তোমাদের চেহারা দেখে আমি যা অনুভব করছি এবং তোমরা যা ভাবছো, সম্ভবত আমার ভাবনাও তোমাদের চেয়ে ভিন্ন নয়। তোমরা কি বলতে পারো কেন আমাদের সবার কাছে মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধই আমাদের জীবনের শেষ যুদ্ধ? কারণ হলো, এর আগে আমরা যেসব দুর্গ ও রাজ্য জয় করেছি, তাতে প্রতিপক্ষ ছিলো বিভিন্ন রাজা ও মহারাজারা।
কিন্তু সোমনাথ সেসব রাজা মহারাজাদের কোন রাজ্য বা দুর্গ নয়। এখানে হবে একটি ধর্মের সাথে আরেকটি ধর্মের মোকাবেলা । এখানে তোমরা একটি বাতিল ধর্মমতকে পরাজিত করে সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত করতে এসেছে। হিন্দু ধর্ম আমাদের দৃষ্টিতে বাতিল হলেও সেই ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্ম রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দিতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করে না। সোমনাথ সারা ভারতের হিন্দুদের জন্যে কা’বার মতো। তোমরা দেখতে পাচ্ছো হিন্দুরা খুবই উজ্জীবিত ও উত্তেজিত। তারা সোমনাথ রক্ষায় জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত।
আমাদের সমস্যা হচ্ছে এখানকার শহরের ভেতরের কোন খবর আমাদের গোয়েন্দাদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। দুর্গের ভেতরের কোন খবরই আমরা জানি না। আল্লাহর দয়ায় আমরা যদি দুর্গে প্রবেশ করতে পারি তখনো আমরা ও বলতে পারব না দুর্গের কোথায় কি রয়েছে? আমাদের কেউ বলার নেই, ভেতরে কোন দিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ আসতে পারে? কোন দিক নিরাপদ? ই আর কোন জায়গা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? বাইরের কিছু খবর এবং তথ্য আমরা পেতে ও পারি এবং পাচ্ছি। এরই মধ্যে দুই মহারাজা তাদের সৈন্য সামন্ত নিয়ে সোমনাথের রাজাকে সাহায্য করতে আসছে। এরা পেছন থেকে আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে। আমাদের সেনাদের বিন্যাস সম্পর্কে আমি আগেই তোমাদের অবহিত করেছি। এবার আমি অন্যান্য ঝুঁকি ও আশংকা সম্পর্কে তোমাদের সৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
তোমরা অনভিজ্ঞ ও আনাড়ী নও। তোমরা নিশ্চয় জানো, নিজ দেশ থেকে এতোটা দূরে এসে যুদ্ধে আগ্রহী যেকোন বাহিনীকে প্রতিপক্ষ ইচ্ছা করলে অনাহারেই পরাস্ত করতে পারে। এখানকার মাটি, মানুষ সবকিছুই আমাদের বৈরী। এখানে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা কিংবা রসদ পাওয়ার সম্ভাবনা আমাদের নেই। যে তীরটা আমাদের কামান থেকে একবার বেরিয়ে যাবে, সেটির ঘাটতি পূরণের আর কোন ব্যবস্থা আমাদের নেই….।
এই সংঘর্ষ ও যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে রসদ ও জনবলের ঘাটতিতে পড়ে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হবো। আমি তোমাদের সতর্ক করে দিতে চাই, ব্যর্থ হয়ে যদি আমাদের পিছু হটতে হয় তাহলে আমাদের সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে আর শত্রু বাহিনী আমাদের পিছপা হতে দেবে না। পিছু হটলে আমাদের কারো পক্ষেই জীবন নিয়ে গযনী পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
পেরিয়ে আসা মরুভূমির কথা তোমরা ভুলে যেও না। প্রায় দুই মাস লেগেছে আমাদের এই দূরত্ব অতিক্রম করতে। তাই ব্যর্থ হয়ে পিছু হটা সৈন্যদের পক্ষে এই বিশাল মরু পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে না।
আমি জানি, তোমরা অনেকেই ভাবছো, গযনী থেকে এতোটা দূরে এসে এই দুর্গম শহরে যুদ্ধে নামা আমাদের উচিত হয়নি। এ ব্যাপারে আমি তোমাদের সাথে একমত। কিন্তু আশা করি আমার মতের সাথেও তোমরা একমত হবে। দীর্ঘ দিনের সাফল্য ও জীবনহানির পরও এই অভিযান ছাড়া আমাদের মিশন অসম্পূর্ণ থাকত। আমাদের কারো জীবনই তো আর সীমাহীন নয়? তোমরা জানো, আমি পৌত্তলিকতার এই বেদীমূলকে ভেঙে সাগরে নিক্ষেপ করতে চাই।
ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন সুলতান! আমি কি জানতে পারি, আমরা গোটা হিন্দুস্তানের সব মূর্তি কি ধ্বংস করে দিয়েছি যে, শুধু সোমনাথের মূর্তি রয়ে গেছে? এটাকে ভেঙে ফেললেই সব মূর্তি শেষ হয়ে যাবে? প্রশ্ন তুললো এক ডেপুটি সেনাপতি।
সোমনাথের মূর্তি ভেঙে ফেললে এবং সোমনাথ ধ্বংস করে দিলে কি হিন্দুদের মূর্তিপূজা শেষ হয়ে যাবে? হিন্দুস্তানের সকল হিন্দু কি মুসলমান হয়ে যাবে? এত দূরে আসার ঝুঁকি আমাদের নেয়া উচিত হয়নি সুলতান!
ডেপুটি সেনাপতির জবাবে প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ গর্জে উঠলেন। তিনি বললেন- আশা করি ডেপুটি সেনাপতি শত্রুদের ভয়ে ভীত হয়ে এসব কথা উত্থাপন করেননি।
সম্মানিত সেনাপতি! আমরা শত্রুদের সংখ্যা দেখে মোটেও ভীত নই। তারেক বিন যিয়াদ সম্পূর্ণ অজানা দেশে পাড়ি দিয়ে পিছু হটার সকল পথ বন্ধ করে দিতে সকল জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের কেউ শত্রুদের ভয়ে পিছু হটার চিন্তা করে বলে মনে হয় না।
আমি আমার হিন্দুস্তান অভিযানের শেষ পর্যায়ে এসে মাত্র কিছুদিন আগে জানতে পারি, সোমনাথের মূর্তিকে ভারতের হিন্দুরা সকল দেবদেবীর নেতা বলে বিশ্বাস করে বললেন সুলতান। আমি যদি ভারত অভিযানের শুরুতে সোমনাথের এই অবস্থার কথা জানতে পারতাম তাহলে আমার অভিযান সোমনাথ থেকেই শুরু হতো।
এ পর্যায়ে সুলতান মাহমূদ সোমনাথের অভ্যন্তরে কি কি অপকর্ম ঘটে এবং সোমনাথের হিন্দুরা সোমনাথকে কেমন পবিত্র স্থান মনে করে তা সবিস্তারে কমান্ডারদের জানালেন।
অবশেষে তিনি জানালেন, আমরা আজ এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে পিছু হটা সম্ভ। নয়। আমরা যদি আমাদের উপর আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব ভুলে যাই, তাহলে আমাদের লড়তে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য। তোমরা লড়াইয়ে অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। তোমরা জানো, যে সৈনিক জীবনের জন্যে লড়াই করে সে এগিয়ে যাওয়ার দিকে দেখে না, তার নজর থাকে পেছনের দিকে। আর স্বাভাবিক ভাবেই এমন যোদ্ধারা কখনো জীবন বাঁচাতে পারে না।
