গভীর রাত। ইমরান জামিলাকে ঘরে নিয়ে যেতে দ্বিধা করছিল। কারণ, ঘরে কাসেম নিজাম অবস্থান করছে। জামিলাকে সে তাদের অবস্থান জানতে দিতে চায় না আর ওদেরকেও এটা বুঝতে দিতে চায় না যে, সে গোয়েন্দা কর্ম ছেড়ে নারী নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে গেছে। জামিলার সাথে সে কথা বলতেই প্রস্তুত ছিল না কিন্তু ওর অবস্থান এতই বিপর্যস্ত ছিল যে, তাকে আর ধমকানো উচিত মনে করলো না ইমরান।
‘দেও-দৈত্যের কথা কি বলছ! ওসব কিছুই না। তোমার অপরাধই ডাইনী হয়ে তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে।”
“না ইমরান! ঋষি আমার চোখে ভাসতে থাকে। আমি চোখ বন্ধ করতে পারি না। ওর চিৎকার আমার আত্মা কেঁপে ওঠে। চল ইমরান, ঘরে বসে কথা বলি।”
“না, ঘরে যাওয়া যাবে না। যা বলার এখানেই বল। আমার পাশে এসে দাঁড়াও।”
“আমি দাঁড়াতে পারছি না। আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে। আমাকে বাঁচাও ইমরান। এত নিষ্ঠুর হয়ো না।”
জামিলার কাছে মেঝেতে বসল ইমরান। জামিলা তার শরীর ঘেঁষে বসল। সে ভয়ে কাঁপছে।
“আমি চোখ বন্ধ করলেই ঋষি চিৎকার করে আমাকে জাগিয়ে দেয়। ও আমাকে অভিশাপ দিতে থাকে, ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে উঠে। আমি কিছুই বলতে পারি না। অন্ধকারেও আমি ঋষিকে দেখি। তবে সেটি সুন্দর ঋষি নয়, ইয়া লম্বা লম্বা দাঁত, বিরাট নখ আর কাঁটাভরা শরীর নিয়ে দৈত্যের মতো আমার দিকে তেড়ে আসে। কিন্তু কাছে এস বাতাসে মিলিয়ে যায়। গতরাতে এ দৈত্য থেকে বাঁচার জন্যে আমি ঘরের কোণে কোণে দৌড়াদৌড়ি করে কাটিয়েছি। সারাটা দিন আমি ঘুমাতে পারিনি। দিনের বেলায় ওকে দেখতে না পেলেও ওর চিৎকার শুনতে পাই। আমার মনে হয়, ঋষি আমার কামরাতেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পাই না। আমাকে মেরে ফেলবে, ইমরান! আল্লাহর দোহাই! তুমি আমাকে ঋষির প্রেতাত্মা থেকে বাঁচাও!”
বস্তৃত জামিলা ছিল মজলুম তরুণী। তার মা-বাবা টাকার লোভে মোটা অংকের পণ নিয়ে জামিলার চেয়ে তিনগুণ বেশি বয়সের এক বুড়োর সাথে তাকে বিয়ে দেয়। অথচ জামিলা পরমা সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী ও টগবগে তারুণ্যদীপ্ত রমণী। বণিকের ঘরে সে তৃতীয় বউ। মাসান্তে সফর থেকে বাড়ি ফেরা বণিকের ক্ষণিকের বিনোদন সঙ্গীনীমাত্র। জীবনের স্বাদ ও যৌবনের আহ্লাদ থেকে সে বঞ্চিতা, নিপীড়িতা। তাই তার হৃদয়ে এই অনাচার ও অতৃপ্তির যন্ত্রণায় জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের সর্বনাশা আগুন। এই প্রতিশোধ বিত্তের বিরুদ্ধে বিকৃতির বিরুদ্ধে, সর্বোপরি অসচেতন বাবা-মার আত্মমর্যাদাহীনতার বিরুদ্ধে।
জামিলা যখন বাড়ির বারান্দা থেকে প্রতিদিন এই পথে সুদর্শন ইমরানকে । যেতে দেখত আর ওর হাঁটাচলা, ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্যে যে ছন্দময় ব্যঞ্জনা ফুটে উঠতো তা দেখে জামিলার হৃদয়ের বঞ্চনার হাহাকার আরো উথলে উঠতো, শুরু হতো দগ্ধ হৃদয়ে কামনার অগ্ন্যুৎপাত।
দেখতে দেখতে ইমরানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে ইমরানের খোঁজ খবর নিয়ে তার ঠিকানা উদ্ধার করে। দৃষ্টি রাখতে ইমরানের প্রতি। একদিন ইমরানের ঘরে প্রবেশ করে পরিচিত হয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করল। ইমরান তার প্রতি আকৃষ্ট না হলেও জামিলা আশা ছাড়েনি। কিন্তু ঋষিকে ওর ঘরে আসতে দেখে জামিলা ঋষির প্রতি ইর্ষাপরায়ণ হয়ে ওঠে। ইমরানকে পাওয়ার পথে ঋষিকে কাটা মনে করে। তাই ঋষিকে সরিয়ে দিয়ে জামিলা ইমরানকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে যখন দেখল, উদ্দিষ্ট অর্জন তো দূরে থাক তার জীবনই দুর্বিসহ হতে চলেছে, তাই সে এখন বিভীষিকাময় জীবন থেকে বাঁচার জন্যে ইমরানের দারস্থ হয়েছে। তবুও সে আশাবাদী, ইমরান তাকে সাহায্যে করবে। প্রয়োজনে সে কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবে। ইমরানের সব কথা মেনে নিবে।
মূলত জামিলা দুশ্চরিত্রা ছিল না। কিন্তু ইমরানের প্রেম প্রত্যাখ্যান ও তাকে পাওয়ার আশঙ্কা তাকে ভয়াবহ অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। সে মন্দিরের বড়। পণ্ডিতকে থলেভর্তি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ঋষিকে বলীদানে প্ররোচিত করে এখন বিবেকের দংশনে ভুগছে। সে নিজেকে ঋষির ঘাতক.ভাবছে। তার সরলমন এই মহাপাপ থেকে মুক্তি চাচ্ছে। তাই ইমরানের পায়ে ধরে এর প্রতিকার ভিক্ষা করছে জামিলা।
“গত রাতে তোমাকে আমি বলেছিলাম, পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর, নইলে, পাপের আগুনে তুমি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।” বলল ইমরান। “এখনও ঋষি জীবিত। যে দিন তাকে হত্যা করা হবে সেদিন থেকে ওর প্রেতাত্মা তোমার ঘাড়ে সওয়ার হবে। যতদিন তুমি জীবিত থাকবে ওর প্রেতাত্মা তোমাকে তাড়াতে থাকবে। তুমি রাতে ঘুমাতে পারবে না, পাগল হয়ে যাবে, নয় তো আত্মহত্যা করবে। অথবা রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করবে। মানুষ তোমাকে দেখে ভয়ে পালাবে। লোকালয় থেকে তাড়িয়ে দিবে।”
“জামিলা ভয়ে জড়সড় হয়ে ইমরানের শরীরের সাথে মিশে যেতে চাইল। কাঁপছে থরথর করে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, বল, এখন আমাকে কি করতে হবে! আর এক রাত এভাবে কাটালে আমি পাগল হয়ে যাবো।
“ঋষিকে পণ্ডিতদের কজা থেকে মুক্ত করে দাও।” বলল ইমরান। সে ইতিমধ্যে ভেবে নিয়েছে, জামিলা ঋষিকে মুক্ত করার ব্যাপারে কাজে লাগতে পারে।
“আমি কিভাবে ওকে মুক্ত করবো?”
“সে কাজ আমি করব। তুমি শুধু আমার সহযোগিতা করবে। এতেই তোমার মুক্তি। ঋষি খুন হলে সে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে কিন্তু তোমার যে কী ভয়াবহ অবস্থা হবে সে কথা তোমাকে আমি বলেছি।”
