“সকল প্রহরীকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেল।” বলল রাজা। রাজা জয়পাল সর্বগ্রাসী আগুনে সকল যুদ্ধ সরঞ্জাম পুড়তে দেখে দিশেহারা হয়ে যায়। রাজা চিৎকার, চেঁচামেচি করে আগুনের চতুষ্পর্শ্বে ঘুরছিল আর অশ্রাব্য গালিগালাজ করছিল। রাজার ভয়ে তার উজীর, নাজির ও জেনারেলরাও শহরবাসী ও সাধারণ সৈনিকদের গালিগালাজ করছিল আর কঠিন ভাষায় কাজের নির্দেশ দিচ্ছিল। রাজা যে ঘোড়ায় সওয়ার ছিল কাকতালীয়ভাবে সেই ঘোড়াটিও বিকট আওয়াজে হ্রেষাব করছিল।
অনেক চেষ্টায় সামান্য কিছু সরঞ্জাম রক্ষা করা সম্ভব হয়। অসহায়ের মতো এক পর্যায়ে রাজা, মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা দূরে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত লেলিহান অগ্নিশিখার দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল।
“কিভাবে আগুন লেগেছে তা বলা কঠিন।” বলল রাজা। যতো প্রহরী কাজে নিয়োজিত ছিল ওদের সবাইকে কয়েদখানায় পা উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখ। যদি কেউ আগুন সম্পর্কে সত্য তথ্য দেয় তবে তাকে মুক্তি দিবে, অন্যথায় তাদের এভাবেই ঝুলিয়ে রাখবে। আর আগামী পনের দিনের মধ্যে পুড়ে যাওয়া সকল সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। আমাকে শীঘ্রই গজনী আক্রমণ করতে হবে। সুবক্তগীনের মৃত্যুর পরই দ্রুত গজনী আক্রমণ করা উচিত ছিল। এখন যত দেরী হবে তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি ততই প্রস্তুতির সময় পাবে।”
“এটা নিশ্চয়ই মুসলমানদের অপকর্ম।” বলল উজির উদয় শংকর। “মহারাজের কি স্মরণ নেই দু’কয়েদী যে পালিয়ে গেছে। হতে পারে ওরাই এই সর্বনাশের হোতা।”
“মুসলমানদের ঘরে ঘরে তল্লাশী কর। এদের ঘরে নগদ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ রূপা আর খাদ্যদ্রব্য যা পাবে সব নিয়ে আসবে। কোন মুসলমানের প্রতি সন্দেহ হলে আমার কাছে ধরে নিয়ে এসো। কিন্তু আমার মনে হয় না তারা এমন অপকর্মের দুঃসাহস দেখিয়েছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল রাজা।
“এই অস্পৃশ্য জাতি এর চেয়েও জঘন্য কাজ করতে পারে।” বলল এক জেনারেল।
মহারাজ! আপনি গজনীর বন্দীদের কাছ থেকে বিজয়ের যে রহস্য উদঘাটন করছিলেন, আসলে এদের রহস্য এমনই। এদের দুঃসাহস আপনি ধারণাও করতে পারবেন না। আমাদেরকে এদের দুঃসাহসের চরম শিক্ষা দিতে হবে। অবশ্য আমি এ দুর্বলতা স্বীকার করছি যে, আমাদের সৈনিকদের মনে এমন সাহস নেই। একথাও ঠিক যে, আমাদের যে সব সেনা সদস্য গজনী থেকে পালিয়ে এসেছে এদের মনে এখনও মুসলিম সৈন্যদের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
“তোমাদের সৈন্যদের বল, এ লড়াই আমাদের দেবতা ও মুসলমানদের পয়গম্বরের মর্যাদা রক্ষার লড়াই।” বলল রাজা। বলে দাও, এ লড়াইয়ে যদি কোন হিন্দু নিহত হয় তবে পরজনমে সে সুন্দর পাখি হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করবে। উন্মুক্ত আকাশে আর সাজানে বাগানে সে মন মাতানো গান গেয়ে মাতিয়ে রাখবে।”
রাজা জয়পালের মাথা বিগড়ে দিয়েছিল পণ্ডিতেরা। তাই পণ্ডিতদের যাদুকরী প্রভাবে রাজা বাস্তবতা ভুলে ওদের মতোই দেবদেবীর অলীক শক্তি ও বিশ্বাসে আকতক্ষা পূরণের ও ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলার স্বপ্নে উন্মাদ ছিল।, রাজা বলল, “তোমারা জান না, দেবী আমাদের উপর রুষ্ট হওয়ার কারণেই এসব হচ্ছে। আর পনের দিনের মধ্যেই দেবীর জন্যে কুমারী বলীদান করা হবে। তখন সব বিছুই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”
“মহারাজ! আমার কথা আপনার ভাল নাও লাগতে পারে। এজন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।” বলল জেনারেল। একটি অবলা কুমারীকে বলী দিয়ে বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। বিজয়ের জন্যে আমাদের প্রত্যেকটি সৈনিককে জীবন বলীদানের অঙ্গীকার করতে হবে। এমনকি আমার আপনার জীবনও জাতির জন্যে উৎসর্গ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে এমন সন্তানের সংখ্যা না বাড়বে ততদিন পর্যন্ত বিজয়ের মুখ দেখা স্বপ্নই থেকে যাবে। যারা আমাদের সেনাবাহিনীর এক বছরের রসদ এক রাতে ধ্বংস করে দিয়েছে এরা কতটুকু জাতির জন্যে নিবেদিত প্রাণ তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে”।
“তোমার কি দৃঢ় বিশ্বাস, এই আগুন মুসলমানরা লাগিয়েছে?” জেনারেলের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল রাজা।
“জী হ্যাঁ মহারাজা! জবাব দিল জেনারেল। আমি সেনাপতি। একজন সৈনিকের পরাজয় আমারই পরাজয়। আমি বাস্তববাদী। বাস্তবতাকে যাচাই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছা আমার কর্তব্য। কোন সেনাপতি ধারণা আর অন্ধবিশ্বাসে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে না। আমি ভৌতিক বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে যুদ্ধনীতি গ্রহণ করলে আপনার রাজমহল মসজিদে পরিণত হবে আর আপনার রাজত্ব অল্প দিনের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে।
আমি আপনাকে বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত করছি। এটাই সত্য, আগুন মুসলমানরাই লাগিয়েছে। আমি নিরীক্ষা করে দেখেছি; আগুন এক জায়গায় লাগেনি। একই সাথে দশ পনের জায়গায় আগুন জ্বলে উঠে। যদি প্রহরীদের ভুলের কারণে আগুনের সূত্রপাত ঘটত তাহলে আগুন এক জায়গা থেকে জ্বলতো, একই সাথে ভিন্ন স্নি জায়গায় জ্বলতো না। এক জায়গায় থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে প্রহরীরা আগুন নিভিয়ে ফেলতে সক্ষম হতো।”
“তার মানে কি এখানে আগুন দেয়ার জন্যে গজনী থেকে সৈন্য এসেছিল? না শহরের সব মুসলমান এসে দশ পনের জায়গা আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে?” ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রাজা।
“একথা আমি হলফ করে বলতে পারি, এ আগুন শহরের মুসলমানরা লাগায়নি। গজনী থেকেও আগুন লাগাতে সৈন্য আসেনি। তবে যারাই আগুন লাগিয়ে থাকুক, এদের সংখ্যা কুড়ি পঁচিশ জনের বেশি ছিল না। আর এরা শুধু আগুন জ্বালাতে আসেনি, নিজেরাও জ্বলতে এসেছিল। এ ধরনের কাজ যারা করে এরা এমনই দুঃসাহসী হয়ে থাকে।
