গযনীর একটি প্রহরী দল হিন্দু সেনাদেরকে মূল শিবিরে আঘাত হানার আগেই পথরোধ করে দাঁড়ালো। আর এদিকে হিন্দুদের উপর ডান ও বাম দিক থেকে প্রচণ্ড আঘাত হানা হলো। কিন্তু হিন্দুরা ছিলো মরিয়া। তারা মরণত্যাগী হয়ে লড়তে শুরু করলো ফলে তাদের পরাস্ত করতে মুসলিম সেনাদেরকেও ঘাম ঝরাতে হলো। অবশেষে কিছু হিন্দু সেনা ঘেরাও ডিঙিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হলো, আর তাদের জন্য পুনরায় খুলে গেলো দুর্গফটক। তারা ভেতরে চলে গেলো। কিছু সংখ্যক মুসলিম যোদ্ধা পলায়নপর হিন্দুদের পিছু ধাওয়া করলে সুলতান তাদের নিষেধ করলেন। কারণ খোলা ফটক মুসলিম যোদ্ধাদের জন্যে মরণ ফাঁদে পরিণত হতে পারে।
হিন্দু সেনাদের দুঃসাহসিকতায় সুলতান মাহমূদকে তাঁর রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করলো। হিন্দুদের মোকাবেলায় সুলতান মাহমুদ অত্যন্ত অভিজ্ঞ হলেও সোমনাতের হিন্দুদের রণকৌশল ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের নারীশিশু বৃদ্ধ আবাল বণিতা সকলেই ছিলো ধর্মীয় ভাবাবেগে উন্মাদ। হিন্দুদের আগ্রাসী তৎপরতায় যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন সুলতান। তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। ঠিক এই মুহূর্তে তার কানে ভেসে এলো শোরগোলের আওয়াজ। এ ধরনের শোরগোলের সাথে সুলতান পরিচিত।
মুহূর্তের মধ্যে তিনি দেখতে পেলেন, অন্য একটি ফটক খুলে সোমনাথ দুর্গ থেকে দু’টি অশ্বারোহী দল ও একটি পদাতিক দল দ্রুতগতিতে ধেয়ে এসে গযনী সেনাদের উপর হামলে পড়েছে। কিন্তু এবার আর ডানবাম দিক থেকে হিন্দুদের ঘিরে ফেলার কৌশল অবলম্বনের কোন সুযোগ হিন্দুরা রাখেনি। কারণ, দুর্গ প্রাচীর ও বুরুজের উপর থেকে অসংখ্য তীরন্দাজ তাদের সহায়তা করছিলো যাতে গযনী বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলতে না পারে।
প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ ঘেরাও কাজে নিয়োজিত সেনাদের পিছনে সরে আসার নির্দেশ দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন হিন্দুসেনারা এগিয়ে এলে দুর্গ প্রাচীর ও তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাবে। তখন দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত তীরন্দাজদের তীরবৃষ্টির আওতামুক্ত হয়ে গযনীর সেনারা হিন্দুদের ঘেরাও করতে সক্ষম হবে এবং দুর্গ ফটক অতিক্রম করারও সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মহারাজা রায়কুমারের দেমাগ অস্বাভাবিক কৌশলী চাল দিচ্ছিল, তার প্রতিটি যুদ্ধ চালই ছিলো নিপুণ ও কার্যকর। রায়কুমার তার সেনাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তোমরা কোন অবস্থাতেই দুর্গপ্রাচীরের তীরন্দাজদের আওতার বাইরে যাবে না। রায়কুমার আবু আব্দুল্লাহর চাল অকার্যকর করে দিলেন। হিন্দু সেনারা তাদের আওতার বাইরে এলো না।
হিন্দু সেনারা সামনে অগ্রসর না হয়ে ডানে বামে ছড়িয়ে পড়লো এবং অবরোধকারী সেনাদের উপর খণ্ড খণ্ড হামলা করতে লাগলো। হিন্দুরা অবরোধ ভাংতে এবং গযনী বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে হিন্দুদের উত্তেজনা উন্মাদনায় রূপ নিলো। এমন সময় দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে গযনী সেনাদের কানে ভেসে এলো মহিলাদের চিৎকার। সোমনাথ দুর্গের হিন্দুমহিলারা তাদের যোদ্ধাদের আরো উত্তেজিত ও উৎসাহিত করতে সমস্বরে চিৎকার করে নানা ধ্বনি দিচ্ছিলো। তারা বলছিলো- ‘সোমনাথের সুপুত্ররা! তোমরা স্লেচদের কচুকাটা করে ফেলো, নয়তো এরা তোমাদের মাবোনদের অপহরণ করে নিয়ে যাবে। এদের নিঃশেষ করে ফেলল, না হলে আমাদের কারো রক্ষা নেই…।’
রণাঙ্গনের অবস্থা এতোটাই মুসলমানদের জন্যে শোচনীয় হয়ে পড়লো যে, সুলতান মাহমূদ কেন্দ্রীয় কমান্ড তার একান্ত বিশ্বস্ত কয়েকজন সেনাকর্মকর্তার কাঁধে ন্যস্ত করে একটি চৌকস বাহিনী নিয়ে নিজেই আক্রমণকারী হিন্দুদের প্রতিরোধে লিপ্ত হলেন।
ঐতিহাসিক আলবিরুনী ও আবুল কাসিম ফারিশতা লিখেছেন- এ সময় গযনী বাহিনীর জন্যে সবচেয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করেছিলো দুর্গ প্রাচীর থেকে আসা তীর ও বর্শা। এ সময় সুলতান মাহমূদ নিজেকে এবং গোটা গযনী বাহিনীকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন। কারণ সুলতান মাহমূদের উপর শত্রুদের একটি তীরই গযনী বাহিনীকে পরাস্ত করার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।
প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ সুলতানের এই বেপরোয়া অবস্থা দেখে দ্রুত একটি তীরন্দাজ ইউনিটকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা দুর্গ প্রাচীরের কাছাকাছি গিয়ে প্রাচীরের উপর অবস্থানরত তীরন্দাজদের নিশানা করে তীর নিক্ষেপ করতে থাক। তীরন্দাজরা যখন দেখতে পেল সুলতান মাহমূদ তার প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেঙ্গে সম্মুক ভাগে আক্রমণ চালাচ্ছেন, তখন তারা জীবনের পরোয়া না করে একেবারে দুর্গ প্রাচীরের কাছে গিয়ে হিন্দুদের উপর প্রচণ্ড তীর চালাতে লাগলো। হিন্দুদের নিক্ষিপ্ত বর্শায় একের পর এক গযনীর তীরন্দাজ ধরাশায়ী হচ্ছিলো কিন্তু তবুও তাদের তীর নিক্ষেপে কোনরূপ বিচ্যুতি ঘটলো না। অবস্থা এমন হলো যে, বাতাসে উভয় পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরে তীরে সংঘর্ষ ঘটতে লাগলো।
আবু আব্দুল্লাহর এই চালে এতটুকু কাজ হলো যে, দুর্গ প্রাচীরের হিন্দু তীরন্দাজদের লক্ষ্য সুলতান মাহমূদের দিক থেকে অন্য দিকে ঘুরে গেলো। সেই সাথে গযনীর অন্য যোদ্ধারা যখন দেখলো, তাদের সহযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে, তীরন্দাজদের এই আত্মত্যাগে তারাও উজ্জীবিত ও শক্রদের বিরুদ্ধে এমন উত্তেজিত হলো যে, কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেরাই অগ্রগামী হয়ে দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত হিন্দু সেনাদের প্রতি প্রচণ্ড তীর বর্ষণ করতে লাগলো। তীব্র তীর বৃষ্টিতে টিকতে না পেরে শত্রুসেনারা দুর্গ প্রাচীর থেকে নেমে যেতে শুরু করলো এবং বহু সংখ্যক হিন্দু সেনা তীরবিদ্ধ হয়ে দুর্গ প্রাচীরের বাইরে গড়িয়ে পড়লো।
