মাহমূদ একদিন খবর পেলেন, বুখারার বাদশাহ খোরাসান অঞ্চল তওবুন বেগ নামের এক আমীরকে দান করে দিয়েছেন। খবর পেয়ে সুলতান মাহমুদ বুখারার বাদশাহকে পয়গাম পাঠালেন, আপনার সাথে আমাদের মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। এ অবস্থায় কি করে আপনি গজনী সালতানাতের অধীনস্ত অঞ্চল আমীর তওবুন বেগকে দান করতে পারলেন! এ খবর পাওয়ার পর আমরা মৈত্রী চুক্তি কিভাবে বহাল রাখতে পারি? খোরাসান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিন। যাতে আমাদের মৈত্রী অক্ষুণ্ণ থাকে। আপনি হয়তো জানেন, হিন্দুস্তানের পৌত্তলিক বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমতাবস্থায় মুসলিম মিল্লাতের স্বার্থেই আমাদের মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন অটুট রাখতে হবে।’
সুলতানের পয়গামের জবাবে বুখারা থেকে যে প্রতিক্রিয়া এল তাতে বোঝা গেল, তারা মাহমূদকে মোটেও গণ্য করে না। তারা লিখল, “বলখ, তিরমিজ ও হেরাত আপনার অধীনেই রয়েছে। আর বাকী অঞ্চলগুলো আমরা আমাদের আস্থাভাজন আমীরদের মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছি।”
সুলতান মাহমূদ এই অবজ্ঞাসূচক প্রতিউত্তরের পরও হাকীম আবুল হাসানকে বহুমূল্য উপটৌকনসহ বুখারার শাসকের কাছে পাঠালেন এবং লিখে জানালেন “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, যে দোস্তি ও সদ্ভাব আমাদের মধ্যে বংশ পরম্পরায় বিদ্যমান রয়েছে সেখান থেকে আমি এমন অপমানজনক প্রতিউত্তর পাব। আমার দুঃখ হচ্ছে, মিত্রতা ও প্রতিবেশীর সাথে সৌহার্দ্যভাব হয়তো অক্ষুণ্ণ রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না। আমাকে চুক্তি ভঙ্গে বাধ্য করা হচ্ছে।”
সুলতানের এই সমঝোতা চেষ্টা তো ব্যর্থ হলোই বরং দূত আবুল হাসানও আর ফিরে এলো না। কিছু দিন পর গোয়েন্দার মাধ্যমে সুলতানের কাছে খবর পৌঁছল, আবুল হাসানকে বুখারার উজীর করা হয়েছে। যার জন্যে কোন সংবাদ পাঠানোও প্রয়োজন মনে করেনি সে। সংবাদ পেয়েই সুলতান মাহমূদ তার নিরাপত্তা বাহিনীর চৌকস কমান্ডোকে বুখারার কেন্দ্রীয় শহর নিশাপুরের দিকে অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিলেন। ধারণার চেয়ে দ্রুত সুলতানের বাহিনী নিশাপুরের উপকণ্ঠে গিয়ে হাজির হল। নিশাপুরের আমীর তওবুন বেগের কাছে যখন সুলতানের বাহিনীর খবর পৌঁছল তখন সুলতানের সৈন্যরা নিশাপুরের সীমানার ঢুকে পড়েছে। তওবুন বেগ প্রতিরোধের সাহস না পেয়ে’ বুখারীয় পালিয়ে গিয়ে শাহ মনসুরকে খবর দিল। খবর পেয়ে শাহ মনসুর সুলতানের মোকাবেলায় ময়দানে সৈন্য সমাবেশ করল।
তওবুন বেগ ক্ষমতার স্বাদে বিভোর। সে ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা ও যন্ত্রণায় সুলতানের বিরুদ্ধে চক্রান্তে নেমে গেল। সে আর এক কুচক্রী আমীর ফায়েককে গিয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে যুদ্ধ সহায়তায় রাজী করাতে সক্ষম হল। আমীর ফায়েক সুবক্তগীনের জীবদ্দশায় বহু চক্রান্ত করেও টিকতে পারেনি। সে চক্রান্ত করে ব্যর্থ হয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। সেই জেদে আমীর ফায়েক সৈন্য-সামন্ত নিয়ে শাহ মনসুরের সহযোগী হল।
তওবুন চক্রান্তে ওস্তাদ। আমীর ফায়েককে সে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে শাহ মনসুরকে বন্দী করে তার অযোগ্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক ভাই আব্দুল মালেককে মসনদে বসিয়ে অন্তরালে নিজেরা ক্ষমতা ও দণ্ডমুণ্ডের মালিক হয়ে গেল। দৃশ্যত এরা, সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধাচারী ও পরস্পরে বন্ধু হলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্রই ছিল এদের চরিত্র।
মাহমূদ কৌশলে এদেরকে কঠিন একটা জায়গায় মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করলেন। মাহমূদের আতঙ্কে এদের কেউই যুদ্ধে মোকাবেলা করার সাহস পেল না। মাহমূদের ভয়ঙ্কর আক্রমণের ভয়ে তওবুন বেগ যে কোথায় পালিয়ে গেল আর পাত্তাই পাওয়া গেল না। আমীর ফায়েকও পালাতে গিয়ে আহত হয়ে সেই যে বিছানা নিল আর দাঁড়াতে পারল না। কিছুদিন পর ফায়েকের মৃত্যু সংবাদ পেলেন সুলতান।
কাশগরে তখন এলীখ খান ক্ষমতাসীন। সে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার চিন্তা না করেই সুবক্তগীনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে অবনতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বুখারায় আক্রমণ করে বসল। ক্ষমতাসীন বালক আব্দুল মালেককে হত্যা করল। আব্দুল মালেককে হত্যা করে এলীখ খানের কোনই লাভ হলো না। সুলতান মাহমুদের আতঙ্কে এলীখ খান বুখারায় অবস্থান করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দুঃসাহস পেল না। সুলতান মাহমূদের আক্রমণের ভয়ে সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সুলতান বলখ ও খোরাসানকে গজনীর অধীনে নিয়ে এলেন।
আব্দুল মালেক নিহত হওয়ায় বুখরায় সামান শাসনের ইতি ঘটল। সুলতান সুবক্তগীনের অবর্তমানে গজনী ও আশপাশের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর গৃহযুদ্ধ ও অবনতিশীল পরিস্থিতি এতই শোচনীয় হয়ে উঠেছিল যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা। মুশকিল। এই অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুলতান মাহমুদের উল্লেখযোগ্য লোকবল ও সমর সম্পদ ব্যয় করতে হয়। হিন্দুস্তানের রাজা-মহারাজাদের আক্রমণ প্রতিরোধে সুলতান যে সমর আয়োজন ও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এর বড় অংশই গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে লেগে যায়। গৃহযুদ্ধের বিষবাষ্প রোধ করতে মাহমূদ যে মুসলিম সৈন্য ও যোদ্ধাদের কাজে লাগিয়েছেন এরাই পৌত্তলিকদের আগ্রাসন ঠেকানোর প্রধান শক্তি। আত্মকলহ ও প্রাসাদ চক্রান্ত দমনে এই অপরিমেয় জীবন ও সম্পদ ক্ষয় করতে না হলে মাহমূদের বিজয় অভিযান এবং হিন্দুস্তানের পৌত্তলিক দুঃশাসকদের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো।
