“তুমি যা-ই বল আমি তা-ই করব।”
“উঠ! ভেতরে চল।” ইমরান জামিলাকে ভেতরে নিয়ে গেল। ইমরান জামিলাকে অন্য একটি কামরায় বসাল। কাসেম ও নিজামের কামরায় একে নেয়া উচিত মনে করেনি। ঘরে বাতি জ্বালিয়ে ইমরান জামিলাকে বলল, “একাকী একটু বসো, ভয় নেই। এখানে ঋষির প্রেতাত্মা আসবে না।”
কাসেম ও নিজামের ঘরে গিয়ে ইমরান জামিলা ও ঋষির ঘটনা জানিয়ে । বলল, সে ঋষিকে মুক্ত করতে জামিলাকে ব্যবহার করতে যাচ্ছে।
“মনে হচ্ছে তুমি আমাদের ফেরার করিয়ে এখানে এনে আরেক মুসিবতে ফেলে দিলে। তুমি এখানে প্রেম-প্রীতি নিয়ে মেয়েত থাকো, আমরা নিজেরাই বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।” বলল নিজাম।
“আমি ইক ও প্রেম-প্রিয়ার ফাঁদে আটকাবো না। আগেই আমি তোমাদের বলছি, ঐসব কৃচক্রী পণ্ডিতদের আমি জানিয়ে দিতে চাই, ওদের কাদা মাটির তৈরি মূর্তিগুলো মুসলমানদের কোনই ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। আমি ওদের আখড়া থেকে ঘোড়ার ব্যবস্থা করে ছিনিয়ে এনে এদের বুঝিয়ে দেবো, কাদের ধর্ম সত্য। আমি ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আজ রাতেই যদি আমি মেয়েটিকে মুক্ত করতে পারি তবে আর এখানে ফিরে আসব না। তোমাদেরকেও সাথে নিয়ে যাবো এবং ওখান থেকেই গজনী রওয়ানা হবো।” বলল ইমরান।
“তুমি কি ভেবেছো?” বলল কাসেম বলখী। “কিসের ভিত্তিতে এতো দৃঢ়তার সাথে বলছো যে মেয়েটিকে তুমি মুক্ত করতে পারবে?”
ইমরান তার পরিকল্পনার কথা সব খুলে বলল কাসেম ও নিজামকে। ইমরানের পরিকল্পনা শুনে উভয়েই সম্মত হল। এরপর তিনজন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত অপারেশনের ফয়সালা করে ফেলল। এদের এ ঘরে রেখে ইমরান জামিলার-কামরায় গেল।
“এখানে কি ঋষির প্রেতাত্মা দেখা যায়”? জামিলাকে জিজ্ঞেস করল। ইমরান।
“না! কিন্তু ভয় লাগে।”
“তুমি পণ্ডিতদের কজা থেকে ঋষিকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এজন্য ওর প্রেতাত্মা আর তোমাকে ভয় দেখাবে না। ঋষি মুক্ত হয়ে গেলে তোমার পেরেশানীও থাকবে না।”
“আমাকে তো বলবে, কি করতে হবে আমার” অনুযোগের সুরে বলল। জামিলা।
“তোমাকে আমি একথাও বলে দিচ্ছি, যদি সফল হও, তবে আর এ বাড়িতে তোমাকে ফিরে আসতে হবে না।” বলল ইমরান। “আমার সাথে তোমাকে গজনী নিয়ে যাব।”
“সত্য বলছো!” হতাশার সাগরে আশার ঝিলিক দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল জামিলা।
“আমি কখনও কাউকে ধোঁকা দেই না। তোমাকেও ধোকা দেবো না।” • বলল ইমরান।
“এখন তুমি পণ্ডিতের আখড়ায় যাবে। গিয়ে বলবে, তুমি ঋষিকে স্বচক্ষে দেখতে চাও। এজন্য তোমাকে টিলার মন্দিরে নিয়ে যেতে বলবে। তোমাকে থলে ভর্তি আশরাফী দিচ্ছি, এগুলো পণ্ডিতকে দেবে। আশা করি, এসব পেয়ে পণ্ডিত রাজী হয়ে যাবে। এছাড়া ও পণ্ডিত যা দাবী করবে রাজী হয়ে যাবে। ভয় পেয়ো না। আমি তোমার পিছনেই থাকছি। তোমার কাজ শুধু পণ্ডিতকে টিলার মন্দির পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। কারণ, সেখানে সাধু-পণ্ডিত ছাড়া সাধারণ মানুষ যাওয়ার রাস্তা জানে না। সেখানে কারো যাওয়ার অনুমতিও নেই।”
“পণ্ডিত যদি আমাকে নিয়ে যেতে রাজী না হয় তবে কি করব?”
যেতে না চাইলে তুমি ছলে বলে তাকে মন্দিরে নিয়ে আসবে। আমি তাকে মন্দির যেতে বাধ্য করব। তাও যদি না যেতে চায় তবে এটিই হবে ওর জিন্দেগীর শেষ রজনী।”
“তাহলে আমার কি হবে?” উদ্বেগ কণ্ঠে বলল জামিলা। “আমি তো বলেছি, তোমাকে আর ঐ বুড়োর ঘরে যেতে হবে না। তুমি এখন আমার জিম্মায়। মন থেকে সব সন্দেহ-সংশয় ঝেড়ে ফেলে দাও। তুমি এখনই পণ্ডিতের আখড়ায় চলে যাও। আমি পেঁচার আওয়াজে তোমাকে সংকেত দিলে পণ্ডিতকে বাইরে নিয়ে আসবে।” বলল ইমরান।
জামিলাকে আশ্বস্ত করার জন্য ইমরান তাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করল। শেষে করেকটি থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তাকে বিদায় করল । জামিলাকে বিদায় করেই ইমরান ঋষির ভাই জগমোহনের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। জগমোহন খুবই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে বসেছিল। এমনিতেই মোহনের মন পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিল। একমাত্র বোন ঋষিকে পণ্ডিতেরা দেবীর চরণতলে বলীদানের নামে হাইজ্যাক করায় পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছিল জগমোহন।
ইমরান! পণ্ডিতেরা আমার ছোট বোনটিকে বলী দিতে নিয়ে গেছে।
আমি কোন পণ্ডিতকেই জ্যান্ত ছাড়ব না। কেউ জানবে না কে পণ্ডিতদের হত্যা করেছে।… তুমি কি করে আসলে?
“ওখানে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ইমরান। ঋষিকে তারা টিলার মন্দিরে নিয়ে গেছে। আমরা ওখানে গেলে পথ খুঁজে পাব না। পণ্ডিতেরা আমাদের ওখানে দেখলে খুন করে আমাদের মরদেহ মাটিতে পুতে রাখবে। ওখানে যাওয়ার চিন্তা করো না ইমরান!”
“চিন্তা আমি অনেক করেছি। তোমার মন যদি তোমাদের ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে তবে তোমাদের উচিত এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। আমি তোমাকে আর তোমার বোনকে আমাদের সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি।”
“ঋষি! ঋষি কোথায় এখন?” বসা থেকে লাফিয়ে উঠে ইমরানের কাছে নিয়ে আসে জগমোহন। তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। এ মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছু জানতে চাইবে না। যদি সকাল পর্যন্ত তোমার কাছে আমি না পৌঁছি তাহলে বুঝবে. আমি আর বেঁচে নেই।”
অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল মোহনের। কিন্তু ইমরান যখন নিষেধ করল, তখন আর জিজ্ঞেস করেনি। ইমরানের উপর জগমোহনের অগাধ আস্থা। সে চারটি ঘোড়া নিয়ে রাভী নদীর পাড়ে অপেক্ষার প্রতিশ্রুতি দিল এজন্যে যে, ইমরান তার বোনকে মুক্ত করে নিয়ে আসবে। এরপর বোন-ভাই ও ইমরান এক সাথে এদেশ ছেড়ে চলে যাবে। ইমরানের ব্যাপারে সে মনের মধ্যে কোন সংশয়কে প্রশ্রয় দিল না। তার মনে পণ্ডিতদের অপকর্মের প্রতিশোধ গ্রহণে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ইমরানের কথায় মোহনের হৃদয়ে নতুন জীবনের আলোক জ্বলে উঠল।
