দুই নর্তকীর আত্মহুতির পর অন্য নর্তকীরা যে উত্তাল নাচ শুরু করলো, সেই নাচের মধ্যে নাচের তাল, লয়, মাত্রা ঠিক থাকলেও তা ছিল উন্মাদনা। দেখে মনে হচ্ছিল এটাই হবে এদের জীবনের শেষ নাচ। মনে হচ্ছিল নর্তকীদের মধ্যে জিন ভর করেছে। নয়তো কোন মানুষ এতো দীর্ঘ সময় এমন উত্তাল নাচে লিপ্ত থাকতে পারে না। অবশ্য এই নাচের আসরে নাচতে নাচতে কলোজন নর্তকী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছিলো সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। কিন্তু অনেকেই যে নিজেদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিলো তা নিশ্চিত।
একদিকে মন্দিরের উন্মুক্ত মঞ্চে ছিলো নর্তকীদের উন্মত্তাল নাচ, বাদকদলের বিরামহীন বাজনা, অবিরাম মন্দিরের ঘণ্টার আর্তনাদ, অপরদিকে মন্দিরের মূলবেদীতে মূর্তির সামনে ছিলো দশ হাজার পুরোহিতের সমবেত ভজন। বস্তুত সব মিলিয়ে সোমনাথের সেই রাতটিকে ভক্ত পূজারী, পুরোহিত, সৈন্য আর শহরের অধিবাসীরা এক ভয়ঙ্কর কালো রাতে রূপান্তরিত করেছিলো।
মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহরে এ খবর ছড়িয়ে পড়লো, দুই নর্তকী নিজ হাতে পেট চিরে তাদের হৃদপিণ্ড শিবদেবের পায়ে নজরানা দিয়েছে । শোনামাত্র গোটা শহরের নারীরা মন্দিরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো এবং ঘাতিনী দুই নর্তকীর দেহ থেকে ঝড়ে পড়া রক্ত আঙুলে নিয়ে নিজেদের কপালে তিলক দেয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠলো।
সোমাথ শহরের পুরুষেরা যখন তাদের স্ত্রী কন্যা-মাতাদের কপালে রক্তের তিলক দেখলো তখন তাদের উন্মাদনা ও ক্ষোভ আরো উস্কে উঠলো। যুদ্ধের খবর সরকারি নির্দেশেই সারা শহরে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল। বারবার প্রচার করা হচ্ছিল, মুসলমানদেরকে শিবদেব নিশ্চিহ্ন করা জন্য এখানে টেনে নিয়ে এসেছেন। ভারত মাতার বুকে কোন ম্লেচ বেঁচে থাকতে পারবে না। শিবদেবের পূজারীগণ! স্লেচদের টুকরো টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দাও। খবরদার! হুশিয়ার! লড়াই করে যারা মারা যাবে, শিবদেব তাদের পুনর্জন্ম দেবেন।
* * *
উপমহাদেশে ইংরেজ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার পর এখানকার স্কুল কলেজ ও পাঠশালায় ইংরেজদের অনুমোদিত হিন্দুদের লেখা মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস পাঠ্য করা হয়। সেসব ইতিহাসে বলা হয়, সুলতান মাহমূদ সতেরো বার হিন্দুস্তানে অভিযান চালিয়ে ছিলেন এবং তার সর্বশেষ অভিযান ছিলো সোমনাথ। সোমনাথ মন্দিরের বড় বড় মূর্তিগুলো ছিলো ভেতরে ফাঁপা এবং ফাঁপা জায়গাগুলো বহু মূল্যবান হিরে জহরত ও মণিমুক্তায় ঠাসা ছিলো। সুলতান মাহমূদ বহু মূল্যবান মণিমুক্তা ও হিরে জহরতের জন্যেই সোমনাথ আক্রমণ করেছিলেন।
বস্তুত ইংরেজ ও হিন্দুরা সুলতান মাহমূদের ঈমানী চেতনা, দ্বীনের দাওয়াত ও জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ভারতের অগণিত মানুষকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মর্যাদা ও সম্মানপূর্ণ জীবন উপহার দেয়ার, হিন্দু কুচক্রীদের মুসলিম বিদ্বেষ ও প্রজাপীড়ন উৎখাত, জুলুম অত্যাচার এবং সাধারণ মানুষকে পৌত্তলিকতার অভিশাপ থেকে বাঁচানো এবং শাসকদের গোলামীর উৎসভূমি মন্দিরগুলোকে ধ্বংস করার জন্যে বারবার তিনি হিন্দুস্তানে এসেছিলেন, ধনরত্ন লুটতরাজের জন্য নয়। কারণ এসব মন্দিরের পুরোহিত ও পণ্ডিতেরাই ছিল পৌত্তলিকতার উৎস এবং প্রজাপীড়নের নিকৃষ্ট হাতিয়ার।
ইংরেজ ও হিন্দুরা মুসলিম বীরপুরুষদের বীরত্ব, আদর্শ ও গৌরব গাঁথাকে স্নান করার জন্যে মুসলিম শাসক ও বীরপুরুষদের চরিত্রে নানাভাবে কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টা করেছে। ইংরেজ ও হিন্দুরা আজো মুসলমানদের তৌহিদী চেতনা ও পৌত্তলিকতা বিরোধী ঈমানী শক্তিকে ভয় করে।
এদেশে ইংরেজরা আসার সাথে সাথে হিন্দুরা তাদের কর্তৃত্বকে মানসিকভাবে মেনে নেয়, অপরদিকে মুসলমানদের তুলনায় ইংরেজরা হিন্দুদেরকেই বেশী সহায়ক মনে করে। আর মুসলমানদেরকে বৈরী শক্তি বলেই বিশ্বাস করতো। একারণেই হিন্দু ও ইংরেজরা মিলে সর্বশক্তি দিয়ে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের কৃষ্টিকালচার, ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই নিষ্ঠুর হাতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং বিকৃতি সাধনে লিপ্ত হয়।
সুলতান মাহমূদের সময়কার মুসলিম ইতিহাসবিদগণ বিশেষ করে আলবিরুনী, ফারিতা প্রমুখ যে ইতিহাস লিখেছেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, তখনকার পরিবেশ, পরিস্থিতি, গযনী থেকে হিন্দুস্তানের দূরত্ব ও পথের দুর্গমতা বিচার করলে কোন অর্থ লোভী, যুদ্ধবাজ লড়াকুর পক্ষে কোন অবস্থাতেই এমন দুরূহ অভিযানে বের হওয়ার কথা নয়। কারণ সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করলে গযনী থেকে সোমনাথে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত কোন বিবেকবান সেনানায়কের নেয়ার কথা নয়। এমন অভিযানে বের হতে পারে সেই যে হয়তো মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত, উন্মাদ, বাস্তবজ্ঞানহীন অথবা অব্যাহত বিজয়ে আত্মহারা কোন আগ্রাসী শাসক, নয়তো সমরবিদ্যায় অতুলনীয় যোগ্যতার অধিকারী কোন দূরদর্শী জেনারেল।
সমর বিশেষজ্ঞরা সুলতান মাহমূদের সোমনাথ অভিযানকে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের রুশ অভিযানের সাথে তুলনা করেন। অতি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে নেপোলিয়ন রাশিয়া গিয়ে ফাঁদে আটকে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন। সুলতান মাহমূদও দৃশ্যত সোমনাথ অভিযানে নিশ্চিত পরাজয় এবং সৈন্যদেরকে আত্মহুতির দিকেই ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অস্বাভাবিক দূরদর্শিতা, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং সত্যিকারের বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বের কারণে সেদিন গযনী বাহিনীকে নিশ্চিত নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে বিজয়ীর আসনে সমাসীন করেছিলেন কিংবদন্তী সুলতান মাহমুদ।
