রাতের প্রথম প্রহরেই মন্দিরের বাইরে একটি ঝোঁপের আড়ালে নিজাম, কাসেম ও ইমরান লুকিয়ে রইল। ওদের পাশ দিয়ে একটি ছায়ামূর্তি চলে গেল।
“আমি তোমার পাশেই আছি জামিলা! তোমার কোন ভয় নেই।”
ইমরানের কণ্ঠ শুনে ছায়ামূর্তি থেমে গেল।
ইমরান এগিয়ে গেল। ইমরান জামিলাকে জানাল, সে একা নয়। তার সাথে আরো দু’জন রয়েছে। সামনে কি ঘটতে পারে সে ব্যাপারে ইমরান অনিশ্চিত। তাই জামিলার কাছ থেকে কাসেমও নিজামকে আড়াল করে রাখাটাই যৌক্তিক মনে করছে ইমরান। জামিলা চলে গেলে কিছুক্ষণ পর ইমরান সাথীদের নিয়ে এগিয়ে গেল।
“আমি বুঝতে পারছি না, এ কঠিন অপারেশনে তুমি কীভাবে সফল হবে?” ইমরানের প্রতি প্রশ্ন ছেড়ে দিল নিজাম।
“আমি যা কিছুই করছি আল্লাহর উপর ভরসা করে করছি। আমি আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে সাফল্যের দু’আ করেছি। মনে আল্লাহর রহমতের বিশ্বাস নিয়ে তাঁর নামে এ কাজে নেমেছি। আমি যদি সত্য পথে থাকি তবে আমার বিশ্বাস, আল্লাহ তাআলা আমাকে সফল করবেনই।”
রাতের অন্ধকারে মন্দিরটাকে একটা বড় ভূতের মতো দেখাচ্ছিল। জামিলাকে সাহস দেয়ার জন্য একটু পর পর জোরে কাশি দিচ্ছিল ইমরান। পণ্ডিতের ঘর থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে আলো দেখতে পেল ইমরান। জামিলা মন্দিরে প্রবেশ করে পণ্ডিতের ঘরের দরজায় কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। পরক্ষণেই বন্ধ হয়ে গেল। ইমরান দেখতে পেল, জামিলা ঘরে ঢুকেছে।
সাথীদের নিয়ে আরো এগিয়ে গেল ইমরান। মন্দিরের কাছে গিয়ে সাথীদের একটি গাছের আড়ালে দাঁড় করিয়ে সে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে পণ্ডিতের দরজার কাছে চলে গেল। দরজার ফাঁক গলিয়ে সামান্য আলো বাইরে পড়েছে। মাত্র তিন চারটি সিঁড়ি দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বুঝে সে আরো সতর্ক পায়ে সিঁড়ি মাড়িয়ে একেবারে দরজার সাথে মিশে দাঁড়াল।
“আমি বুঝতে পারছি না, তুমি ছোট্ট শিশুর মতো মেয়েটিকে দেখার জেদ ধরেছো কেন? ওখানে কোন হিন্দুও যেতে পারে না, আর তুমি তো মুসলমান!” বলল পণ্ডিত।
“আমি এই প্রেতাত্মাটাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখতে চাই। দূর থেকে দেখেই চলে আসব।”
“আমার অবশ্য আজ রাতে ওদিকে যাওয়ার কথা আছে। তবে আমি যাবো রাতের দ্বিপ্রহরে। তুমি কি এতোক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবে?”
“এখনই একটু চলুন না।” অনুনয়ের সুরে বলল জামিলা। আপনার পাওনা আপনার সামনেই পড়ে আছে। না চাইতেই আমি আপনার ধারণার চেয়েও বেশি পুরস্কার দিয়েছি। আমি জানি, আপনারা কুমারী বলীদানের নামে যা করছেন সবই প্রতারণা। আমি ইচ্ছে করলে এখন আপনার ভণ্ডামীর মুখোশ জনসমক্ষে উন্মোচন করে দিতে পারি। আমি আপনার জালে আটকা পড়িনি, এখন আপনি আমার জালে আটকা। আমার এতটুকু আশা আপনি পূর্ণ না করতে পারলে, বলতে পারি না, আপনার ভবিষ্যত পরিণতি কি হবে।”
জামিলা পণ্ডিতকে যাদুকরের মতো প্রভাবিত করে ফেলেছিল। একেতো ছিল থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা আর অপরদিকে জামিলার হুমকির ভূমিকাও কম ছিল না।
একটু পরই পণ্ডিত আড়মোড়া ভেংগে বসল।
“আমি তোমাকে দূর থেকে দেখিয়েই চলে আসব, চল।” পণ্ডিতের কণ্ঠ শোনা গেল।
ইমরান সতর্ক পায়ে দরজার কাছ থেকে আড়াল হয়ে গেল। পণ্ডিত ও জামিলা কামরা থেকে বের হল। দরজা বন্ধ করে পণ্ডিত হাঁটতে লাগল। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ইমরান সাথীদের নিয়ে পণ্ডিতের পিছু পিছু অগ্রসর হল । এলাকাটি ছিল অনাবাদী ও জঙ্গলাকীর্ণ। ইমরানের আশঙ্কা হল, পণ্ডিত হয়তো।
তাদের হাঁটার শব্দ শুনে ফেলবে। কারণ, শুকনো পাতা আর লতাগুল্মে ড্রা উঁচু নীচু পথে পা ফেলতেই’শব্দ হচ্ছিল। কিন্তু কোন কিছুর প্রতি লক্ষ্য ছিল না পণ্ডিতের। সে জামিলাকে জড়িয়ে ধরে নানা কেলি করতে করতে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। জগতের অন্য কিছুর খেয়ালই ছিল না পণ্ডিতের।
কিছুক্ষণ পর উঁচু নীচু পাহাড়সম টিলায় চলে এলো তারা। জামিলা ও পণ্ডিত দুটি টিলার মাঝখান দিয়ে যেতে লাগল। ওদের অনুসরণ করে ইমরানও সাথীদের নিয়ে টিলার মাঝপথে ঢুকে পড়ল। কিন্তু সমস্যা হলো, কিছুক্ষণ পরপরই পথ বাঁক নিয়েছে। ঘন অন্ধকার। কোন দিকে বাঁক নিতে হবে তা অনুমান করা মুশকিল। জামিলা ও পণ্ডিতের আওয়াজ অনুসরণ করে অগ্রসর হচ্ছিল ইমরান। তবুও তারা পথ ভুল করে বসল। এরই মধ্যে দুটি সুড়ং অতিক্রম করে এসেছে তারা। অল্পক্ষণ অগ্রসর হওয়ার পরই তারা বহু নারী কণ্ঠের কোরাস শুনতে পেল। পণ্ডিত ছাড়া একা এলে হয়তো প্রেতাত্মাদের গান মনে করে ভয়ে তারা ফিরে যেতো। তবে ইমরান পণ্ডিতদের স্বভাব সম্পর্কে জানতো। এ জন্য তার কাছে এ নারী কণ্ঠের আওয়াজ অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি।
সামনে রাস্তা এতো জটিল হয়ে উঠল যে, ইমরান ও তার সাথীদের পক্ষে জামিলা ও পণ্ডিতের অনুসরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ইমরান শঙ্কিত হলো, তারা পথ হারিয়ে ফেলতে পারে। কাজেই পণ্ডিত ও তাদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে তার একটু দ্রুত পায়ে হাঁটল। কিন্তু বিধি বাম। পায়ের আওয়াজ পেয়ে থমকে গেল পণ্ডিত। কে পিছনে পণ্ডিত কয়েক কদম পিছিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল। এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে কাউকে দেখতে পেল না পণ্ডিত। ইমরান খাপ থেকে খঞ্জর বের করে পণ্ডিতের বুকে ঠেকিয়ে দিল।
