“শীঘ্রই আমরা অভিযানে বের হব।” বলল রাজা।
এসব সংবাদ সংগ্রহ করতে ইমরানের মতো ঝানু গোয়েন্দার মোটেও বেগ পেতে হল না। সারা দিন সে রাজ প্রাসাদে ডিউটি করে সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরে এল তখন তাকে অনেকটাই উদ্বেগ ও চিন্তামুক্ত মনে হল। বন্দীদের ফেরার হওয়ার ব্যাপারে ইমরানের উপর রাজপ্রসাদের কেউ সন্দেহ করল না। কাসেম ও নিজাম তাড়াতাড়ি গজনী রওয়ানা হওয়ার জন্যে তাকে পীড়াপীড়ি করছিল। ইমরান তাদের পরিস্থিতি জানিয়ে বলল, আরো কয়েকদিন তোমাদের এখানেই লুকিয়ে থাকতে হবে। এ মুহূর্তে বের হলেই মহাবিপদ। শহরের প্রতিটি বহিগর্মন পথে চেকপোষ্ট বসানো হয়েছে। দূরদূরান্ত পর্যন্ত অনুসন্ধানীদল পাঠানো হয়েছে। এখন ঘর থেকে বের হলে নিশ্চিত ধরা পড়তে হবে।
ইমরানের দরজায় সাংকেতিক কড়া নাড়ানোর শব্দ হলো। ইমরান হেসে বললো, দোস্ত এসেছে! দরজা খুলে দিলে দু’জন লোক ভেতরে প্রবেশ করল। ইমরান ভেতরের ছিটকানি লাগিয়ে আগন্তুকদের ঘরে নিয়ে এল। কাসেম ও নিজামদের ঘরে এদের নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল।
এরা দুজন ছিল পেশোয়ারের বাসিন্দা। তারা বলল, রাজা জয়পাল শীঘ্রই গজনী অভিযানে রওয়ানা হবে। এ মুহূর্তে আমাদের দুটি কাজ করতে হবে।
প্রথমতঃ কাউকে দ্রুত পাঠিয়ে সুলতানকে জয়পালের আক্রমণের খবর দিতে হবে। যাতে রওয়ানা হওয়ার আগেই সুলতান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন । দ্বিতীয়তঃ শহরের বাইরে রাজা যুদ্ধসামগ্রী ও রসদপত্রের বিরাট মওজুদ গড়ে তুলেছে। সমরসামগ্রী সংগ্রহ ও জমার আজ শেষ দিন। ওখানে বিপুল খাদ্য, যুদ্ধাস্ত্র, ঘোড় আর গরুরগাড়ী রয়েছে। এসবে আগুন লাগিয়ে দিতে হবে।
আগুন লাগানোর কি কৌশল হতে পারে? লাহোরের লোকদের এসবের কোন ধারণা নেই। বলল ইমরান।
এক আগন্তুক বলল, শোনেননি এর আগেরবার লাহোরবাসী কি খেলা দেখেছে। একটা মেয়েকে কেন্দ্র করে গোটা লাহোরবাসী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এখন বাটাভাবাসীরাও গজনীর বিরুদ্ধে সমরায়োজন করেছে। তাই তাদেরও সে ধরনের কোন খেলা দেখাতে হবে।
বাটাভা জয়পালের রাজধানী। এজন্য এখানেই গজনীর গোয়েন্দাদের আড্ডা। যেদিন থেকে জয়পাল গজনী আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করল সেদিন থেকেই যাবতীয় সামরিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বানিয়েছিল লাহোরকে। লোহোরে গজনীর গোয়েন্দা ছাড়াও স্থানীয় লোকেরাও তাদের তৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছিল। হিন্দুরাজা ও শাসকদের অত্যাচার উৎপীড়নে বহু সংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা গজনীর গোয়েন্দা কার্যক্রমের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। বয়সে তরুণ, মেধাবী ও সাহসী অনেক যুবক লাহোরে গজনীর সুলতানের পক্ষে রাত দিন কাজ করে যাচ্ছিল।
রাজা জয়পাল যখন গজনী আক্রমণের চূড়ান্ত লক্ষ্যে লাহোরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম, সমরাস্ত্র ও গাড়ী ঘোড়ার সমাবেশ করে, তখন এগুলো ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে গজনী গোয়েন্দাদের কুড়িজনের একটি স্পেশাল টিম মুসাফির বেশে দুজন দুজন করে বিভক্ত হয়ে বাটাভা থেকে লাহোর প্রবেশ করে। এরা লাহোরের স্থানীয় এজেন্টদের সংবাদটি পৌঁছে দিয়েই অপারেশন শুরু করবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করতে এসেছে দু’ গোয়েন্দা।
১.৩ গন্তব্য যাত্রা
গন্তব্য যাত্রা
লাহোরের মূল শহর থেকে একটু দূরে বিশাল ময়দান। হাজার হাজার তাঁবু, গাড়ী, ঘোড়া, সৈন্য ও সাজ সরঞ্জামে ঠাসা ময়দান। একটা তাবুর সাথে লাগানো আরেকটি তাঁবু। রাজ্যের হিন্দু প্রজারা নিজেদের সঞ্চিত সব ধন-সম্পদ অকাতরে রাজার সামরিক ভাণ্ডারে জমা করেছে। হিন্দু পণ্ডিত ও রাজার লোকেরা হিন্দু প্রজাদের মনে মুসলিম বিদ্বেষী উন্মাদনা ছড়িয়ে তাদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ক্ষেপিয়ে তুলেছে গজনীর সৈনিকদের বিরুদ্ধে। হাজারো গরুর গাড়ী বোঝাই করা হয়েছে যুদ্ধযাত্রী সৈনিকদের পানাহার ও যুদ্ধসামগ্রী পরিবহণ করতে। আসবাব পত্রের বিরাট আয়োজন স্তূপাকারে রাখা হয়েছে ময়দানে। দু’ মাইল ব্যাসার্ধের গোটা এলাকাটি যুদ্ধ সরঞ্জাম ও তাবুতে ছেয়ে গেছে। দিনরাত টহল দিচ্ছে সশস্ত্র প্রহরী।
রাজা জয়পাল শীঘ্রই গজনী আক্রমণে প্রস্তুত। তাই যুদ্ধ সরঞ্জামকে বাইরে রাখা হয়েছে। সৈন্যদের বলা হয়েছে বাকী প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করতে। তাবুর বাইরে পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বটে তবে তেমন কঠোর নয়। রাজার সেনা ছাউনী কিংবা যুদ্ধ সরঞ্জামে হাত দেবে এমন দুঃসাহস কারো ছিল না। এসব ক্ষেত্রে চুরির ঘটনাও কখনো ঘটেনি। তাই অশ্বারোহী প্রহরীরা মনের আয়েশে তাবুর চারপাশে ঢিলেঢালা টহল দিচ্ছে। রাজার এবারের যুদ্ধযাত্রা নিয়ে বেশির ভাগ সময়ই তারা আড্ডায় মতে থাকছে। লাহোরের মুসলিমদের পক্ষ থেকে দুস্কৃতির আশঙ্কাও তেমন ছিল না জয়পালের। কেননা, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ লাহোরে নামমাত্র কিছু সংখ্যক মুসলমানের বসবাস থাকলেও তারা অনুন্নত এলাকায় দীনহীন জীবন যাপন করতো। রাজার সময়োজনের বিরুদ্ধে কোন দুষ্কৃতির সাহস তাদের মোটেও ছিল না।
অবশ্য রাজার জানা ছিল, তার এলাকায় গজনীর গোয়েন্দা রয়েছে কিন্তু এরা তার বিশাল সমরায়োজনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে ঘুর্ণাক্ষরেও রাজা তা ভাবতে পারেনি। তাই বিশাল সমরায়োজনের প্রতি যতটুকু সতর্ক নজরদারী : দরকার ছিল ততটুকু ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি জয়পাল।
