেম। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাসেমের বুকটা কাঠ হয়ে গেছে। জামিলা ও ঘোড়ার দিকে তাকানোর ইচ্ছে হলো না কাসেমের। জামিলা এসে কাসেমের গায়ের উপর ঠেস দিয়ে খানিক্ষণ বসল। এরপর কাসেমের বুকের উপর মাথা
রেখে ওকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। কাসেম দুহাতে জড়িয়ে নিল জামিলাকে। জামিলাও নিজেকে সোপর্দ করে দিল কাসেমের বুকে। অবসন্ন কাসেম জামিলার সংস্পর্শে অনুভব করল উন্মাদনা। মাথা তুলে জামিলাকে ইঙ্গিতে বুঝাল, পাহাড়ের ওদিকে একটু আড়াল মতো জায়গার দিকে চলো। জামিলাই উঠে ওকে টেনে তুলল। দুজন হাত ধরাধরি করে একটি ঝোঁপের আড়ালে পাহাড়ের গর্তের মতো জায়গায় গিয়ে জীবনের শেষ সাধ মিটাতে প্রবৃত্ত হল। কামে অনুভব করল, যে জীবন থেকে সে ফেরার হয়েছে সেই জীবন আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের চিন্তা ও গন্তব্যে পৌঁছার কথা, ভুলে গেল তারা। দৈহিক কামনার আগুন জ্বালিয়ে ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
দীর্ঘ ঘুম শেষে কাসেম যখন চোখ মেলল তখন রাত শেষে বেলা উঠে গেছে। হকচকিয়ে উঠল কাসেম। নিজেদেরকে এভাবে পাহাড়ের কোলে অরক্ষিত অবস্থায় দেখে ঘাবড়ে গেল। দাঁড়িয়ে জায়গাটা পরখ করে দেখল, গতকাল সন্ধ্যায় তারা যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। রাতের অধিকাংশ সময় চলেও অগ্রসর হতে পারেনি মোটেও। একই জায়গা বৃত্তাকারে ঘুরেছে।
জামিলাকে ডেকে তুলল কাসেম। পরস্পরের প্রতি এরা তাকাতেও পারছিল না। আবার যাত্রা শুরু করতে চাইল কাসেম। কিন্তু ঘোড়াটি আর দেখতে পেল না। কাসেম ভাবল, ইমরান ও নিজাম হয়তো ওদের এখানে দেখে ঘোড়াটি নিয়ে গেছে। আর ওদের রেখে গেছে যাতে ক্ষুৎপিপাসায় ওরা মরুপাহাড়ে ঘুরে ঘুরে মৃত্যুবরণ করে।
ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত ঘোড়া খাবারের সন্ধানে হারিয়ে গেল। বহু খোঁজাখুঁজি করেও ঘোড়ার কোন চিহ্নও পেল না। হতাশ হয়ে ফিরে এলো জামিলার কাছে। ভীত শংকিত কাসেম জামিলাকে টেনে তুলে দৌড়াতে লাগল।
কিছুক্ষণ পাথুরে উঁচুনীচু পথে দৌড়ে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলল জামিলা। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। কাসেম তাকে টেনে তুলে কাঁধে নিয়ে আবার দৌড়াতে লাগল। সোনা-মুদ্রার থলিটাও হাতে নিল। কাসেম ভাবল, ধারে কাছেই হয়তো রয়েছে ইমরান ও নিজাম। ওদের দুরবস্থা দেখলে হয়তো সোনা ও মুদ্রার থলিটা ছিনিয়ে নেবে, জামিলাকেও নিয়ে যাবে তারা। বেশিক্ষণ জামিলাকে কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে পারল না। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ও ক্ষুৎপিপাসায় এমনিতেই শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। তদুপরি গত রাতের পাপ ও পালানোর অপরাধবোধ কাসেমের সামনে প্রেতাত্মা হয়ে দেখা দিল।
ক্লান্ত কাসেম আর জামিলাকে বহন করে অগ্রসর হতে পারল না। চোখে সর্ষেফুলের মতো চতুর্দিক অন্ধকার ধোঁয়াটে মনে হলো। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল কাসেমের। কাঁধের বোঝার মতো জামিলাকে ছেড়ে দিল কাসেম। যমদূত যেন দাঁত বের করে নাচতে লাগল কাসেমের সামনে। জামিলাকে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল বুকে। জামিলার শরীর অসাড় হয়ে গেল। জামিলা চেতনা হারিয়ে ফেলল। স্বর্ণমুদ্রার থলেটা হাত থেকে পড়ে গেল।
খানিক্ষণ পর জামিলার হুশ ফিরতে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো কাসেম। প্রাণ ফিরে পেল সে। দু’হাতে বাজু ধরে জামিলাকে বসাল কাসেম। কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠল কাসেম। স্বগতোক্তি করতে শুরু করল সে :
“তুমি আমার ভাষা বুঝবে না জামিলা! আমরা গজনীর পথ থেকে ফেরার হইনি। আল্লাহ্র পথ থেকে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহর পথ থেকে পালানোদের পরিণতি এটাই অবশ্যম্ভাবী। আমি ছিলাম অভিজ্ঞ সৈনিক। জীবনে বহুবার প্রচণ্ড তুষারপাত, আর লুহাওয়ায় মরু পাহাড়ে দিনের পর দিন বিরামহীন যুদ্ধ করেছি। দীর্ঘ সময় অনাহার, অনিদ্রা, ক্ষুধা-পিপাসায় কাটিয়েছি। সাথীদের অনেকেই শাহাদাৎ বরণ করেছে, আহত হয়েছে। হাত পা হারিয়েছে, নিজেও যখম হয়েছি, কিন্তু ধৈর্যচ্যুত হইনি, আজকের মতো সাহস হারাইনি, এমন অসহায় বোধ করিনি। আমার শরীরের রক্ত নিঃশেষ হয়ে গেলেও এমন বলহীন হওয়ার কথা নয়। এখন আমি জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। জানো, এর কারণ কি?”….উদ্বেলিত কাসেম জামিলাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, জান?’ কিন্তু জামিলা তার কোন কথাই বুঝেনি। ফ্যালফ্যাল করে হা করে শুধু তাকিয়ে রইল কাসেমের দিকে। কাসেমের ভাষা না বুঝলেও জামিলা অতটুকু ঠিকই বুঝল, যে শক্ত সামর্থবান যুবককে সে দেহের কামনা পূরণের অপরিমেয় আধার মনে করেছিল সেই যৌবনের ঝর্ণা এখন শুকিয়ে গেছে, প্রেমের উত্তাপ নিভে গেছে। আবারো বলতে শুরু করল কাসেম :
“যুদ্ধ ময়দানে আমাদের দেহ নয়, আমাদের আত্মা লড়াই করতো। আমরা যুদ্ধ করতাম জাগতিক কোন লোভ-লালসার জন্যে নয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর এখানে আমরা পালিয়েছি দেহের কামনা আর মনের বাসনা পূরণে। আমরা আদর্শবিচ্যুত অপরাধী। তাই মাত্র দুদিনের বৈরী পরিস্থিতিতে আমি প্রাণশক্তি খুইয়ে বসেছি। নিজের শরীরটাই এখন আমার কাছে ভারী মনে হচ্ছে। তোমার রূপের জৌলুস ম্লান হয়ে গেছে, তোমাকে মনে হচ্ছে দুর্গন্ধময় একটা পচা মরদেহ।
