আমরা সোমনাথকে ধ্বংস করে এটা প্রমাণ করতে চাই, সত্যের পতাকাবাহী, রসূলে আরাবী স.-এর পয়গামবাহী সৈনিকদের জন্যে কোন যুদ্ধক্ষেত্রই অনতিক্রম্য নয় এবং আল্লাহর পথের সৈনিকদের পথে কোন দুর্গমতাই বাধা হয়ে উঠতে পারে না। যেকোন বাধা তারা নিমিষেই জয় করে নেয়। হতে পারে আমার পর কোন মাহমূদ আমাদের প্রজ্জলিত আলো গোটা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে দেবে। আর যদি এমনটি সম্ভব না হয়, তাহলে হিন্দুস্তানে মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে সংঘাত লেগেই থাকবে, আর হিন্দুরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের আক্রমণের প্রতিশোধ নেবে এখানকার মুসলমানদের হত্যা করে।
আগামীকাল জুমআর দিন। আমি আশা করবো, আগামীকালের সূর্য উঠার আগেই অবরোধের কাজ সমাপ্ত হবে। তোমরা জানো, যথার্থ অর্থে এখানে অবরোধ আরোপ সম্ভব নয়। কারণ, সোমনাথের তিন দিকেই সমুদ্র, মাত্র একদিকে স্থল। এই স্থলভাগেও রয়েছে গভীর পরিখা। আমাদেরকে দুর্গে আঘাত করতে হবে। তাই আমাদেরকে পরিখা পেরিয়ে যেতে হবে। অবশ্য তা আমরা করতে পারবো ইনশা আল্লাহ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে তীরন্দাজদের। দুর্গপ্রাচীর ও বুরুজের উপর যেসব হিন্দু রয়েছে তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে হবে। দুর্গ প্রাচীরের উপরে উঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য আমি জানি, আমাদের এসব আয়োজন অনেকটাই আত্মহননের মতোই মনে হবে; কিন্তু এই দুর্গবন্দী শহর জয় করার জন্যে এছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই।
১০২৬ সনের ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার পেরিয়ে পর দিন শুক্রবার রাত। এ রাতে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম করেননি সুলতান মাহমুদ। রাতভর তিনি সৈন্যদের কার্যক্রম তদারকি করলেন। সৈন্যরাও রাতের মধ্যেই নিজ নিজ অবস্থানে ঠাই নেয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিলো।
সুলতান মাহমূদ বারবার সৈন্য ও কমান্ডারদের মনে করিয়ে দিলেন, হিন্দুরা তাদের বিজয়ের জন্যে সুন্দর যুবতী মেয়েদের ব্যবহার করতে পারে। সাবধান! সবাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।
* * *
যে সময় সুলতান মাহমূদ তার কমান্ডারদের দিক-নির্দেশনা ও উজ্জীবিত করছিলেন, তখন সোমনাথ দুর্গের ভেতরে শিব মূর্তির সামনে দশ হাজার হিন্দু পুরোহিত নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়ে পূজা করছিলো। এরা মাথা শিবদেবের পায়ে ঠেকিয়ে আর্তনাদ করছিলো। আর মন্দিরের উন্মুক্ত ময়দানে হাজারো যুবতী, নর্তকী নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন হয়ে উন্মাতাল নৃত্য করছিলো। নাচতে নাচতে একদল ক্লান্ত হয়ে গেলে এদের জায়গা অন্যেরা দখল করে নিচ্ছিলো। শহরের নারী পুরুষ সবাই শিব মূর্তির বেদীতে মাথা ঠেকিয়ে মুসলমানদের প্রতি শিবদেবের ক্ষোভকে উস্কে দেয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো, তাদের শিবদেব একবার ক্ষুব্ধ হয়ে গেলে গযনী বাহিনীকে নিমিষেই ধ্বংস করে ফেলবে।
হিন্দুদের এই আর্তনাদের মধ্যে কোন ধরনের আতঙ্ক ও ভীতির ছাপ ছিলো না। তাদের মধ্যে বিরাজ করছিল চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা। আবেগ, উত্তেজনা ও ক্ষোভে প্রায় পাগল হয়ে পড়ে ছিলো হিন্দু জনতা। সবাই শিব মূর্তির পায়ে মাথা রেখে পণ করেছিলো মুসলিম সৈন্যদের ধ্বংস করে দিতে। তারা এতোটাই পাগল প্রায় হয়ে পড়েছিলো যে, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছিলো। তাদের ক্ষোভ এতোটাই আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিলো যে, দেখে মনে হচ্ছিলো, কোন মুসলমান পেলে তারা জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
হিন্দু পুরোহিতরা জনতাকে এই বিশ্বাস দিয়েছিলো, তাদের শিবদেব মুসলমানদেরকে টেনে এখানে নিয়ে এসেছে। এবার মুসলমানদের ধ্বংস অনিবার্য।
হিন্দুদের মধ্যে এমনই উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিলো যে, এক নর্তকী নাচের আসর থেকে দৌড়ে এসে শিবমূর্তির সামনে দাঁড়ালো। তার হাতে ছিলো ছুরি। সে উন্মাদ কণ্ঠে ঘোষণা করলো, আমি শিবদেবের চরণে আমার হৃদয় নজরানা দিচ্ছি। সে এমনিতেই স্বল্পবসনা ছিলো, এবার এক টানে পরনের রেশমী কাপড়টি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেলো । নর্তকীর এ অবস্থা দেখে মন্দিরের সকল পূজা অর্চনা মুহূর্তের মধ্যেই থেমে গেলো।
নর্তকী হাতের ছুরিটি হঠাৎ তার বাম পাঁজরের নীচে সজোরে দাবিয়ে দিয়ে ডানে টান দিলো, মুহূর্তের মধ্যে তার পেট ফেঁড়ে গেলো এবং রক্তে নীচের দেহ ভেসে গেলো। কিন্তু কেউ তাকে বাধা দিলো না এবং মেয়েটিও পড়লো না। সে তার দু’হাত কাটা পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললো- কোথায় আমার হৃদয়? আমার হৃদয় তোমরা দেখিয়ে দাও।
এক পুরোহিত দৌড়ে নর্তকীর কাছে পৌঁছলো। আর তখন নর্তকীর মাথা পুরোহিতের গায়ে ঢলে পড়লো। পুরোহিত নর্তকীর কাটা পেট ধরে তার মাথা নিজের কাঁধে নিয়ে নিলো। নর্তকীর হাত থেকে পড়ে যাওয়া ছুরিটি অন্য এক পুরোহিত নিজ হাতে নিয়ে নর্তকীর হৃদযন্ত্র কেটে হাত উপড়ে তুলে সমবেত জনতাকে দেখালো। পুরোহিত নর্তকীর হৃদপিণ্ডটি মূর্তির বুকে স্পর্শ করে শিবমূর্তির পায়ের কাছে রেখে ঘোষণা করলো, কেউ মনে করো না, সে সামান্য নর্তকী ছিলো। নর্তকী হলেও তাকে শিবদেব কবুল করেছেন। সে মরেনি, তাকে শিবদেব পূনর্জন্ম দেবেন।
অন্য এক পুরোহিত নর্তকীর মরদেহ তুলে নিয়ে মন্দিরের একটি গোপন কক্ষে রেখে দিলো। আরেক নর্তকী পর মুহূর্তেই দৌড়ে মন্দিরের মূল বেদীতে এসে দাঁড়িয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেললো। পুরোহিত তখনো ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো । নর্তকী এক ঝটকায় পুরোহিতের হাত থেকে ছুরিটি ছিনিয়ে নিয়ে আগের নর্তকীর মতোই এক টানে পেট চিরে পুরোহিতের কাছে আবেদন করলো, তার হৃদপিণ্ডও যেন শিবদেবের পায়ে রেখে দেয়া হয়। এই বলে নর্তকী ঢলে পড়ে ছটফট করতে লাগলো। এই অবস্থাতেই পুরোহিত নর্তকীর হৃদপিণ্ড কেটে শিবমূর্তির পায়ের কাছে রেখে দিল।
