এর ফলে যেসব হিন্দু সেনা দুর্গের বাইরে এসে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলো তারা স্বগোত্রীয় তীরন্দাজদের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো।
এদিকে সুলতান মাহমূদ তখনো বেপরোয়া ভাবে সামনের শত্রুসেনাদের কচুকাটা করতে ব্যস্ত। তার যেন আর কিছুর খবর নেই। প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ মুহূর্তের জন্যেও সুলতানের উপর থেকে দৃষ্টি সরাননি। তিনি সুলতানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। সুলতান মাহমূদকে দৃশ্যত আবেগতাড়িত মনে হলেও তিনি মোটেও অসচেতন ছিলেন না, তীব্র লড়াইরত অবস্থায়ও তিনি এমনভাবে তার যোদ্ধাদের পরিচালনা করলেন যে, শত্রুসেনারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো।
আবু আব্দুল্লাহ যখন দেখলেন, হিন্দুসেনারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। তখন তিনি একটি অশ্বারোহী ইউনিটকে দুর্গপ্রাচীরের দিক থেকে আক্রমণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দ্বিমুখী উপর্যুপরি আক্রমণে হিন্দুসেনারা হতোদ্যম হয়ে পড়লো। এতোক্ষণ তারা মুসলমানদের বিপর্যস্ত করে রেখেছিলো কিন্তু এখন গযনী সেনাদের হাতে কচুকাটা হতে লাগলো।
এদের মধ্যে যারা ঘেরাও ডিঙ্গাতে পেরেছিলো তারা দুর্গ ফটকের দিকে অগ্রসর হতে চাচ্ছিলো কিন্তু মহারাজা রায়কুমার এতোটা বোকা ছিলেন না যে, গুটিকয়েক সেনার জীবন বাঁচাতে তিনি ফটক খুলে দেয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি নেবেন। কারণ তিনি দুর্গ প্রাচীরের উপরে সুরক্ষিত বুরুজে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এ মুহূর্তে প্রধান ফটক খুলে দিলে প্রাবনের পানির মতো গযনী সেনারা দুর্গে প্রবেশ করবে, তাদেরকে কোন অবস্থাতেই ঠেকানো যাবে না। তিনি বের হয়ে যাওয়া সেনাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। যেসব হিন্দু সেনা এই অভিযানে শরীক হয়েছিলো তাদের কারো পক্ষেই আর দুর্গে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলো না এবং জীবন নিয়েও পালিয়ে যাওয়ার অবকাশ পেলো না কেউ। সবাইকে গযনী বাহিনীর হাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো।
সুলতান মাহমূদ কখনো নির্বিচারে হত্যার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বিজয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছাড়া কোন শত্রু সেনাকে হত্যা করতেন না। কিন্তু এদিন হিন্দুদের কাবু করার সাথে সাথে প্রধান সেনাপতি সকল কমান্ডারের কানে এ খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন, আমাদের কোন যুদ্ধবন্দীর দরকার নেই, সবাইকে হত্যা করে ফেলো। শত্রুদের যেখানে যে অবস্থায়ই পাও নিঃশেষ করে ফেলো।
কারণ এই পর্যায়ে গোটা যুদ্ধের অবস্থাই বদলে গিয়েছিলো। মরো এবং মাররা এটাই হয়ে উঠেছিলো উভয় পক্ষের অঘোষিত লক্ষ্য। এমতাবস্থায় যুদ্ধবন্দীদের সামলানোর ব্যাপার একটি বাড়তি ঝামেলা হয়ে পড়তো। তখন শক্রসেনাদের বন্দী করার চেয়ে তাদের তরতাজা ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্র বেশী প্রয়োজনীয় বস্তু হয়ে উঠেছিলো। গযনী বাহিনী শত্রুসেনাদের পরাস্ত করে তাদের তাজাম ঘোড়া ও অস্ত্রগুলো কজা করলো। যুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন কোথাও শত্রু সেনাদের কাউকে আর দেখা গেলো না।
* * *
দিন শেষে রাতের বেলায় সুলতান মাহমূদ সকল সেনা কর্মকর্তা, কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডারদের সমবেত করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি এর আগের কোন যুদ্ধে হিন্দুদেরকে এমন দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখেছেন?
এদের আবেগ ও উন্মাদনা দেখেই বুঝা যায় সোমনাথ মন্দিরকে এরা কতোটা পবিত্র জ্ঞান করে। আমি আপনাদের সবাইকে একথা বলতে ডেকেছি, আপনারা নিজ নিজ ইউনিটের সেনাদের বলবেন, তোমরা হিন্দুসেনাদের আবেগ উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা দেখা এবং তা নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করো।
আমি সেইসব সেনাদের মোবারকবাদ জানাচ্ছি, যারা আজ নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগী ও অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে শত্রুসেনাদের কাবু করেছিলো। আল্লাহ তাআলা তাদের এই সাহসী ভূমিকার যথার্থ প্রতিদান দেবেন। আমি চাই সেনাদের এই আবেগ ও উচ্ছ্বাসে যেন কোনরূপ ভাটা না পড়ে। আমি বলতে পারবো না, আগামীকাল কি ঘটবে, তাও বলতে পারবো না, যুদ্ধের পরিণতি কি হবে! তবে আমি আমার সেনাদের কাছে পয়গাম পৌঁছে দিতে চাই, আমরা যদি এ যুদ্ধে পরাজিত হই, তাহলে ভবিষ্যতের লোকেরা বলবে, হিন্দুদের দেবদেবীরাই সত্য, মানুষের জীবনমৃত্যু তাদেরই হাতে। ইসলাম আসলেই কোন সত্য ধর্ম নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদেরকে লুটেরা ও খুনী সন্ত্রাসী বলবে। আমাদেরকে জীবন দিয়ে হলেও ইসলামের সততা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই যুদ্ধকে আপনারা অন্য দশটি যুদ্ধের মতো মনে করবেন না। আগামী দিন হয়তো বিগত দিনের চেয়ে আরো রক্তক্ষয়ী হবে এবং আরো বেশী ধৈর্য ও সাহসের পরীক্ষা দিতে হবে। আপনাদেরকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে। এমন ইতিহাসের জন্ম দিতে হবে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ যখনই গযনী বাহিনীর আলোচনা করবে সাথে সাথে আসবে সোমনাথের নাম। মানুষ বলতে বাধ্য হবে, গযনীর সিংহশাবকেরা সোমনাথের পাথরের মূর্তিগুলোকে তাদের পায়ে পড়তে বাধ্য করেছিলো।
এরপর সুলতান সেনাকর্মকর্তাদেরকে যুদ্ধ সম্পর্কে জরুরি দিক-নির্দেশনা দিয়ে বললেন- আমাদেরকে অতি দ্রুত এই যুদ্ধের ইতি টানতে হবে, কারণ আমাদের লোকবল ও রসদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। লোকবল ও রসদের ঘাটতি পূরণ করার মতো কোন ব্যবস্থা আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ যথেষ্ট দূরদর্শী ও সাহসী। অবশ্য তারা আমাদের উপর আক্রমণ না করে যদি আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিতো আর অবরোধ প্রলম্বিত করতে বাধ্য করতো, তাহলে তাদের কোন জনবলই হারাতে হতো না, এক সময় রসদসামগ্রী নিঃশেষ হয়ে আমাদেরকে অভুক্ত থেকেই মরতে হতো। শত্রু বাহিনী এই কৌশলের আশ্রয় নেয়ার আগেই আমাদেরকে শহরে প্রবেশ করতে হবে। তবে আমরা আহত ক্ষুধার্ত বিড়ালের মতো নয় সিংহের মতো শহরে প্রবেশ করতে চাই।
