এ রাতেও গযনী বাহিনীর কোন সদস্য ঘুমাতে পারেনি। সারারাত তারা রণপ্রস্তুতিতে কাটিয়েছে।
* * *
সেনা কর্মকর্তাদের বিদায় করার পর সুলতানকে জানানো হলো, এক বৃদ্ধ ঋষি এক তরুণীকে নিয়ে এসেছে। সে সুলতানের সাথে সাক্ষাত করতে চায়। ঋষি জানিয়েছে, তারা সোমনাথ মন্দির থেকে এসেছে।
সুলতান তাদেরকে ডাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন, এরা মহারাজা রায়কুমারের কাছ থেকে কোন পয়গাম নিয়ে আসতে পারে, হয়তো যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব নিয়ে এরা আসতে পারে নয়তো কোন হুমকি ধমকি কিংবা চক্রান্তের বীজও এদের আগমনে থাকতে পারে। কাজেই এদের কাছ থেকে তা জানার জন্যেই সাক্ষাত হওয়া দরকার। ঋষি ও তার সঙ্গীনীকে সুলতানের সামনে পেশ করার আগেই তাদের দেহ তল্লাশী করা হয়েছে।
বৃদ্ধ ঋষির গায়ে ছিলো আজানু লম্বিত চৌগা। তার চুল মেয়েদের ন্যায় দীর্ঘ, দাড়ি ও গোঁফ ছিল লম্বা। সে ছিলো যথার্থই বয়স্ক, তার চুলদাড়ি শ্বেত শুভ্র। কিন্তু ঋষির চেহারায় ছিলো আভিজাত্যের ছাপ ও দীপ্তি। সাধারণত হিন্দুদের চেহারা এমন দীপ্তিময় হয় না।
সুলতান মাহমূদ ঋষির চেহারা ছবি দেখে মুগ্ধ হলেন। ঋষির সঙ্গী তরুণী ছিলো আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা। এক পর্যায়ে বৃদ্ধ ঋষি তরুণীর চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। সুলতান মাহমূদ তরুণীকে এক পলক দেখলেন, তার মনে হলো, এমন সুন্দরী তরুণী দ্বিতীয়টি তিনি কখনো দেখেননি। সুলতানের দৃষ্টি অনুপম সুন্দরীর প্রতি হঠাৎ যেনো থমকে গেলো। চকিতে তরুণীর চেহারা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বৃদ্ধ ঋষিকে সুলতান জিজ্ঞেস করলেন- “আপনি কেনো এসেছেন? আপনাকে কি মহারাজা পাঠিয়েছেন? স্থানীয় একজন মুসলমান দুভাষীর মাধ্যমে ঋষির সাথে কথা বলছিলেন সুলতান।
আমি মহারাজার কাছ থেকে কোন পয়গাম নিয়ে আসিনি। দৃঢ়তার সাথে বললো বৃদ্ধ ঋষি। বৃদ্ধের কথার মধ্যে ভাবগাম্ভীর্য ও তীব্র সম্মোহনী শক্তি রয়েছে তা লক্ষ্য করলেন সুলতান। সুলতান তার প্রথম বাক্য থেকেই বুঝতে পারলেন, এই ঋষি কোন সাধারণ মানুষ নয়।
আমি মহারাজার পয়গাম নিয়ে আসিনি বটে তবে তার অনুমতি নিয়েই এসেছি। মহারাজাই চারজন অশ্বারোহী সহ আমাকে দুর্গ থেকে বের করে পথ বলে দিয়েছেন। অবশ্য আমি নিজের পক্ষ থেকে আপনার পরবারে একটি পয়গাম নিয়ে এসেছি। আমি সোমনাথ মন্দিরের পণ্ডিত নই। আমি প্রতি বছর পনেরো বিশ দিনের জন্যে এখানে আসি। আমার মূল ঠিকানা হিমালয়ের পাদদেশে। সেখানে সারাবছর বরফ জমে থাকে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো আমি যখন এখানে এসেছি ঠিক এর দুদিন পরই আপনি এখানে এসেছেন, বললো ঋষি।
বিগত কয়েক দিনে আপনি দেখেছেন, সোমনাথ দুর্গের অধিবাসীরা কি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আছে। এ কয়দিনে হওয়া আপনার ক্ষয়ক্ষতির দিকে একটু দৃষ্টি দিন। কত যোদ্ধাকে আপনার হারাতে হয়েছে। আসলে আপনার এই ক্ষয়ক্ষতির কারণ সোমনাথবাসীর ক্ষোভ ও জিঘাংসা নয় প্রকৃত পক্ষে সোমনাথ মন্দিরের মহাদেব-এর ক্ষোভই মানুষের রূপ ধারণ করে আপনার সেনাদের উপর আপতিত হয়েছে। যে দেবতার পা সাগরে আর মাথা আসমানে অধম সেই মহাদেব এর একজন খাস পূজারী।
আপনি কি আপনাদের দেবতা সম্পর্কে আমাকে ভয় দেখাতে এসেছেন? আর এই তরুণীকে কি আপনাদের রীতি অনুযায়ী উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে এসেছেন? মুচকি হেসে বললেন সুলতান।
নিজে নিজেকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলবেন না সুলতান। আমি আপনাকে ভয় দেখাতে আসিনি এবং কোন উপঢৌকন দিতেও আসিনি। আমি এসেছি আপনার উপকার করতে, আপনাকে মুক্তি দিতে। এ জন্য আমি একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
শিবদেব এর শক্তি সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত নন। শিবদেব তার শক্তির সামান্য আমাকে দান করেছেন। আমার অর্জিত সামান্যটুকু এতোটাই নগণ্য যেমন সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানি কিংবা মরুভূমির একটি বালুর কণা। আপনি যদি চান তবে আমি এই কণা পরিমাণ অর্জিত শক্তির দাপট দেখাতে পারি। তা দেখলে আপনি শিবদেব-এর মহাশক্তির পরিমাণ আন্দাজ করতে পারবেন ।
আর এই তরুণী? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
এই তরুণী জীবিত নয় মৃত। এটি একটি মৃত আত্মার খাঁচা মাত্র। আপনাকে হয়তো কেউ এখনো জানায়নি, যারা মারা যায় তাদের সবার আত্মা সোমনাথে চলে আসে। এই আত্মাটি অনেক দূর থেকে এসেছিল। আমি এটিকে এখানে নিয়ে এসেছি। আপনি যদি বিশ্বাস না করেন, তবে আমি এটিকে বাতাসে ঝুলিয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে পারি।
একথা বলেই ঋষি তরুণীর মাথা তার হাতের তালুতে নিয়ে তরুণীর চোখে চোখ রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বললো। এর সাথে সাথেই তরুণীর মাথা দুলতে লাগলো। এরপর ঋষি তরুণীকে পাজাকোলা করে উঁচিয়ে ধরে বললো, তুমি এখন পালঙ্কের উপর শুয়ে আছে। দু’পা ও মাথা সোজা করে শুয়ে পড়ো। তরুণীর দু’পা এমন ভাবে সোজা হয়ে গেলো যেন সে পালঙ্কের উপর শুয়ে আছে। এ পর্যায়ে ঋষি তার দু’হাত তরুণীর দেহের নিচ থেকে সরিয়ে ফেললো। বিস্ময়কর ভাবে তরুণী শূন্যে ভাসতে লাগলো। ঋনি। এবার তরুণীর উড়না দিয়ে তাকে আপাদমস্তক ঢেকে দিলো।
সুলতান মাহমুদের দুই প্রহরী তাঁবুর দরজার ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলো। ঋষি তাদের একজনকে হাতের ইশারায় নির্দেশ দিলো, তরবারী বের করে তরুণীর পেটে এমনভাবে আঘাত করো যাতে মেয়েটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়।
