চুপ কর! হিন্দুস্তানের কুত্তা…! ভাবভঙ্গিতে ঋষির কথা অনুধাবন করে গর্জে উঠলো এক প্রহরী এবং সে উত্তেজিত হয়ে তরবারী বের করে ফেললো।
সুলতান মাহমুদ হাতের ইশারায় প্রহরীকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, ‘আরে! একি করছো তুমি! এই বৃদ্ধ আমাদের বন্দী নয়, মেহমান। সে রাজার দূত হয়ে এসেছে।
সুলতান ঋষিকে বললেন, মাফ করবেন জনাব, আমার এই সৈনিক আপনার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে, এজন্য আমি আপনার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি ।
আমাদের কোন মহারাজার সামনে যদি এমন গোস্তাখী করা হতো, তাহলে এমন ঔদ্ধত্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হতো। বললো বৃদ্ধ ঋষি।
‘আমরা এ মুহূর্তে আমাদের মহান প্রভু আল্লাহর দরবারে রয়েছি, বললেন সুলতান। এখানে কেউ কারো প্রভু কিংবা প্রজা নয়। তাই কেউ কাউকে হত্যা করার অধিকার রাখে না। এই সৈন্যরা আমার নির্দেশে এখানে আসেনি, আল্লাহর নির্দেশে এসেছে। আমাকে শুধু এদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি তাদের আবেগ, ক্ষোভ ও উল্লাসকে শিকল বন্দী করতে পারি না।
একথা বলতে বলতে সুলতান দাঁড়িয়ে এক প্রহরীকে বললেন, এই বৃদ্ধ ও তার সঙ্গী তরুণীকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছে দিয়ে আস। যাওয়ার সময় সুলতান ঋষির উদ্দেশ্যে বললেন, রাজাকে গিয়ে বলবেন, সোমনাথকে একটি নষ্ট নর্তকী আর এক বুড়ো যোগী ও কিছু সোনাদানার বিনিময়ে রক্ষা করা যাবে না । আমরা এখান থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে আসিনি। ঋষি বাবু, আপনার এই নষ্টা মেয়েটিকে নিয়ে যান।
বৃদ্ধ ঋষি দীর্ঘক্ষণ এক পলকে সুলতানের দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ সে সামনে অগ্রসর হয়ে সুলতানের ডান হাত ধরে চুমু খেয়ে বললো- আমি দিব্যি সুলতানের বিজয় দেখতে পাচ্ছি। একথা শেষ করেই সে দ্রুত মেয়েটিকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল।
* * *
সোমনাথের বিজয়ের ঘটনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করলে হাজার পৃষ্ঠা লেগে যাবে। হিন্দুরা জীবন সম্পদ করার পাশাপাশি চক্রান্তমূলক বহু অপচেষ্টা করেছে গযনী বাহিনীর সেনাদের বিভ্রান্ত করতে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এ যুদ্ধে গযনী সেনারা যে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা ইতিহাসে বিরল। এছাড়া সুলতান মাহমূদের সোমনাথ অভিযানের তুলনা ইসলামের ইতিহাসের দু’একটির সাথে তুলনা করা চলে। মহাভারতের ইতিহাসে এটি ছিলো একটি অতুলনীয় স্মরণীয় যুদ্ধ। কিন্তু হিন্দু-ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধকে গুরুত্বহীন করতে খুব কাটছাট করে তা বর্ণনা করেছেন।
যে রাত সুলতানের কাছে বৃদ্ধ ঋষি এসেছিলো, সুলতান মাহমূদের জীবনে সেই রাতটি ছিলো একটি স্মরণীয় রাত। তার কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছিলো, ইতোমধ্যে দুই হিন্দু মহারাজার সৈন্য মুসলিম বাহিনীকে ঘেরাও করার জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। সুলতান সারারাত তার কমান্ডার ও সেনাদেরকে দুর্গ প্রাচীরে কার্যকর হামলার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
সুলতান বাইরের আক্রমণ আশঙ্কায় আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু তিনি অবাক হলেন, এই দুইটি বাহিনী এতোটা নীরবে কি করে এতোটা কাছে পৌঁছে গেলো!
সুলতান তার দূরদর্শিতায় হিন্দুদের আক্রমণ কৌশল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈকে বললেন, এখন হামলা করবেন না, আমদের পেছন দিক থেকে যখন আক্রমণ হবে তখন ভেতরের সৈন্যরা ফটক খুলে বেরিয়ে এসে আমাদের উপর আক্রমণ করবে, আপনি দু’বাহুকে যথাসম্ভব ছড়িয়ে দিন। ফটক খুলে যেতেই ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে।
পিছন দিক থেকে আসা দু’মহারাজার সেনাদের মধ্যে এক দলের নেতৃত্বে ছিলেন মহারাজা পরমদেব। কোন কোন ঐতিহাসিক তার নাম ভ্রম্মদেব লিখেছেন আর অপরজন ছিলেন দেবআশ্রম।
পিছন দিকের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে যে সেনা ইউনিট সুলতান মাহমূদ নিয়োগ করেছিলেন, তার নেতৃত্বে ছিলেন সেনাপতি আবুল হাসান। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে সুলতান তাদের কাছে পৌঁছলেন। তখন অবস্থা খুব সঙ্গীন। সুলতান সেনাপতিকে বললেন, মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে দুই বাহু দিয়ে আক্রমণ করো। সুলতান একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন উভয় দিকে সৈন্যরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে গেছে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে অশ্বারোহী সৈন্যের ঘোড়া। গযনী সেনাদের নারায়ে তাকবীরে জমিন কাঁপছে।
এদিকে হামলা হতেই সোমনাথ দুর্গের প্রধান ফটক খুলে গেলো। বহু সংখ্যক সেনা দুর্গ থেকে বের হয়ে অবরোধকারীদের উপর একসাথে হামলে পড়লো। এবার হিন্দুরা নয় গযনী সেনারা ঘেরাও হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সুলতানের চেহারা মলিন হয়ে গেল। কারণ উভয় রাজার সৈন্যরা তাদের বাহুতে আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। দ্রুতই তারা কৌশল বদল করে নিতে সক্ষম হলো।
অবস্থা এমন হলো যে, এটাকে কোন গতানুগতিক যুদ্ধ বলার অবকাশ ছিলো না। রীতিমতো একটা ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ। উভয় দিকের সৈন্যরাই হতাহত হচ্ছিল। জীবন দিতে আর জীবন নিতেই যেনো উভয় সেনাদল মরিয়া হয়ে পড়লো। অবশ্য প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ এমন অবস্থাতেও সাফল্যের সাথেই দুর্গ থেকে আসা হিন্দুসেনাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করছিলেন। এভাবে চলে গেলো দিনের অর্ধেক। সুলতান দেখলেন তার কোন চালই আশানুরূপ ফলপ্রসূ হচ্ছে না। দৃশ্যত গযনী বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে। কারণ হিন্দু সেনারা একেতো তাজাদম তদুপরি তারা নিত্য নতুন সৈন্য দিয়ে ঘাটতি পূরণ করে নিচ্ছে।
