এদিকে মন্দিরেও খবর পৌঁছে গেলো, মুসলিম সেনারা দুর্গে ঢুকে পড়েছে। একথা শুনে যেসব পুরোহিত, ঠাকুর ও পণ্ডিত স্বাভাবিক পূজা-অর্চনা করছিলো, এরা সবাই মূর্তির পায়ে মাথা রেখে গড়াগড়ি করে রোদন করতে লাগলো । মন্দিরের প্রধান ফটক খোলা থাকার কারণে মুসলমানদের নারায়ে তাকবীর ধ্বনি মন্দিরের পূজারীদের কানে পৌঁছে গো পণ্ডিত পুরোহিতরা ছিলো ধর্মের কাণ্ডারী। এরা লড়াই করতে জানতো না। সুলতান মাহমূদ মন্দির ও মন্দিরের মূর্তি ধ্বংস করতেন কিন্তু কোন পূজারী বা পুরোহিতের গায়ে হাত তুলতেন না।
সোমনাথ মন্দিরের পণ্ডিত পুরোহিতদের কানে যখন গযনী সেনাদের তকবীর ধ্বনিত হতে লাগলো, তখন তাদের পূজার ধ্যান ছুটে গেলো। তখন হাজারো পুরোহিতের কিছু সংখ্যক পূজা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো। তারা দেখলো নৃত্যরত নর্তকীদের নাচ থেমে গেছে। তাদের চেহারা ফ্যাকাসে তারা ভীত সন্ত্রস্থ। পণ্ডিতেরা যখন দেখলো তাদের জীবনের শেষ সময় এসে গেছে তখন নৃত্যত্যাগী সুন্দরীদের সাথে করে প্রত্যেকেই মন্দিরের গোপন প্রকোষ্ঠে ঢুকে পড়লো এবং তাদের সাথে আদিম উল্লাসে মেতে উঠলো। কিন্তু দুর্গের সাধারণ হিন্দুদের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা পণ্ডিতদের এই পৈশাচিকতার বিন্দু বিসর্গও জানতো না।
সোমনাত দুর্গের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে তেমন ভয়-ভীতি ছিলো না । পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহিলারাও মুসলিম যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলো । বৃদ্ধা মহিলারা সমবেত হয়েছিলো মন্দিরে। তারা মূর্তির বেদিতে মাথা ঠেকিয়ে রোনাজারী করছিলো। তারা মুসলমানদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে দেবদেবীদের সাহায্য প্রার্থনা করছিলো।
* * *
দুর্গফটক খুলে দেয়ার চালটি ছিলো সোমনাথ দুর্গের রাজা রায়কুমারের। রাজা রায়কুমার ইতোমধ্যে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, দুর্গফটক খুলে দিয়ে তিনি গযনী বাহিনীকে আরো বেশী পর্যদস্তু করতে পারবেন। কিন্তু রায় কুমারের প্রতিপক্ষ ছিলেন তার চেয়েও আরো বেশী দূরদর্শী জেনারেল। যে কোন বিপর্যয় থেকেও শিক্ষা নিয়ে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ঠেকিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার মতো পারদর্শী ছিলেন গযনীর সুলতান।
গযনীর সুলতান ও তার প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ দুর্গফটক খুলে দেয়ার সাথে সাথেই কিছু সেনাকে দুর্গফটকের উপরের বুরুজ ও মরিচায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারা সেখান থেকে কার্যকর ভাবে তীর নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয় তাদের সহায়তায় অন্য সেনারা মই বেয়ে দুর্গপ্রাচীরে উঠতে থাকে।
মহারাজা রায়কুমার এই অবস্থা দেখে বিপুল সংখ্যক সেনাকে দুর্গফটকের দিকে ঠেলে দিলেন। সংখ্যাধিক্য হওয়ায় তারা মানবঢাল তৈরী করে মুসলিম সেনাদেরকে দুর্গফটকের বাইরে ঠেলে নিয়ে গেলো। আর এ দিকে রাজার নির্দেশে দুর্গ ফটক বন্ধ হয়ে গেলো। এবার হিন্দু সৈন্যদের আর ভেতরে ফেরার কোন পথ থাকলো না। তারা সোমনাথের জন্য আত্মবিসর্জন দিতে লাগলো। একে একে সবাই মুসলিম যোদ্ধাদের হাতে নিঃশেষ হয়ে গেল।
দুর্গফটক বন্ধ করে দিয়ে সকল হিন্দু যেসব মুসলিম যোদ্ধা দুর্গ ফটকের উপরের বুরুজে অবস্থান নিয়েছিলো তাদের উপর হামলে পড়লো। এমতাবস্থায় প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গযনীর যোদ্ধারা লড়াই করে জীবন বিসর্জন দিলো। বুরুজ দখলকারী মুসলমানদের কাবু করার পর হিন্দুরা মই বেয়ে দুর্গ প্রাচীরে উঠে আসা বন্ধ করতে গযনী সেনাদের প্রতিরোধে লিপ্ত হলো। হিন্দুদের প্রবল তীর ও বর্শা বর্ষণের কারণে তারা একে অন্যের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলো। দুর্গ প্রাচীরে আরোহণ সচেষ্ট মুসলিম সেনাদের কারো পক্ষেই জীবন নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হলো না।
সুলতান মাহমূদ দেখলেন, সূর্য দুর্গ প্রাচীরের আড়ালে চলে গেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। তিনি আরো খেয়াল করলেন তার যোদ্ধাদের মধ্যে আহতের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। এমতাবস্থায় তিনি দুর্গ প্রাচীরের কাছে থাকা সেনাদেরকে পিছিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন এবং যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করলেন।
রাতব্যাপী সুলতান এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমালেন না। তিনি সেনাপতি ও কমান্ডারদের দিক-নির্দেশনা দিলেন। ঘুরে ঘুরে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নিলেন এবং যেসব যোদ্ধা বহিঃশত্রুদের পথরোধ করার জন্য শিবির থেকে দূরে অবস্থান করছিলো তাদের সাথেও সাক্ষাত করলেন। মনে মনে তিনি কিছুটা চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। দৃশ্যত তার কাছে বিজয় সুদূর পরাহত মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাতেও তিনি হতোদ্যম হলেন না। বস্তুত হতোদ্যম হয়ে রণেভঙ্গ দেয়ার ব্যক্তি তিনি ছিলেন না।
পরদিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই নব উদ্যমে তিনি সেনাদেরকে দুর্গ প্রাচীরে আঘাত হানার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে সেনারা মই বেয়ে দুর্গ প্রাচীরে উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু হিন্দুরা তাদের কোন চেষ্টাই সফল হতে দিলো না। সারাদিন চললো আঘাত প্রত্যাঘাত। কিন্তু কোন পক্ষেরই তেমন সফলতা এলো না। দিন শেষে সুলতান সেনাদের ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন।
* * *
১০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি। মহারাজা রায়কুমার একটি দুঃসাহসী চাল দিলেন। তিনি ভোরের সূর্য উদিত হওয়ার আগেই দুর্গফটক খুলে দিলেন। খোলা দরজা দিয়ে দুর্গের ভেতর থেকে দু’টি সেনাদল বের হয়ে মুসলিম শিবিরে আঘাত হানলো । হিন্দুরা ভেবেছিলো, মুসলিম যোদ্ধারা হয়তো তখনো ঘুমিয়ে আছে, নয়তো প্রস্তুতিতে লিপ্ত রয়েছে। বস্তুত সময়টা ছিলো ফজরের নামাযের। গযনীর সেনারা নামায শেষ করেছিলো মাত্র। হিন্দুরা ছিলো অশ্বসজ্জিত পক্ষান্ত রে গযনী সেনাদের পক্ষে অশ্বারোহণের জন্য ঘোড়ার কাছে যাওয়ার অবকাশ ছিলো না। এমতাবস্থায়ও সুলতান মাহমূদ দূতের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিলেন হিন্দু সেনাদেরকে ঘেরাও করে ফেল। হিন্দুরা অত্যধিক দুঃসাহস নিয়ে হামলে পড়েছিলো। তারা বুঝতে পারলো না তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলা হচ্ছে।
