তারা চাচ্ছিল দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেলে কুড়াল দিয়ে দরজা তারা ভেঙে ফেলতে পারবে। কিন্তু দু’জন দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল আর অপর দু’জন দরজা পর্যন্ত পৌঁছলো বটে কিন্তু দরজায় কুঠারাঘাত করার আগেই দুর্গ প্রাচীরের উপরে অবস্থানরত দ্বাররক্ষীদের বর্শার আঘাতে ধরাশায়ী হলো।
প্রতিরক্ষা খাল কিছুটা ভরাট ও ঘোড়া দৌড়ে যাওয়ার উপযোগী হওয়ায় বাধভাঙ্গা বানের মতো গযনীর সেনারা দুর্গ প্রাচীরের দিকে ধাবিত হলো। তাদের কারো কারো হাতে ছিলো দীর্ঘ মই। দেয়ালে মই ঠেকিয়ে যাতে দ্রুত গযনীর সেনারা দুর্গ প্রাচীরের উপর ওঠে যেতে পারে এজন্য তারা দুর্গ প্রাচীরের উচ্চতার সমান মই নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। আর এই মই বহনকারীদেরকে শত্রুসেনাদের তীরাঘাত থেকে রক্ষার জন্যে পেছন দিক থেকে গযনীর তীরন্দাজ সেনারা দুর্গপ্রাচীরে অবস্থানরত শত্রুসেনাদের প্রতি তীব্র তীর নিক্ষেপ করছিল যাতে তীর নিক্ষেপরত হিন্দুরা জীবন বাঁচাতে মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তীরন্দাজ হিন্দুরা মাথা নীচু করে তীর নিক্ষেপ বন্ধ করেনি। তারা একের পর এক তীর বিদ্ধ হচ্ছিল বটে কিন্তু গযনীর মইবাহী সেনাদের অগ্রগতি রোধ করার চেষ্টায় মোটেও ক্রটি করেনি।
দৃশ্যত দুর্গ ফটক পর্যন্ত পৌঁছার কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এমতাবস্থায়ও কয়েকজন জানবাজ গযনী সেনা দুর্গফটকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারা দুর্গ ফটকের ফাঁক দিয়ে বুরুজে অবস্থানরত তীরন্দাজ ও দ্বাররক্ষীদের দিকে তীর নিক্ষেপ করার সুযোগও পেয়েছিল। এই সুযোগে কয়েকজন দেয়ালে মই দাঁড় করাতে সক্ষম হলো কিন্তু বিধি বাম। যেই মই বেয়ে দুর্গপ্রাচীরের উপরে উঠতে যাচ্ছে তাকেই তীর ও বর্শাবিদ্ধ হয়ে গড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে যখন দুর্গপ্রাচীরে চড়ার চেষ্টা চলছিল, অপরদিকে সমুদ্রের পানিপথেও তখন গযনীর সেনারা দুর্গপ্রাচীরে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করছিল। সমুদ্রের পানিপথেও চলছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কারণ সোমনাথ দুর্গের দুই তৃতীয়াংশই ছিল পানিবেষ্টিত। গযনীর একজন ডেপুটি সেনাপতি পানিপথের সুযোগ নিয়ে দুর্গ প্রাচীরের উপরে উঠার দুঃসাহসী উদ্যোগ নিয়েছিল। গযনী সেনাদের কোন নৌকা ছিল না। কিন্তু দুর্গের পাশের সমুদ্র তীরে জেলেও সেনাদের শত শত নৌকা সারি সারি বাধা ছিল। গযনীর এক ডেপুটি সেনাপতি তার ইউনিট নিয়ে কিছু সংখ্যক মই নৌকায় তুলে জেলে মাল্লাদেরকে দুর্গ প্রাচীরের দিকে নৌকা চালানোর নির্দেশ দিল । কিন্তু গযনী সেনাদের এই উদ্যোগও দুর্গপ্রাচীরে পাহারারত হিন্দুসেনাদের চোখে পড়ে গেল। ফলে তারা আগুয়ান গযনী সেনাদের প্রতি দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে তীর নিক্ষেপ শুরু করলো। তীর আসতে দেখে হিন্দু মাঝি মাল্লারা প্রাণ বাঁচাতে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। ফলে গযনী সেনাদের অনভ্যস্ততা সত্ত্বেও নৌকার হাল ধরতে হলো। সাগরেও শুরু হয়ে গেলো তীব্র লড়াই।
সেদিন ছিল জুমআর দিন। জুমুআর সময় প্রায় হয়ে যাচ্ছে। তখনও চলছে। খাল ভরাটের কাজ। কারণ খাল যতোটা বেশী ভরাট করা যাবে, আক্রমণও পশ্চাৎপসারণের কাজটা তততটাই সহজ হবে। এ সময় উভয় বাহিনীর সৈন্যরা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছিল। ঠিক জুমআর সময়ের আগে আগে সুলতান মাহমূদ হাত উঠিয়ে আল্লাহর কাছে বিশেষ মোনাজাত করলেন এবং মোনাজাত শেষ করে ঘোড়ায় চড়ে চিৎকার করে করে আক্রমণ আরো তীব্র করার জন্য সেনাদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তিনি তার অবস্থান থেকে অনেক সামনে অগ্রসর হয়ে সেনাদেরকে উজ্জীবিত করার জন্যে চিৎকার করে সঙ্গ দিচ্ছিলেন।
এমন সময় হিন্দুরা দুঃসাহসের পরিচয় দিল। তারা একটি ফটক খুলে দিল। দুর্গের ভেতর থেকে অশ্বারোহীরা বর্শা হাতে নিয়ে বিদ্যুৎবেগে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে গযনী সেনাদের উপর প্রচণ্ড আঘাত হানলো। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো বটে কিন্তু মুসলমানদেরকে দুর্গপ্রাচীর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সক্ষম হলো।
সুলতান মাহমূদ তার সেনাদের নির্দেশ দিলেন, খোলা ফটক দিয়ে দুর্গের ভেতরে ঢুকে যাও। নির্দেশ পেয়েই বহু যোদ্ধা এক সাথে দুর্গ ফটকের দিকে ঘোড়া হাঁকালো কিন্তু ভেতর থেকে এতো বিপুল পরিমাণ হিন্দু সেনা গযনী সেনাদের ঠেকানোর জন্য ফটক আগলে দাঁড়ালো যে তাদের পক্ষে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হলো না। দুর্গ ফটকের সামনেই দুই বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেধে গেল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, অবস্থা এমন ছিলো যে, উভয় পক্ষের যোদ্ধারাই ছিলো মরা ও মারার জন্যে মরিয়া। গযনীর সেনারা শপথ করেছিলো হয় মৃত্যু নয়তো বিজয়। মুসলমানদের এই শপথের অগ্নিবাণ হিন্দুরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রোধ করছিলো।
দুর্গের ভেতরে খবর ছড়িয়ে পড়লো, গযনীর সেনারা দুর্গের প্রধান ফটক খুলে ফেলেছে। খবর পেয়ে দুর্গ প্রাচীরে ছড়িয়ে থাকা তীরন্দাজ হিন্দুরা প্রধান ফটকের উপরে এসে সমবেত হয়ে নীচে মুসলমানদের লক্ষ্য করে তীরবৃষ্টি বর্ষণ করতে শুরু করলো।
দুর্গপ্রাচীরে এ খবরও ছড়িয়ে পড়েছিলো, মুসলিম যোদ্ধারা দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। খবর শুনে দুর্গপ্রাচীরের উপরে থাকা সৈন্যরা নীচে নেমে এলো মুসলমানদের প্রতিরোধ করতে। অপর দিকে দুর্গ প্রাচীর খালি দেখে গযনী সেনারা দেয়ালে ঠেকিয়ে একের পর এক দুর্গপ্রাচীরে উঠতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে দুর্গ প্রাচীরেও শুরু হয়ে গেলো দুই বাহিনীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই।
