তরুণী দুভাষীর দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি বাইরে চলে যান। দুভাষী সুলতানকে বললো, তরুণী আমাকে বাইরে চলে যেতে বলছে।
একথা শুনে সুলতান রাগত ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তরুণীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি যদি এখানে মরতে এসে থাকো, তাহলে এক্ষুণি আমি তোমার মৃত্যুর ব্যবস্থা করছি। তবে এই মৃত্যু তরবারীর আঘাতে হবে না, তোমার দু’পা দু’টি ঘোড়ার সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হবে আর ঘোড়াকে দুর্গ ফটকের দিকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। দুর্গ ফটক পর্যন্ত যাওয়ার আগেই তোমার দেহ দুভাগ হয়ে যাবে আর হাড় থেকে মাংস খসে খসে পড়বে।
একথা দুভাষীর মাধ্যমে শোনার পর তরুণী আতঙ্কিত হয়ে পড়লো এবং বললো, তাকে সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মহারাজার কাছে নিয়ে যায়, মহারাজা তাকে এই বৃদ্ধ ঋষির সাথে আসতে এবং তার নির্দেশ মেনে চলার হুকুম করেন। আমাকে বলা হয়েছে, তোমরা যদি গযনী সুলতানের তাঁবু পর্যন্ত যেতে পারো তাহলে ঋষি ঋষির কাজ করবে, তোমার কাজ হবে রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে নিজেকে সুলতানের জন্য মেলে ধরা । সুলতান যেহেতু পুরুষ তাই সে নিশ্চয়ই মদ ও নারীভোগ করে থাকে। সুলতানকে রূপের যাদুতে আটকে তার পানীয়ের মধ্যে আংটির টোপের ভেতরের বিষয় মিশিয়ে দেবে। তরুণীর ডান হাতের মধ্যমায় একটি স্বর্ণের দৃষ্টিনন্দন আংটি ছিলো। সে এটির টোপ খুলে দেখালো এর ভেতরে সামান্য তুলা আছে, যাতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিষ। এই বিষই সুলতানের পানীয়ের মধ্যে মেশানোর কথা ছিলো।
দুর্গের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে সে বললো, মন্দিরে এক দিকে চলছে নর্তকীদের নাচ ও আরাধনা আর অপর দিকে পুরোহিত পণ্ডিতেরা মন্দিরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নর্তকী ও সেবাদাসীদের নিয়ে তাদের সাথে পাশবিকতায় মেতে উঠেছে; আর বলছে, শিবদেব তোমাদের ইজ্জতের নজরানা চাইছেন। অধিবাসীদের সম্পর্কে তরুণী বললো, প্রতিটি নাগরিকই শহর ও মন্দির রক্ষার জন্যে তাদের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত কিন্তু দুঃসাহসী হলেও তাদের মধ্যে এখন আতঙ্কও বিরাজ করছে।
আমি এই মন্দিরের সবচেয়ে দামী সেবিকা। আমাকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। দেখতেও আমি সবচেয়ে সুন্দরী। সাধারণ হিন্দুরা এই মন্দির, পণ্ডিত ও আমাকে অতি পবিত্র জ্ঞান করে। কিন্তু আমি জানি এই মন্দির, সেবাদাসী ও পুরোহিত পণ্ডিতেরা কতোটা পবিত্র। আমার কোন রীতি ধর্ম নেই। আপনি আমাকে যৌনদাসীরূপে গ্রহণ করুন। এ মুহূর্তে আপনার কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা ও নিবেদন। আমি জীবন দিয়ে আপনার সেবা করবো কারণ প্রভুর সেবা ও মনোরঞ্জন আমার ধর্ম । আমার আর কোন ধর্ম নেই।
সুলতান মাহমূদ তরুণীর সাথে কথা আর দীর্ঘ না করে বৃদ্ধ ঋষিকে তাঁবুর ভেতরে ডেকে এনে বললেন, আমি বিগত পঁচিত বছর ধরে হিন্দুস্তানে আসা যাওয়া করছি। তুমি কি বুঝতে পারোনি, আমি হিন্দুস্তানের যোগী সন্ন্যাসীদের যাদুটোনা ও যোগসাধনা সম্পর্কে অনবহিত নই। আমি তোমাদের মতো মাটির নিষ্প্রাণ মূর্তির পূজারী নই ঋষি! আমি একটি পবিত্র ধর্মের অনুসারী। আমরা ধর্ম ও রাজত্ব রক্ষার্থে আমাদের মা বোনদের ইজ্জতের সওদা করি না বরং যে কোন নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে আমরা জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না। আমরা তোমাদের মতো আমাদের তরুণীদের উলঙ্গ করে নাচাই না এবং শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে মা-বোনদের শত্রু শিবিরে প্রেরণ করি না।
কার ধর্ম সত্য আর কোন ধর্ম অসত্য আমি এখানে এই নিয়ে বিতর্ক করতে আসিনি সুলতান! দৃঢ়কণ্ঠে বললো ঋষি। আমাদের মেয়েরা ধর্মের জন্য নিজেদের জীবন ও ইজ্জত কুরবান করে দেয় এটা আমাদের ধর্মের শিক্ষা। আপনার চেয়ে আমার বয়স ঢের বেশী সুলতান। আপনি আপনার সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখুন না, তারা প্রত্যেকেই কি আপনার মতোই ঈমানদার? আপনি কি তাদের ঈমান রক্ষার জন্য সব সময় তাদের পাশে থাকবেন?
আপনার অবর্তমানে ঠিকই আমাদের তরুণীরা আপনার সেনাদের ঈমান তাদের রূপ জৌলুসে কিনে নেবে।
আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছিলাম, আমার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। তাই জীবনের শেষ লগ্নে আপনাকে কিছু সত্য কথা বলে দিচ্ছি। আপনি একদিন থাকবেন না, কিন্তু আমাদের তরুণীরা থাকবে, তারা ঠিকই ইজ্জতের বিনিময়ে আপনার লোকদের দাসে পরিণত করবে। কারণ তাদেরকে আমরাই এ শিক্ষা দিয়ে থাকি। আপনি আমাকে হত্যা করে ফেলুন, এই তরুণীকেও মেরে ফেলুন বা আপনার যৌনদাসী রূপে রেখে দিন। একথা বাস্তব, হিন্দুরা ভারত মাতার কোলে ইসলামের উত্থান ঠেকাতে যা যা করণীয় এর সবকিছুই করবে। এক সময় ঠিকই ভারতের সীমানা থেকে ইসলাম বিতাড়িত হবে।
সুলতান মাহমূদ বৃদ্ধ ঋষির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তার মধ্যে না ছিলো ক্ষোভের লক্ষণ না ছিলো উদ্বেগ। তিনি স্মিত হাসছিলেন। বৃদ্ধ ঋষি বললো, মৃত্যুর আগে আমি আপনাকে মহারাজা রায়কুমারের একটি প্রস্তাব পেশ করছি। মহারাজা রায়কুমার বলেছেন, আপনার যতো ধন দৌলত সোনা দানা ও এমন সুন্দরী দরকার সবই আপনার তাঁবুতে পৌঁছে দেয়া হবে যদি আপনি যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে ফিরে যান। আমি আপনাকে এই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছি, আপনার ফিরে যাওয়ার পথে আমাদের কোন সেনা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। যদি আমার প্রস্তাব আপনার মনোপুত না হয় তবে আমি আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে আরো তিন মহারাজার সৈন্যসামন্ত এখানে এসে পৌঁছে যাবে, তারা আপনাদের উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবে, তখন হিন্দু সমরশক্তি ও সোমনাথের মাঝখানে আপনি দু’দিকের আক্রমণে ফেঁসে যাবেন। তখন হয়তো আপনার বাহিনীর কি পরিণতি হয়েছিলো এ খবরটি গযনীবাসীকে জানানোর জন্যেও আপনার কোন সেনা জীবন নিয়ে পালাতে পারবে না ।
