প্রহরী ঋষির নির্দেশ বুঝতে পেরে সুলতানের দিকে তাকালো। কারণ সুলতানের নির্দেশ ছাড়া তার পক্ষে কিছু করার অবকাশ ছিলো না। সুলতান চোখের ইশারায় বললেন, ঋষি যা বলছে করো।
প্রহরী তরবারী কোষমুক্ত করে পূর্ণশক্তিতে আঘাত করলো। কিন্তু কিছুই কাটলো না। তরবারীর আঘাতে শুধু কাপড়টি গিয়ে তরবারী সাথে মাটিতে ঠেকলো। অবাক করার মতো তরুণীর দেহাবয়বের কোন অস্তিত্ব চাদরের ভেতরে ছিলো না।
এই অবস্থা দেখে বিস্ময়ে প্রহরীর চোখমুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো। কিন্তু সুলতান তা দেখে মুচকি হাসলেন।
এখানে কোন দেহ ছিলো না। বললো ঋষি। এটি ছিলো আত্ম। তরবারী দিয়ে আপনি দেহ কাটতে পারেন কিন্তু আত্মা দেহাতীত, আত্মাকে কাটা যায় না। মহামান্য সুলতান! আপনি যদি চান তাহলে অল্প সময়ের জন্যে আমি আপনাকেও আত্মার জগতে পাঠিয়ে দিতে পারি, যেখান থেকে এই তরুণীর রূহ এসেছে।
ঐতিহাসিক ইবনুল জাওযী ও ইবনে যফির তৎকালীন দু’জন ঐতিহাসিকের বর্ণনা উল্লেখ করে লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ একবার তার আধ্যাত্মিক গুরু শায়খ আবুল হাসান কিরখানীর দরবারে উপস্থিত। শায়খ তাকে বললেন, হিন্দুস্তান যাদুগীর ও সাধু সন্ন্যাসীদের স্বর্গভূমি। এমন যেনো না হয় যে, আপনার যেসব সেনাপতি ও কর্মকর্তা হিন্দুস্তানের বিজিত এলাকায় বসবাস করে তারা যাদুগীর ও সাধু সন্ন্যাসীদের হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। হিন্দুরাও ইহুদী খ্রিস্টানদের মতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সুন্দরী ললনাদের ব্যবহার করে। মাকড়সা যেমন মশা মাছিকে তার জালের ফাঁদে আটকে হত্যা করে হিন্দুরাও সুন্দরী রূপসীদের ফাঁদে ফেলে মুসলিম ক্ষমতাবানদের নিঃশেষ করে ফেলে।
সুলতান মাহমূদ নিজেও ছিলেন তীক্ষ্ণধী আলেম। আলেমদের সাথে ছিলো তার গভীর সখ্য ও হৃদ্যতা। তিনি নিজেও হিন্দুস্তান সম্পর্কে গভীর পড়শোনা করেছেন। তাছাড়া অসংখ্য যুদ্ধে হিন্দুস্তানের বহু শিক্ষিত লোককে যুদ্ধবন্দী করে তিনি গযনী নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকেও প্রচুর তথ্য তিনি আত্মস্থ করেন। হিন্দুস্তানীদের অনেক যাদুটোনার ক্ষমতা ও যোগীদের সাধনার ফলাফল দেখে তিনি বিস্ময়াভিভূত হতেন। বিশ্বাস করাই কঠিন হতো কোন মানুষ এতোটা ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে! তিনি হিন্দুস্তানী যোগীদের সাধনার এমন ঘটনাও শুনেছেন, কোন কোন যোগী নাকি আধা ঘন্টা পর্যন্ত নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়ে সারা শরীরের রক্তপ্রবাহ ও হৃদকম্পন স্তব্ধ করে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় পরে আবার দেহে প্রাণ ও হৃদকম্পন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। যোগবাদ প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সাধনা। যোগীরা যোগবাদ দিয়ে অসুস্থ মানুষকে যেমন সুস্থ করতে পারে আবার সুস্থ লোককেও অসুস্থ বানিয়ে ফেলতে পারে ।
ঋষি তরুণীকে দৃশ্যত গায়েব করে দিয়ে সুলতানকেও কিছুক্ষণের জন্য আত্মার জগতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তার দিকে অগ্রসর হলো। সুলতান মুচকি হেসে হাতের ইশারায় তাকে থামতে বললেন। ঋষি তাতেও না দমলে এক প্রহরী ঋষিকে ধরে থামিয়ে দিল। এ সময় দুভাষী ঋষিকে বললো, সুলতানের ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ শোভনীয় নয়।
সুলতান দু’ভাষীর উদ্দেশ্যে বললেন, ঋষিকে বলে দাও, সে তো সামান্য সময়ের জন্য আমাকে রূহের জগতে পাঠাতে পারে কিন্তু আমি সব সময়েই রূহের জগতে বিচরণ করতে পারি। আর এই তরবারী দিয়ে যদি আমি ঋষির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি তবে ঠিকই তরুণীর দেহ দৃশ্যমান হয়ে যাবে। তাকে বলে দাও, এক্ষুণি যেন তরুণীকে দৃশ্যমান করে। আমি এখানে যোগীদের খেলা দেখতে আসিনি।
এরপর বৃদ্ধ ঋষি তরুণীর উড়নাটি দু’হাতে নিয়ে একটি ঝাড়া দিয়ে দু’হাত প্রসারিত করলে চাদরটি দীর্ঘায়িত হলো আর তরুণী এর আড়াল থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। তরুণীর চোখে মুখে আবেশমাখা। সুলতান ঋষিকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে যেতে প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন। প্রহরীরা ঋষিকে ধরে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলো।
ঋষিকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর সুলতান দুভাষীর মাধ্যমে তরুণীকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বুড়ো কেন তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছে, তা পরিষ্কার বলে দাও। যদি না বলল, তাহলে তোমাকে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।
তরুণী একথা শুনে দীর্ঘ সময় সুলতানকে পর্যবেক্ষণ করলো এবং কিছুটা বিস্ময় ও আতঙ্কভাব তার চেহারায় ফুটে উঠলো। অতঃপর বললো–
আমাকে বলা হয়েছে, আপনি মুসলমানদের বাদশা…। আপনি কেমন বাদশা? আমাকে হাতে পেয়েও আপনি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন; অথচ আমি এমন এক তরুণী যাকে হাত ছাড়া করতে চায় না কোন রাজা মহারাজা। আপনি জানেন না, আমি রাজা মহারাজাদের কাছে কি মূল্যবান রত্ন?
দেখো, আমি যে জন্যে সোমনাথ আক্রমণ করেছি এ সম্পর্কে আমি মোটেও অসতর্ক নই। আমি জানি আমার মিশন কিভাবে সফল করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কি কি বাধা বিপত্তি আসতে পারে। তরুণীর উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান।
আমি তোমার কাছে জানতে চাচ্ছি, এই বুড়োকে কি পাঠানো হয়েছে, না সে নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছে? তোমার রূপ সৌন্দর্য আর তোমার রূপের কূটনীতিতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। হিন্দু রাজাদের মতো আমরা মদ নারীতে আসক্ত নই। আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না। তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, তাহলে তোমাকে সসম্মানে ফেরত পাঠানো হবে।
