পণ্ডিতেরা সাধারণ হিন্দু প্রজাদের মধ্যে গজনীর সুলতান ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমনই ঘৃণা ও প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, হিন্দুরা রাজার আগ্রাসনকে ধর্মযুদ্ধ বলে বিশ্বাস করছিল। হিন্দু মহিলারা গায়ের অলংকার, জমানো টাকা আর বাজারে এটা ওটা বিক্রি করে যা-ই পাওয়া যেতো রাজার ভাণ্ডারে জমা করতো। প্রজাদের মনে বিশ্বাস ছিল, এবার ঠিকই রাজা গজনীর মুসলিম শাসককে পরাজিত করে সব মুসলিম প্রজাকে গোলাম-বাদী বানিয়ে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করবে। আর দেবদেবীদের জয়গান,ভারতের সীমানা পেরিয়ে গজনী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। মূলত রাজার এই বিশাল সাজ-সরঞ্জামের ভাণ্ডার স্ফীত হয়েছে সাধারণ প্রজাদের ঘাম-রক্তের বিনিময়ে। অতএব, হিন্দুপ্রজাদের পক্ষ থেকে দুস্কৃতির আশঙ্কা মোটেও নেই।
অথচ জয়পালের বিশাল আয়োজন পর্বও খর্ব করে দেয়ার জন্যে গজনীর শার্দুলেরা পৌঁছে গিয়েছিল লাহোরে। শাহীনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, চিতার মতো ক্ষীপ্র, বিদ্যুতের গতি ও সিংহ শক্তির অধিকারী এরা। এরা ইসলামের জন্যে নমরুদের আগুনে আত্মাহুতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। তারা শুধু এতটুকুই যাচাই করে, কাজটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের অনুকূলে কিনা। এরা বিশ্বাস করতো, শক্রর সিংহাসন উল্টে দেয়ার জন্যে কোন রাজশক্তির দরকার হয় না। রাজকীয় সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করতে সমান শক্তির সেনাবাহিনীর দরকার হয় না। এরা বিশ্বাস করতো, ঈমান শক্তিশালী হলে দুর্গের মহাপ্রাচীরও বালির বাঁধের মতো ধসিয়ে দেয়া যায়। যে মুহাম্মদ বিন কাসিম উপমহাদেশে। ইসলামের ঝাণ্ডা গেড়েছিলেন এরা ছিল সেই মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরী। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এরা এ অঞ্চলের নিবু নিবু ইসলামের প্রদীপকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন হাজারো জীবন।
এরা এসেছে ঘোড়ায় চড়ে। এদেরই দু’জন এখানকার সব চেয়ে দায়িত্ববান গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইমরানের সাথে দেখা করে তাদের উপস্থিতির কথা এখানে কর্মরত সহকর্মীদের জানিয়ে দেয়ার জন্য গিয়েছিল। আর অন্যরা ফাটা-ছেঁড়া, ময়লা পোষশাকে ঠিকানা অন্বেষে মুসাফির বেশে শহরের মধ্যে ঘুরাফেরা করে বিকেলেই শহরের বাইরে চলে গিয়েছিল। রাতে যখন শহরবাসী ঘুমের কোলে অচেতন, তখন এরা শহরের বাইরে এক নির্জন জায়গায় একত্রিত হয়ে উর্দিষ্ট বাস্তবায়নে জীবনবাজী রাখতে হাতে হাত রেখে অঙ্গীকার করছে। পরস্পরে মুসাফা ও কোলাকোলি করে শেষবারের মতো এরা সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে হয় কার্যোদ্ধার নয়তো মৃত্যু- এই ছিল তাদের প্রতিজ্ঞা। এদের পরস্পরের আবার দেখা হবে এ প্রত্যাশা মন থেকে বিদায় করে দিয়েছিল গোয়েন্দারা। আবার জীবিত দেশে ফিরে যাওয়ার আশা এরা ত্যাগ করেই নেমেছিল এই কঠিন যুদ্ধে। নিরাপদ দূরত্বে ঘোড়া বেঁধে রেখে বিভিন্ন দিক থেকে দু’জন দু’জন করে তাবুর দিকে অগ্রসর হল। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি করে পানিবহনের কৌটা। সাধারণ মুসাফির যেসব পাত্রে পানি বহন করে এরা এগুলোতে জ্বালানী নিয়ে এসেছে। সাথে রেখেছে দ্রুত আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম।
তাবুর বাইরে প্রহরীদের প্রতি তাদের সতর্ক দৃষ্টি। এক জায়গা দিয়ে দু’প্রহরী কিছু দূর চলে গেলে এই সুযোগে দু’জন ক্রোলিং করে মাটির সাথে শরীর মিশিয়ে দ্রুত দুটি তাঁবুর মাঝখানে গিয়ে থেমে গেল। কৌটা খুলে তাবুতে তেল ছিটিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। কিন্তু এখানে পৌঁছার আগেই আরো চার-পাঁচ জায়গায় আগুন জ্বলে উঠল। চার জানবাজ মালভর্তি গরুর গাড়ীতে জ্বালানী তেল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। প্রহরীরা হঠাৎ কয়েক জায়গায় একই সাথে আগুন জ্বলে উঠতে দেখে কোনটা রেখে কোনটা নিভাবে দিশা পাচ্ছিল না। দ্রুত তাবুর ভেতরের লোকেরা আগুন নিভাতে বেরিয়ে আসল। কিন্তু এর আগেই গজনীর গায়েন্দারা চিতার ন্যায় ক্ষিপ্র গতিতে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। রাতের বাতাসে দেখতে দেখতে আগুনের লেলিহান শিখা সারা ময়দান গ্রাস করে নেয়। আগুনে আকাশ লাল হয়ে গেল। আলো ছড়িয়ে পড়ল বহুদূর পর্যন্ত।
আগুনের তাণ্ডবে ঘুমন্ত সৈন্যরা জেগে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করল। কে কার আগে জীবন বাঁচাবে- হুড়োহুড়ি করে অনেকেই আহত হল। গোলাবারুদের ডিপোতে আগুন ধরলে বিকট শব্দে সারা মাঠ কেঁপে উঠে। বাধা ঘোড়া ও গরুগুলো আগুনে দগ্ধ অর্ধদগ্ধ হয়ে চেঁচামেচি করছিল আর ভয়ার্ত মানুষের আর্তনাদে গোটা ময়দান বিভীষিকাময় হয়ে উঠল। শহরের সকল বাসিন্দা জেগে উঠল আগুনের আলো ও মানুষের চিৎকারে। রাজার সব সৈন্য আগুন নেভানোর জন্যে ময়দানের দিকে দৌড়াল কিন্তু ততক্ষণে দু’মাইল ব্যাসার্ধের গোটা তাবু ঘেরা চত্বর আগুনে গ্রাস করে ফেলেছে। তাজা গাছপালায় পর্যন্ত ধরে গেছে। আগুনের তীব্র তাপের কারণে সৈনিকদের পক্ষেও তাবুর দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কর্মকর্তারা নির্দেশ দিচ্ছিল, এখনও যে সব। আসবাব পত্রে আগুন ধরেনি সেগুলো বাঁচাও কিন্তু কারো পক্ষেই আগুনের বেষ্টনি ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছিল না।
শহরের মজলুম মুসলিম অধিবাসীরা রাজার সমর সরঞ্জামে আগুন লাগায় স্বস্তিবোধ করছিল। কিন্তু হিন্দুরা এটাকে অগ্নিদেবতার অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ হিসেবে চিহ্নিত করে আহাজারি আর মাতম শুরু করে দিল। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। বড় পণ্ডিত সরস্বতির সামনে দু’হাত জোড় করে কাকুতি মিনতি শুরু করল। সব হিন্দু কিশোরী মহিলা মন্দিরে জমায়েত হয়ে ভজনা গাইতে লাগল। আর সকল পুরুষ বাসিন্দাদের সৈন্যরা হাঁকিয়ে নিয়ে গেল কুয়া থেকে পানি তুলে আগুন নেভানোর জন্যে। ঘোড়ার গাড়ী দিয়ে দূরের পুকুর ও নদী থেকে বড় মটকায় করে পানি এনে আগুন নেভানো তো দূরে থাক আধা মাইল দূর পর্যন্ত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব ছিল না।
