“দেখো রাজিয়া! রূপের পরিণতি দেখে নাও। রূপ সৌন্দর্ষের বড় গর্ব ছিল জামিলার। সে তার রূপের জালে আমাকেও বাঁধতে চেয়েছিল। কিন্তু জামিলার মায়াজালে ধরা দিল কাসেম। আর এই রূপ আর সোনা দানাই কাল হলো ওদের।”
করুণ এ দৃশ্য ও ইমরানের কথায় অশ্রুসজল হয়ে উঠল রাজিয়া।
ওদের করুণ পরিণতি পিছনে ফেলে ইমরানের কাফেলা রওয়ানা হল গজনীর দিকে। এখন তাদের একজন সওয়ার হলো কাসেমের ঘোড়ায়।
সুলতান মাহমুদের কাছে যখন সংবাদ গেল যে, একজন মহিলাসহ লাহোর থেকে তিনজন লোক এসেছে। তারা সুলতানের সাথে দেখা করতে চায়। সুলতান হাতের কাজ রেখে তাদের ডেকে পাঠালেন। ইমরান ও নিজাম সুলতানকে সালাম দিয়ে মহলে ঢুকল। রাজিয়া ও আব্দুল জব্বারের কোন প্রয়োজন ছিল না, তাই তারা বাইরে অবস্থান করছিল।
ইমরান বিস্তারিত রিপোর্ট দিল। বাটাণ্ডার গোয়েন্দাদের তৎপরতা এবং রাজা জয়পালের সব যুদ্ধপোকরণ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও সবিস্তারে জানাল। সে এ কথাও ব্যক্ত করল, কিভাবে নিজাম ও কাসেমকে রাজার বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে এনেছে এবং কিভাবে হিন্দু মেয়েটিকে উদ্ধার করেছে পণ্ডিতদের আখড়া থেকে।
কাসেমের বিচ্যুতির কথা শুনে সুলতান খুব আফসোস করলেন। দুঃখে অনুতাপে সুলতানের চেহারা বিষাদময় হয়ে উঠল। :
“নারী ও সম্পদের লিঙ্গা মুসলিম জাতিকে যেভাবে পেয়ে বসেছে তা আমাদেরকে ধ্বংস করে ছাড়বে।” বললেন সুলতান। “সম্পদ আর নারীলিগায়ই আমাদেরকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। আচ্ছা, তোমরা কি সঠিক জানো, জয়পাল গজনী আক্রমণ করবে?”
“মহামান্য সুলতান! এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।” বলল ইমরান। “রাজার যুদ্ধ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে গেলেও সেখানে রসদের ঘাটতি নেই। ইতোমধ্যে সে হয়তো ধ্বংস হওয়া সম্পদের ঘাটতি পূরণ করে ফেলেছে।”
“তোমাদের অন্য সাথীরা ওখানে কি করছে?” জিজ্ঞেস করলেন সুলতান। “জয়পালের তৎপরতা সম্পর্কে আমার নিশ্চিত হওয়া দরকার, সে কি পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আসছে?”
“বাটাভার লোকদের কার্যক্রম সম্পর্কে আপনাকে বলেছি। ওরা সেখানকারই বাসিন্দা। অধিকাংশই যুবক। খুব সাহসী উদ্যমী। ওয়াইস-এর তত্ত্বাবধানে তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। ওয়াইস আমাদের এখানকার লোক। সেখানের একটি মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব নিয়েছে কাজের সুবিধার জন্যে। রাজার সেনাবাহিনী রওয়ানা হলেই সে বিস্তারিত সংবাদ আপনাকে জানাবে।”
“মহামান্য সুলতান! আপনি আর কোন সংবাদের অপেক্ষা না করে প্রস্তুতি শুরু করে দিন।” বলল নিজাম। “জয়পালের সাথে আমার সরাসরি কথা হয়েছে। তার কথাবার্তা থেকে বুঝেছি, যে কোন মূল্যে সে গজনী আগ্রাসন চালাবে। সে তার সেনা অফিসারদের সাথে যেসব পরামর্শ করেছে তাও শোনার সুযোগ আমার হয়েছে। এবার সে পরাজিত নয় বিজয়ী হতে জীবনের শেষ আক্রমণের উদ্দেশে আসবে। মোকাবেলা সমান সমান নয়, দশের বিরুদ্ধে একজনের হবে এমন বিশাল হবে রাজার বাহিনী। তাই অতীতের মতো মুখোমুখি নয় গেরিলা পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে আমাদের। অবশ্য রাজা এক ধরনের নির্ভাবনায় রয়েছে যে, সুলতান সুবক্তগীনের ইন্তেকালের পর সেনাবাহিনী সামাল দেয়ার মতো দক্ষ কেউ গজনী বাহিনীতে নেই। তার এই চিন্তাই আমাদের বড় এক হাতিয়ার।”
“সৈন্য তো আমার কম ছিল না। কিন্তু বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধের কারণে বহু সৈনিক বিভিন্ন উপদলে ভাগ হয়ে গেছে। যদ্দরুন আমাদের সেনাবল কমে গেছে। আমাদের সেনা অফিসারদের মধ্যে এখন ক্ষমতার লোভ দেখা দিয়েছে। ইসলামের পক্ষে জিহাদ করার যোগ্যতা আর নেই এদের। সেনা অফিসাররা যখন ক্ষমতার মসনদ দখলের পেছনে পড়ে তখন সে জাতির ধ্বংসের সুড়ং পথ সৃষ্টি হতে থাকে। স্বজাতির ধ্বংস নিজেরাই টেনে আনে।”
তখন সুলতান মাহমূদ গজনী, বলখ ও খোরাসানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সাথে সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থাও করছিলেন। ইত্যবসরে নিজাম ও ইমরান লাহোর থেকে জয়পালের আক্রমণের খবর নিয়ে এলো। এদের কাছ থেকে সংবাদ পাওয়ার পর সুলতান সব সেনা কর্মকর্তাকে ডেকে পরামর্শ সভায় বসলেন। সেনা কমান্ড আগেই নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন সুলতান। সেনাদের তিনি বললেন :
“এটা নিশ্চিত যে, হিন্দুস্তানের সব রাজা-মহারাজাকে নিয়ে তৃতীয়বার গজনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জয়পাল। সেনা কমান্ড আগের মতো রাজার হাতেই থাকছে। ওদের সৈন্যসংখ্যা কত সে সংবাদ নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি বটে, তবে অন্তত এক লাখের কম হবে না তা অনুমান করা যায়। লাহোরে আমাদের লোকেরা রাজার সব রসদপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছে। এজন্য রাজার অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। আপনারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের ব্যাপারটি জানেন। সব সৈন্যকে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারছি না। কারণ, সব সৈন্য বাইরে নিয়ে গেলে আমাদের ভাইয়েরা সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে আমাদের পিঠে ছুরি বসাবে।
এটা আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। আপনারা কি কখনও ভেবেছেন, যদি হিন্দুদের হাতে গজনীর পতন ঘটে তবে ওইসব ক্ষমতালিলুদের অবস্থা কি হবে? শুধু তাই নয়, গজনীর পতন হলে হিন্দুরা খানায়ে কাবা পর্যন্ত পৌত্তলিক প্রভাব বিস্তার করবে। অভিজ্ঞ প্রবীণগণ আমাকে জানিয়েছেন, ভারতের হিন্দু পণ্ডিতেরা দাবী করে, পুরাকালে দজলা ফোরাত পর্যন্ত নাকি হিন্দুদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। তাই তারা কা’বা পর্যন্ত রামরাজ্য বিস্তৃত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমাদের মনে রাখতে হবে, এরা শুধু যুদ্ধ করতে আসছে না, সাথে নিয়ে আসছে পৌত্তলিক ধর্ম আর আগ্রাসী চরিত্র। ইসলামের ধ্বংস সাধনে আমাদের প্রাণকেন্দ্রে আগ্রাসন চালাতে চায় হিন্দুরা । আপনাদেরকে শুধু সালতানাত ও নিজেদের ধনজন রক্ষার জন্যে নয় আমাদের প্রাণকেন্দ্র কাবার সুরক্ষার জন্যে মরণপণ যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হবে। আপনাদের সুবিধা হলো, হিন্দু সেনাদের মধ্যে মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড ভীতি রয়েছে। লাহোর থেকে দু’জন লোক খবর নিয়ে এসেছে। তারা জানিয়েছে, গত যুদ্ধের পর পালিয়ে বেঁচে যাওয়া রাজার সৈন্যরা দেশে ফিরে গজনী বাহিনীর আতংক ছড়িয়েছে। রাজার নতুন সৈন্যদের মধ্যে গজনী সেনাদের আতংক বিরাজ করছে।
