সুলতান মাহমূদ সোমনাথের ঐতিহাসিক মূর্তিকে ধ্বংস করে হিন্দুদের মিথ্যা চন্ত্রদেবতার কাহিনীকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে তাওহীদের বাণী উচ্চকিত করা জন্যেই এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে বেরিয়েছিলেন।
মূলত সোমনাথের যুদ্ধ ছিল হিন্দুরাদ ও তাওহীদের মধ্যকার একটি চূড়ান্ত লড়াই। দুইটি জাতির আদর্শিক লড়াই। আদর্শিক লড়াই না হলে উভয় পক্ষ বিজয়ের জন্যে এভাবে জীবন বিলিয়ে দিতে পারতো না।
১০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি মোতাবেক ৪১৬ হিজরী সনের ৫ যিলকদ শুক্রবার। রীতি অনুযায়ী অন্যান্য দিনের মতো ফজরের আযান ধ্বনীত হলো। গযনীর সেনারা নামাযের জন্য জামাতে শরীক হলো। সুলতান মাহমূদ নিজেও সেনাদের সাথেই এক ফাঁকে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করলেন।
ইমাম সাহেব আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে গয়নী বাহিনীর বিজয়ের জন্যে দুআ করলেন। নামাযের পর গযনীর সৈন্যরা সোমনাথের মন্দির কেন্দ্রিক দুর্গ অবরোধ করলো । এই অবরোধের মধ্যে ঐতিহাসিকদের মতো চমক সৃষ্টি করেছিলো গযনী সেনাদের সমন্বিত তাকবীর ধ্বনি। তাকবীর এতোটাই প্রাণবন্ত ও উচ্চকণ্ঠ ছিলো যে, গযনীর সেনাদের তাকবীর ধ্বনি সোমনাথ দুর্গে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলো। গযনী সেনাদের প্রচণ্ড তাকবীর ধ্বনি শুনে দুর্গ প্রাচীরে হাজার হাজার হিন্দু এসে সমবেত হলো। হিন্দুরাও মুসলিম সেনাদের বিপরীতে জয়হিন্দু, জয় সোমনাথ, জয় শিবদেব বলে চিৎকার শুরু করলো।
সুলতান মাহমূদ এদিন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্দেশ করার পরিবর্তে অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে গোটা এলাকা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং সেনাদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তার একান্ত বার্তা বাহকদল তাকে অনুসরণ করছিলো এবং তার প্রতিটি নির্দেশ যথাযথভাবে উদ্দিষ্ট কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলো।
অবরোধ আরোপের পর প্রথম সমস্যা দেখা দিল খাল। সোমনাথকে তিন দিকে ঘিরে রেখেছিলো সাগর আর এক দিকে ছিল স্থল। সেদিকে আবার গভীর খাল খনন করে একটি মাত্র পথ রেখে সোমনাথ দুর্গকে অজেয় করে রেখেছিল হিন্দুরা। এই খালই গযনী সেনাদের জন্যে কাল হয়ে দেখা দিল। কারণ দুর্গ প্রাচীর ও বুরুজের উপর থেকে গযনী বাহিনীর উপর তীরবৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল যাতে তারা একটি মাত্র স্থান দিয়ে খাল পার হতে না পারে।
সুলতান মাহমূদ খালের পাড়ে গয়নী বাহিনীর হাজার হাজার তীরন্দাজকে দাঁড় করিয়ে দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত হিন্দুদের প্রতি বিরামহীন তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। গযনী বাহিনীর কামানগুলো ছিল হিন্দুদের কামান অপেক্ষা বেশী শক্ত। তাদের নিক্ষিপ্ত তীর হিন্দুদের নিক্ষিপ্ত তীরের চেয়ে অনেক দূরে গিয়ে পড়তো।
গয়নী সেনাদের আকস্মিক তীব্র তীরবৃষ্টিতে দুর্গপ্রাচীরের হিন্দুরা জীন বাঁচাতে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। ফলে তাদের তীরের তীব্রতা হ্রাস পেলো। এই সুযোগে গযনীর সেনারা উটের পিঠে করে নিয়ে আসা পাথরগুলো খালের মধ্যে নিক্ষেপ করছিল। এই ব্যাপারটি ছিল অনেকটা এক জায়গা থেকে মাটি এনে অন্য জায়গার নদী ভরাট করার মতো।
হিন্দুরা যখন দেখলো, তাদের প্রতিরক্ষা খাল গযনীর সেনারা ভরাট করতে শুরু করেছে, তারা জীবন উৎসর্গ করে গযনী বাহিনীর তীরের আঘাতের তোয়াক্কা না করে দুর্গ প্রাচীর থেকে গযনীর তীরন্দাজ ও পাথরবাহী সেনাদের উপর তীর নিক্ষেপের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। অবস্থা এমন হলো যে, মুসলিম তীরন্দাজদের তীর বিদ্ধ হয়ে শতে শতে হিন্দু দেয়ালের উপর থেকে পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু তাতেও হিন্দুদের তীর আক্রমণে কোন ভাটা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না, মুহূর্তের মধ্যে সেই শূন্যস্থান অপর হিন্দুরা দখল করে নিচ্ছিল। হিন্দুরা মুসলমানদের ঠেকাতে জীবনের কোন পরোয়াই করছিল না। তারা গযনী বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হলো।
প্রতিরক্ষা খাল তখনো অর্ধেক ভরাট হয়েছে মাত্র। এমন সময় গযনীর তীরন্দাজ সেনারা লক্ষ্য করলো, হিন্দুদের বেপরোয়া তীরাঘাতে তাদের সহযোদ্ধা ভাইয়েরা নিহত হচ্ছে। তখন তাদের রক্ত টগবগিয়ে উঠলো এবং গযনীর তীরন্দাজরা প্রতিরক্ষা খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে একে অন্যের হাত ধরে খালের অপর পাড়ে ঠাই করে নিলো। তারা জীবন বাজি রেখে একেবারে দুর্গপ্রাচীরের এতোটাই কাছে চলে গেলো যে দুর্গপ্রাচীরের উপরে দাঁড়ানো প্রতিটি ব্যক্তিকে আলাদা আলাদা ভাবে তারা সনাক্ত করতে সক্ষম। এমতাবস্থায় তারা জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে হিন্দুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ শুরু করলো।
গযনীর তীরন্দাজদের এই দুঃসাহসী ভূমিকায় শক্তি সঞ্চার করেছিল গযনী সেনাদের সম্মিলিত তকবীর ধ্বনি। গযনীর তীরন্দাজদের উপর ঠিক মাথার উপর থেকে শিলা বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল কিন্তু তারা তীরবিদ্ধ হয়েও প্রতিপক্ষের প্রতি বিরামহীন তীর নিক্ষেপ করেই যাচ্ছিল। মূলত তখন উভয় পক্ষের মধ্যে তীরযুদ্ধই হয়ে উঠেছিল মূল। হিন্দুরা চাচ্ছিল প্রতিরক্ষা খালকে কার্যকর রাখতে আর গয়নী সেনারা চাচ্ছিল প্রতিরক্ষা খালটি ভরাট করে দুর্গে আক্রমণ ব্যবস্থাকে অবারিত ও সাচ্ছন্দময় করতে । যাতে তারা সহজে দুর্গ প্রাচীর পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারে, খালের প্রতিবন্ধকতা থাকে।
এক পর্যায়ে খালের কিছুটা অংশ ভরাট হয়ে গেল। যাতে চারটি ঘোড়া একসাথে সমান্তরাল ভাবে খাল ডিঙাতে পারবে। ঠিক সেই সময় চারজন যোদ্ধা হাতে কুড়াল নিয়ে ঊধ্বশ্বাসে খাল পেরিয়ে দুর্গ প্রাচীরের দিকে ঘোড়া হাঁকাল। তাদের লক্ষ দুর্গ প্রাচীরের একটি ছোট ফটক।
