বিদ্রোহী, জাতিদ্রোহী, বিলাসী, ক্ষমতালি যে সব আমীর-উমারা মাহমূদের প্রতিরোধের মুখে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল এদের ঘরবাড়িতে ইহুদী-খৃষ্টান ও হিন্দু যুবতী, মদ-মাতলামী আর নৃত্যগীতের বিপুল উপকরণ পাওয়া গেল। বেরিয়ে আসে কুচক্রীদের অন্তরালের জীবন চিত্র আর সুলতানের বিরোধিতার প্রকৃত কারণ। সাধারণ সৈনিক ও জনতা জানতে পারে, এসব আমীর-উমারার সাথে মাহমুদের আদর্শিক ব্যবধান কত। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঐসব আমীরদের ঘনিষ্ঠজনেরা সুলতানকে জানায়, সুলতান-বিরোধী প্রত্যেক আমীরের সাথে ছিল হিন্দুস্তানের হিন্দু মহারাজার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ইহুদী ও খৃষ্টানরা দামী দামী উপঢৌকন আর সুন্দরী তরুণী পাঠাতো এদের হেরেমে। প্রত্যেক আমীরের বাড়িতে রাতে বসত নৃত্যগীত আর সুরা পানের আসর। ইহুদী সৃষ্ট হিন্দুস্তানের একটি কেরামতি গোষ্ঠীর প্রধান মুসলিম পরিচয়ে এদের কাছে সুন্দরী তরুণীদেরকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠাতো। দৃশ্যত এরা মুসলিম দাবী করলেও প্রকৃত পক্ষে এরা ছিল ইহুদীদের চর। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর আমলেও ইহুদী গোষ্ঠী বিভিন্ন মুসলিম ফেরকা সৃষ্টি করে ইহুদী-খৃষ্টান চক্রান্ত অব্যাহত রাখতে মুসলমানদের হেরেমে মেয়েদের পাঠাতে নির্যাতিতা ও আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে। প্রশিক্ষিত এই সব সুন্দরী গোয়েন্দা মেয়েদের রূপ-সৌন্দর্যের ফাঁদে অধিকাংশ ক্ষমতাবান লোক আটকা পড়ে যেত। তারা এদের জায়গা দিতো নিজেদের হেরেমে খাদেমা হিসেবে। নিজেদেরকে মালিকের কাছে মোহনীয় করে উপস্থাপন আর নিবেদিতা প্রমাণ করে এরাই প্রকারান্তরে খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হেরেমগুলোকে দুশমনদের দুর্গে পরিণত করতো। দেহবল্লরী আর যাদুময় নাটকীয়তায় এসব নারী শুধু আইয়ুবকেই নয়; যুগে যুগে মুসলিম খেলাফত ও শাসন ব্যবস্থায় যে কতো অপূরণীয় ক্ষতি করেছে তার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে পৃথিবীর মানুষ হতবাক হয়ে যাবে। মাহমূদের সময়েও মুসলিম শাসকদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে আমীর-উমারার ঘরে ঘরে তারা রমণীয় ফাঁদ বিছাতে সক্ষম হয়েছিল। বহুসংখ্যক আমীর শ্রেণীর লোক এদের পাতা ফাঁদে আত্মাহুতিও দিয়েছিল। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে মাহমুদকে অসংখ্যবার গৃহযুদ্ধ ও বিশৃংখলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সব সময় তাকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়েছে।
রাজা জয়পালের গোয়েন্দা তৎপরতা তেমন জোরদার ছিল না। যার ফলে সুবক্তগীনের মৃত্যু সংবাদ ছাড়া জয়পালের বর্তমান গজনী সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না। সুলতান যখন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যস্ত আর প্রতিবেশীদের আক্রমণ রোধে ব্যাপৃত এ সময় যদি জয়পাল গজনী আক্রমণ করে বসত তাহলে হয় তো সুলতানের বিরোধীরা জয়পালের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতো। তখন ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে সুলতানের পক্ষে গজনী দখলে রাখা হয়ত কঠিন হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ যে, জয়পাল ও সুলতান বিরোধী কারোরই প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ছিল না। এরা সুলতানের ক্ষমতা ও প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে মোটেও জ্ঞাত ছিল না। এদের কাছে কেউ সুলতানের দূরবস্থার কথা বলেওনি। এদের তেমন কোন গোয়েন্দা তৎপরতাও ছিল না, যাতে প্রতিপক্ষের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারে। পক্ষান্তরে জয়পালের প্রধান সামরিক কেন্দ্র লাহোরে সুলতানের গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
* * *
ইমরান দুই কয়েদী কাসেম ও নিজামকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে অন্যান্য দিনের মতো পর দিন সকাল বেলা নাশতা নিয়ে যথাসময়ে রাজ প্রাসাদে কয়েদীদের ঘরে হাজির হল। ঘরে বন্দীদের না দেখে সে ঘরের দরজার পাশে অপেক্ষা করতে লাগল। ইমরান রাজ প্রাসাদের কয়েক কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করল, কয়েদীরা কোথায় গেছে কেউ তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে পারল না। কিছুক্ষণ পর রাজার ফরমান এলো কয়েদীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইমরান রাজার ফরমানবাহীকে বলল, সকাল থেকে সে বন্দীদের জন্যে নাশতা নিয়ে বসে রয়েছে কিন্তু তাদেরকে সে দেখছে না। বন্দীরা ঘরে নেই।
“হু, মুসলমানদের বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। কয়েদীদের লাপাত্তা হওয়ার সংবাদ শুনে বলল রাজা। “ওদের কামরা থেকে পাহারা তুলে দেয়াই ছিল মারাত্মক ভুল। এরা শহরে থাকবে না। যাও! শহর থেকে বের হওয়ার সব পথে চেকপোষ্ট বসিয়ে ওদের খোঁজ কর। পেশোয়ারের দিকে অশ্বারোহী পাঠিয়ে ওদের ধরে আন।”
“দু’জন বন্দী পালিয়ে যাওয়ায় আমাদের এমন কি ক্ষতি হয়েছে যে, সব জরুরী কাজ ফেলে রেখে ওদের পিছনে দৌড়াতে হবে!” বলল এক উজীর। “এই মুহূর্তে অভিযান প্রস্তুতিতে আমাদের পুনঃ মনোযোগ দেয়া উচিত। দুজন ফেরারীকে ধরে আনতে বিপুল সংখ্যক লোককে এদিক ওদিক পাঠিয়ে অভিযান প্রস্তুতির কাজে বিঘ্ন ঘটানো ঠিক হবে কি?”
“ওদের ফেরার হওয়াতে আমার হারানোর কিছু নেই। ওদের কাছ থেকে যা পাওয়ার তা আমি পেয়ে গেছি। কিন্তু ওদের ফেরার হওয়ার শাস্তি ওদের দিতে চাই। তাই জলদি ওদের পাকড়াও-এর ব্যবস্থা কর।” পরক্ষণেই রাজাকে মন্দির থেকে সংবাদ দেয়া হল, বলীদানের জন্যে উপযুক্ত মেয়ে পাওয়া গেছে। আগামী পনের দিনের মধ্যেই মেয়েটিকে বলী দিয়ে ওর রক্ত রাজার মাথায় দেয়া হবে। এতে রাজার বিজয় নিশ্চিত হবে। এখন যে কোন দিন রাজা অভিযান শুরু করতে পারেন।
