আমরা এদের পাকড়াও করে জীবিত জ্বালিয়ে দিলে কি হবে? এদের জায়গা আরো একশ’ জনে পুরো করে ফেলবে। আমাদেরকে এদের বুকের আগুন নিভাতে হবে। আর এ আগুন হলো তাদের ঈমান ও বিশ্বাসের আগুন। গাছের পাতা ঝরে পড়লে গাছ মরে না, গাছের শিকড় কেটে দিতে হয়।
আগুন জ্বেলে আগুন নেভানো যাবে না। আগুন নেভাতে হলে পানি ঢালতে হবে। আপনাকে আগুনের মতো তপ্ত মাথায় নয় ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে পানি ঢালার ব্যবস্থা করতে হবে।” বলল উজির উদয় শংকর।
এখানকার মুসলমানদের উপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এখানকার মুসলিম নেতাদের পুরস্কার-উপঢৌকন দিয়ে বাগে আনতে হবে। তাদের ইজ্জত-ইকরামের রাতের দরবার ও সুরা-গানের আসরে দাওয়াত করে মদ-সুরা ও নারীর সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট করে ঈমানের জ্যোতি হৃদয় থেকে নিভিয়ে দিতে হবে। অতীতের কথা আমার মনে পড়ে। মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতের পশ্চিম-উত্তর প্রান্তে ইসলামের বীজ বপন করেছিলেন। তার আগমনে ভারতের অসংখ্যা হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ফলে আমাদের দেব-দেবীদের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে আসে। বিন কাসিমের অবর্তমানে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে পদানত করতে চেষ্টা করেছে। পক্ষান্তরে বিন কাসিমের অনুসারীরা কৌশল প্রয়োগ করে তাদের সংস্কৃতিতে আমাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। দেখা গেছে, সাংস্কৃতিক কৌশলটাই শক্তি প্রয়োগের চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে। অভিজ্ঞতা বলছে, মদ, নারী, আর ভোগ-বিলাসিতা মুসলিম নেতৃবর্গকে না প্রকৃত মুসলিম থাকতে দিয়েছে না হিন্দুয় রূপান্তরিত করেছে।
এক পর্যায়ে মুসলমানদের ইমলাম মসজিদের চার দেয়ালে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে গেছে। এদের শারীরিকভাবে শাস্তি দিয়ে বাগে আনা যাবে না। আত্মিকভাবে এদের হত্যা করতে হবে। প্রেম, মহব্বত ও ধোকা দিয়ে এদের সংস্কৃতি বিকৃত করে দিতে হবে। এদের হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকতে হবে আমাদের ভোগবাদী সংস্কৃতির রঙিন ছবি।
“রাজা জয়পাল আগুনের দিকে তাকিয়ে হতাশ ও ভগ্ন হৃদয়ে কথা বলছিল। এ জয়পালের গজনী অভিযান কিছু দিনের জন্যে মূলতবি হয়ে গেল। গজনীবাসীরা সেনা অভিযান ছাড়াই সফল আক্রমণ করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করে ফেলেছিল। অগ্নিকান্দ্রে উপস্থিত সুফল পাওয়া গেল। রাজার স্মৃতি থেকে কয়েদী কাসেম ও নিজামের ফেরার হওয়ার ব্যাপারটি হারিয়ে গেল।
এদিকে ঋষিকে পণ্ডিতেরা বলীদানের জন্য প্রস্তুত করতে পাহাড়ের উপর স্থাপিত মন্দিরে নিয়ে যায়। পাহাড়ের উপরের মন্দিরটিতে কোন স্থাপত্য নেই। অনেক আগে রাভী নদীর গতিধারা ভিন্ন ছিল। নদীর কূল ঘেঁষেই ছিল ঘন বন-জঙ্গল আর উঁচু উঁচু টিলার সমাহার। বর্তমানে যেটি বুড়ী নদী সেটিই আগে রাভী নদী ছিল। অসংখ্য পাহাড় ও টিলায় ঘেরা জায়গাটির মাটি পিচ্ছিল ও আগুনে পোড়ানো ইটের মতো শক্ত। জয়পালের আগের কোন রাজার আমলে হিন্দু কারিগররা টিলাগুলোকে কেটে চারদিকে দেয়ালের মতো করে গড়ে তোলে। তারা পাহাড় কেটে ভেতরে বালাখানার মতো অনেক কুঠরী বানায় এবং এসবের দেয়ালে দেবদেবীদের মূর্তি অংকন করে । পাথর কেটে মূর্তির অবয়ব তৈরি করে গোটা এলাকাটিকে মন্দিরে রূপান্তরিত করে ফেলে।
বাইরে থেকে কোন মানুষ সেখানে গিয়ে বুঝতেই পারতো না যে, এটি কি প্রকৃতই পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে, না মোটা দেয়াল তুলে এ মন্দির তৈরি করা হয়েছে। “ ওখানে সাধু সন্ন্যাসী ও মন্দিরের পণ্ডিত ছাড়া সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। জায়গাটি যেমন দুর্গম, পথও ছিল জটিল। একটু পর পরই রাস্তার বাঁক ছিল এবং এক একটি রাস্তা কিছুদূর গিয়ে শেষ হয়ে যেতো। অভিজ্ঞতা ও– জ্ঞাত লোকছাড়া ওখানে কারো সাধ্য ছিল না যাওয়া এবং বেরিয়ে আসা। তা ছাড়া সাধারণ কোন পূজা অর্চনা ওখানে হতো না। শুধু বলীদান অনুষ্ঠানগুলো লিরার মন্দিরে সম্পাদিত হতো। জায়গাটি যেমন ছিল ভয়াল ড্রপ দুর্গম। পণ্ডিতেরা ছাড়া ওদিকটা মাড়োনোর সাহস করতে না কেউ। সবাই বিশ্বাস করত, ওখানটায় দেবদেবী ও ভূত-পেত্নীর আবাসস্থল। এজন্যই ওখানে বলীদানপর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
জয়পালের পর সুলতান মাহমূদ যখন ভারত অভিযান শুরু করেন তখন আল্লাহর অপার কৃপায় বুড়ী নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং অসংখ্য কুমারী ও নারীর সম্ভ্রমহানী ও রক্তে রঞ্জিত টিলার মন্দিরের দেবদেবীর চিহ্নও নদীর পানি ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে টিলার অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে হিন্দুদের ইতিহাসে আর মুখে মুখেই শুধু সেই মন্দিরের কথা শোনা যায়। বাস্তবে ওখানে এখন টিলা ও মন্দিরের কোন নামগন্ধও নেই।
যে রাতে গজনীর গোয়েন্দা শার্দুলেরা জয়পালের যুদ্ধ সরঞ্জামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল সে দিন বিকেলেই তাদের দু’জন ইমরানকে তাদের আগমনের ও অপারেশনের কথা জানাতে হাজির হয়েছিল ইমরানের ঘরে। তারা বেরিয়ে যাওয়ার পরই আবার গেটে কড়া নাড়ার শব্দ হল। ইমরান গেট খুলে দিতেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো জামিলী। ইমরান গেট বন্ধ করে রাগতস্বরে জামিলাকে বলল- “আমার ঘরে আসতে তোমাকে নিষেধ করেছিলাম, তারপরও আসলে কেন? ‘
জবাব না দিয়ে তার পার জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল জামিলা। কান্নাজড়িতকণ্ঠে বলল, “আমাকে পাপ থেকে বাঁচাও ইমরান। আমি ঘুমাতে পারি না। আমার চোখের সামনে সব সময় দৈত্যের মতো কি যেন এসে তয় দেখাতে থাকে। ইমরান! তুমি আমাকে রক্ষা কর।”
