“এখানেই দাঁড়াও। একটুও নড়বে না। খুন হবে, না আমাদেরকে ছিনিয়ে আনা মেয়েটির কাছে নিয়ে যাবে? এই মুসলিম মহিলার কাছ থেকে যে মূল্য তুমি নিয়েছে তা আমি জানি। আজও ওর কাছ থেকে যে থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা তুমি নিয়েছ তাও আমরা দেখেছি। জীবিত থাকতে চাইলে আমাদেরকে মেয়েটির কাছে নিয়ে যাও।” ভয়ে শঙ্কায় কাঁপতে লাগল পণ্ডিত। জামিলাও এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। পণ্ডিত কাঁপা কাঁপা আওয়াজে বলল, “জামিলা! তুমি আমাকে ধোকা দিলে!”
“তুমি আমার জন্য যা করেছে, আমি তার চড়া মূল্য শোধ করেছি। আমি তোমাকে মুদ্রা দিয়েছি, শরীর দিয়েছি। আজ এখানে কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি। তুমিও তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে নাও।” পণ্ডিতের প্রতি তীর্যক ভাষায় বলল জামিল।
আরো দুটি খঞ্জরের আগা পণ্ডিতের শরীর স্পর্শ করল। ভয়ে হীম হয়ে গেল পণ্ডিত। সে থর থর করে কাঁপতে লাগল। টিলার উপর থেকে সম্মিলিত নারী কণ্ঠের কোরাস পাহাড় ও টিলায় প্রতিধ্বনিত হয়ে মনোমুগ্ধকর এক সুর সৃষ্টি করেছিল। মনে হচ্ছিল যেন অন্য জগত থেকে ভেসে আসছে অপার্থিব এই সুর সঙ্গীত।
“আওয়াজ অনুসরণ করে আমরাই ঋষি পর্যন্ত যেতে পারব।” পণ্ডিতের উদ্দেশে বলল ইমরান। “আমরা শুধু তিনজন নই, গোটা টিলা ঘিরে রেখেছে আমাদের লোকেরা। আমাদের কথা মতো কাজ না করলে কোন পণ্ডিতকে আমরা জ্যান্ত রাখবো না। আজ একজন একজন হত্যা করে বন্দী মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। তবে আমরা খুনখারাবী চাই না। আমরা এসেছি, যে মেয়েটিকে তোমরা বলী দিতে এনেছে, শুধু ওকে নিয়ে যেতে। ইচ্ছে হলে, তোমাদের পাথরের তৈরি দেবদেবীদের ডাকতে পার কিন্তু ওইসব পাথরের মূর্তি তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। চল! আমাদের তাড়া আছে।”
নিঃশব্দে আগে আগে চলল পণ্ডিত। পণ্ডিত এত ভীত হয়ে পড়েছিল যে, সে ইমরানকে বলার সাহস পাচ্ছিল না যে, তোমাদের কথা মতোই যাব কিন্তু হতিয়ার ফেলে দাও।
ইমরান ও তার সঙ্গীদের সামনের পথ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না। তারা শুধু শুনতে পাচ্ছিল মেয়েলী কণ্ঠের সঙ্গীত। পণ্ডিত কয়েকবার পথ বাঁক নিয়ে কয়েকটি সুড়ং অতিক্রম করে এসেছে। হুশিয়ার হয়ে গেল ইমরান। পঞ্জিত না আবার ওদের ধোকা দিয়ে কোথাও আড়াল হয়ে যায় আর ওর লোকেরা তাদের ঘিরে ফেলে। তাই সে খুবই সতর্কতার সাথে অগ্রসর হচ্ছিল।
পথ একটি খোলা জায়গায় এসে শেষ হয়ে গেল। দৈর্ঘ্য প্রস্থে ৫০ x ৪০ হাত হবে। এর পরই পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে মন্দির। অনেকগুলো কামরা। দেয়ালগুলোতে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, পাথর কাটা মূর্তি। একটি শতরঞ্জি বিছানো। সামনে একটি বড় তশতরিতে প্রসাদ জাতীয় দ্রব্য। কুড়ি পঁচিশজন সাধু ধরনের লোক বসা। প্রত্যেকের বাহুবন্ধনে একেকটি তরুণী। তারা তরুণীদের নিয়ে হাসি-তামাশায় মত্ত। আর খোলা জায়গাটিতে দশ পনের জন তরুণী বৃত্তাকারে নেচে নেচে গীত গাইছে। এদের বৃত্তের ভেতরে বসা আরেকটি তরুণী। তাদের চারপাশে অসংখ্যা প্রদীপ জ্বলছে। সবাই অর্ধ উলঙ্গ।
থেমে গেল পণ্ডিত। সে অসহায়ভাবে তাকালো তিন মুসলমানের দিকে।
“মেয়েটিকে আমাদের হাতে তোলে দাও।” পণ্ডিতের পাঁজরে খঞ্জরের আগা স্পর্শ করে বলল ইমরান।
বড় পণ্ডিত গলা চড়িয়ে হাঁক দিল, ‘থামো সবাই।‘
নর্তকীরা নাচ থামিয়ে একদিকে সরে গেল। সাধুরা দাঁড়িয়ে গেল। ঋষি যেভাবে বসেছিল সেভাবেই ভাবলেশহীন বসে আছে। ইমরান ও তার সাথীরা পাগড়ী দিয়ে চেহারা ঢেকে রেখেছিল। তারা দ্রুত খাপে ভরা তরবারী কোষমুক্ত করল। বড় পণ্ডিতকে আরো এগিয়ে দু’উক্ত তরবারীর মাঝে দাঁড় করানো। ইমরান ঋষিকে ধরে উঠাল। ঋষি চোখ বড় করে তাকে দেখছিল, যেন সে তাকে চিনতে পারছে না। ইমরান তাকে ডাকল, হাতে ঝাঁকুনি দিল, কিন্তু ঋষি তার দিকে ড্যাব ড্যাব চোখে নিস্পলক তাকিয়ে রইল। পরিষ্কার বোঝা গেল তাকে এমন কিছু পানাহার করানো হয়েছে যার প্রভাবে তার স্বাভাবিক স্মৃতিবোধ রহিত হয়ে গেছে।
ইমরান তাকে বগলদাবা করে রওয়ানা হল। ঋষিও কোন বিরূপতা না, দেখিয়ে সহগামী হল। পিছনে ফিরে সব সাধু পণ্ডিতকে লক্ষ্য করে ইমরান বলল, “যদি কেউ জায়গা থেকে একটু নড়াচড়া কর তবে সবাইকে হত্যা করে ফেলব। তোমাদের সবাইকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে।”
এর উপর তন্ত্রমন্ত্রের প্রভাব কতক্ষণ থাকবে?” বড় পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করল ইমরান।
“সকাল পর্যন্ত কেটে যাবে।” জবাব দিল বড় পণ্ডিত। “যাও, ওকে তোমরা নিয়ে যাও।”
“তোমাকেও আমাদের সাথে যেতে হবে। রাস্তা খুব জটিল। আমাদের পুরো খেয়াল নেই।” বলে বড় পণ্ডিতের ঘাড়ে তরবারীর ফলা ছোঁয়াল ইমরান।
“আমাদের আগে আগে চলো।”
কেনা পশুর মতো পণ্ডিতকে আগে আগে হাঁকিয়ে নিয়ে গেল ইমরান।
সে ভয়ে আতঙ্কে জড়সড়। ফেরার পথে পণ্ডিত যখন দু’পাহাড়ের সুড়ং পথে। ঢুকল, তখন গোয়েন্দারা রাজার যুদ্ধ সরঞ্জামে আগুনে ধরিয়ে দিয়েছে। ইমরান ও তার সাথীরা তরবারী উন্মুক্ত করে পণ্ডিতের পিছে পিছে আসছে। জামিলাও তাদের সাথেই হাঁটছে। ঋষি অচেতনের মতো হাঁটছিল তাদেরই সাথে।
একটু সামনে এগুতে তাদের চোখে পড়ল শহরের দিকে আসমান ছোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখা। ইমরান আগুন দেখে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল।
