“আল্লাহু আকবার।” সাথীদের বলল, “দেখ, বাঘের বাচ্চারা রাজার কোমর ভেঙে দিয়েছে। গজনী আক্রমণে প্রস্তুতি গ্রহণকারীদের আল্লাহ এখানেই পরাজিত করে দিলেন।”
“হায়! একি, আমাদের শহরে এতো আগুন! হায় ভগবান! গোটা শহর জ্বলছে!” ভয়ার্ত আওয়াজ শোনা গেল পণ্ডিতের কণ্ঠে।
“এটা আমাদের প্রভুর গযব । তোমাদের উপর আমাদের প্রভু গযব নাযিল করেছেন। তোমাদের মন্দিরগুলোকেও নারীভোগ ও বেলেল্লাপনা থেকে মুক্ত রাখনি তোমরা। এই নিরপরাধ মেয়ের আহাজারি আর তপ্ত নিঃশ্বাসে তোমাদের শহরে আগুন ধরে গেছে। তোমাদের এই কুমারী বলীদান সম্পূর্ণ ধোকাবাজী। আমরা জানি, কিভাবে এবং কোন মতলবে অবলা মেয়েটিকে তোমরা তুলে এনেছিলে।
তোমাকে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, জীবিত ছেড়ে দেবো। তাই জীবিত ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আমরা ঋষিকে নিয়ে গেছি এটা ঘুণাক্ষরে যেন কেউ জানতে না পারে। তোমাদের রাজা এই মেয়েকে এখনও দেখেনি। এর স্থলে অন্য কোন মেয়েকে ধরে এনে বলী দিবে।
এরপরও যদি দেখি, তুমি আমাদের কথার ব্যতিক্রম কিছু করছে, তাহলে জেনে রেখো, যে আগুনের তোমাদের রাজার সব যুদ্ধ সরঞ্জাম জ্বলছে, সেই আগুন সব পণ্ডিতকেও জ্বালাবে।” . পণ্ডিত জ্বলন্ত আগুন আর মানুষের শশারগোল ও চিৎকার শোনে হতভম্ব হয়ে গেল। পণ্ডিত তার জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। ইমরান,দ্রুত নদীর দিকে চলল। জগমোহন ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল তাদেরই জন্য। এক রকম দৌড়ে পৌঁছল তারা নদীর পাড়ে।
“গোটা শহর জ্বলছে। মনে হয় আমাদের বাড়িতেও আগুন লেগেছে। এ আগুন কিভাবে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল!” ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল জগমোহন।
“জ্বলতে দাও। তোমরা আর ঘরে ফিরে যাচ্ছে না। আমার সাথে যাচ্ছে। কাজেই তোমাদের নিজেদেরকে আর হিন্দু মনে করা ঠিক হবে না। আমাদের ধর্মের সত্যতা দেখ। তোমার বোনকে পণ্ডিতেরা বলী দিতে নিয়ে গিয়েছিল, আমি দু’আ করেছিলাম, হে খোদা! আমাকে সাহায্য করুন যাতে আমি এই নিরপরাধ মেয়েটিকে উদ্ধার করতে পারি। তিনি আমার দুআ কবুল করেছেন। আমাদের মা’বুদই সত্য। দেখ রাজার সব যুদ্ধ সরঞ্জাম পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আর তোমার বোন- যার বলী হওয়ার কথা ছিল সে এখন আমাদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। তোমাদের অসংখ্য দেবদেবীর সামনে থেকে ওকে আমরা ছিনিয়ে এনেছি, ওরা কিছু করতে পারল?”
ঋষি! বলে মোহন বোনকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঋষি মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া হল না। ইমরান বলল, পণ্ডিতেরা ওকে ওষুধ খাইয়ে বিগড়ে দিয়েছে। সকাল পর্যন্ত এর রেশ থাকবে। এখন আমাদের হাতে সময় নেই। বোনকে তোমার ঘোড়ায় তুলে নাও।
ঋষিকে জগমোহন আর জামিলাকে ইমরান তার ঘোড়ায় তুলে নিল। কাসেম ও নিজাম অন্য দুটি ঘোড়ায় চড়ে রওয়ানা হলা গজনীর পথে। এদিকে শুরু হল রাজা ও পণ্ডিতদের নতুন চক্রান্ত।
১.৪ অভিন্ন পথের অভিযাত্রী
অভিন্ন পথের অভিযাত্রী
ভোর হল। রাজা জয়পালের সকল যুদ্ধ-সরঞ্জাম জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেল। দেড় মাইল এলাকা জুড়ে শুধু ছাই-ভস্ম আর আগুনের কুণ্ডলী। তখনও মানুষ বেঁচে যাওয়া পণ্যসামগ্রী রক্ষায় সচেষ্ট। এদিকে মুসলমান পাড়ায় শুরু হয়েছে হিন্দুদের সন্ত্রাস। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ আর লুটতরাজ চলছে। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। মুসলিম নারী-পুরুষদের টেনে হেচড়ে ঘর থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। মহিলাদের গায়ের অলংকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। রাজা জয়পাল নিজেই এই নির্দেশ দিয়েছে। রাজা বলেছে, মুসলমানদের ঘরে যা পাও হাতিয়ে নাও এবং সরকারের কোষাগারে জমা কর।
রাতে ইমরান ও তার সাথীরা পণ্ডিতের কাছ থেকে ঋষিকে ছিনিয়ে নেয়ার পর ব্যর্থ পণ্ডিত শহরের দিকে রওয়ানা হলো। শহর জ্বলছে কিন্তু সে বিষয়ে পণ্ডিতের মনে বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। সে সোজা মন্দিরে প্রবেশ করলো এবং একটু পরই কিছুসংখ্যক লোক নিয়ে বেরিয়ে এলো। শহরের সকল মানুষ আগুনের পাশে এসে জড়ো হয়েছে। ছেলে-বুড়ো, প্রৌঢ়-যুবা, যুবতী কিশোরী কেউ বাকি নেই। পণ্ডিত ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা এই দুরবস্থার মধ্যেও খুঁটে খুঁটে দেখছিল মেয়েদের। কারণ, ঋষির শূন্যতা তাকে পূরণ করতেই হবে। হঠাৎ একটি চেহারায় দৃষ্টি আটকে গেল পণ্ডিতের। একটি কিশোরীর প্রতি ইঙ্গিত করে দূরে সরে গেল।
একটু পরই দেখা গেল, কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি এসে হাজির। মন্দিরে বিশেষ গাড়ির আগমনে সসম্মানে মেয়েরা এদিক ওদিক সরে গেল। পণ্ডিতের এক লোক ঐ কিশোরীকে ধরে ফেলল, অপর একজন মেয়েটির নাকের ওপর একটি রুমাল রেখে তাকে টেনে-হেঁচড়ে গাড়িতে তুলল। অবস্থার আকস্মিকতায় ব্যাপারটি কেউ তেমন আন্দাজ করতে পারল না। পণ্ডিতের ঈশারায় দ্রুত মেয়েটিকে নিয়ে গাড়ি পৌঁছে গেল মন্দিরে। বেলা বাড়ার আগেই তাকে টিলার মন্দিরে পৌঁছে দেয়া হল। যে টিলায় আটকে রাখা হয়েছিল ঋষিকে। কিন্তু মেয়েটি চেতনানাশক পদার্থের প্রভাবে তখনও হুশ ফিরে পায়নি।
পৌত্তলিকতাকে কখনো ধর্ম বলা যায় না। আজও বিবেকবান মানুষের কাছে তা কখনো ধর্ম নয়। অলীক কল্পনা, রেওয়াজ-রসম, মনুষ্য সৃষ্ট আনুষ্ঠানিকতা ও গোড়ামীর সমন্বিত রূপ পৌত্তলিকতা। কোনো উর্বর মস্তিষ্কের মতলববাজ এই অমানবিক কর্মগুলোকে ধর্ম হিসাবে আখ্যা দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত করেছে। পৌত্তলিকতাবাদে আল্লাহর পবিত্র সত্তার অনুভব অসম্ভব। কথিত এ মতবাদে নিরীহ অসহায় মেয়ে এবং শিশুদের অত্যাচার উৎপীড়ন করা হয়, বিনা অপরাধে এদের হত্যা করা হয়; ধোকা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ পৌত্তলিক ধর্মের মূল ভিত্তি। পৌত্তলিক ধর্মের পণ্ডিতেরা এসব অমানবিক ও অলীক অপকর্মগুলোকে ধর্মীয় বিধান বলে সমাজে চালু করেছে আর ভক্তেরা এগুলোকেই মেনে নিয়েছে ধর্মীয় বিধান হিসেবে। এরা আল্লাহ্ তাআলার অসংখ্য মূর্তি বানিয়েছে এবং প্রতিটি বড় বড় সৃষ্টির পূজা করছে ও অসংখ্য দেব-দেবীকে একেকটা মহান সৃষ্টি এবং শক্তির অধিকারী বলে প্রচার করছে। এখনও পর্যন্ত এদের মধ্যে দেখা যায়, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, সাপ-বিচ্ছ, পাহাড়-পর্বত, পশু-পাখি ইত্যাদির পূজা করতে।
