দীর্ঘ একমাসে মরু এলাকা অতিক্রম করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে গয়নী বাহিনী পাটনা এলাকায় পৌঁছলো। এখানে প্রায় বিশ হাজার হিন্দু বাহিনী গয়নী বাহিনীর পথ রোধ করে দাঁড়াল। হিন্দুরা গযনী বাহিনীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানতো, তাই তাদের পুণ্য ভূমিকে বাঁচানোর জন্যে তারা জীবনবাজি রেখে লড়াই করলো। কিন্তু অবশেষে হিন্দুদেরই পতন ঘটলো।
এরপর বর্তমানে যে এলাকাটি আহমদাবাদ নামে পরিচিত সুলতান মাহমুদ সেখানে পৌঁছলেন। সুলতানকে তার অগ্রবর্তী দল ও গোয়েন্দারা খবর দিলো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সোমনাথের রাজার পক্ষে চতুর্দিক থেকে সাহায্যকারী দল আসছে। ফলে সোমনাথ পৌঁছানোর ব্যাপারটি সহজ হবে না।
গযনীর সৈন্যদের অবস্থা তখন খুবই করুণ। দীর্ঘ মরুভূমির কষ্টকর যাত্রাপথেও বার বার তাদের শত্রু বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয়েছে। যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্তেই তাদেরকে থাকতে হয়েছে সতর্ক। কষ্টকর দীর্ঘ পথ বিরামহীনভাবে কম খেয়ে কম ঘুমিয়ে অতিক্রম করায় গযনীর সৈন্যরা ভীষণ ক্লান্ত-অবসন্ন। কারো শরীরই যেনো আর চলতে চায় না। অপর দিকে হিন্দু সৈন্যরা তাজাদম। সতেজ উজ্জীবিত। তারা তাদের ধর্মও স্বাধীনতা রক্ষায় মরণত্যাগী। এ এলাকার মাটি মানুষ সবই তাদের সহযোগী। আর গযনী বাহিনীর জন্যে এখানকার মাটি মানুষ পরিবেশ পরিস্থিতি সবই বৈরী। তাছাড়া তারা জানে না কোথায় কি আছে?
অবস্থার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে সুলতান মাহমূদও তার ইতিহাসখ্যাত প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ ছিলেন দারুন উৎকণ্ঠিত। তাদের শরীর জানান দিচ্ছিল কাজটি ঠিক হয়নি। আর যে পারা যাচ্ছে না। তারা নিজেরাও তো যোদ্ধা। অন্যান্য যোদ্ধাদের অবস্থা কি তা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন। ফলে তাদের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো। ঐতিহাসিক ফরখী কাব্য করে তখনকার অবস্থা বলেছিলেন- গযনীর বিখ্যাত বীর বাহাদুর সৈন্যটিও তখন নিজের দুরবস্থা চেপে রাখতে অন্যকে উজ্জীবিত,ও সাহস যোগাচ্ছিল, আর একে অন্যকে সাহায্য করছিলো। দৃশ্যত তাদের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলো কিন্তু লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তারা ছিলো বিদ্যুতের মতো গতিময় আর বাঘের মতো ক্ষিপ্র।
সুলতান যখন জানতে পারলেন হিন্দুস্তানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সোমনাথ রাজার সাহায্যে সামরিক সাহায্য আসতে শুরু করেছে, তখন তিনি সাহায্য আসার সম্ভাব্য পথগুলো আটকে দিয়ে সৈন্যদেরকে সোমনাথের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। অবশ্য মরুভূমি পেরিয়ে আসার কারণে অশ্বারোহীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলো। সময়টা তখন ছিলো শীতকাল।
* * *
১০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি মোতাবেক ৪১৬ হিজরী সনের ৪ যিলকদ সুলতান মাহমূদ সোমনাথের নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছেন। সেখান থেকেই তাকে সোমনাথ অবরোধের প্রস্তুতি নিতে হলো। কিন্তু হিন্দুরা তাকে সোমনাথ অবরোধের সুযোগ না দিয়ে অবরোধ আরোপের আগেই প্রতিরোধ করতে বদ্ধপরিকর ছিলো। সুলতান মাহমূদ যথাসম্ভব নিজে এবং গোয়েন্দাদের সাহায্যে সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবনের চেষ্টা করলেন। সোমনাথ ছিলো বিশাল এক দুর্গ-বন্দী শহর। সোমনাথের তিন দিক বেষ্টন করে রেখেছিল সাগর। আর স্থলভাগের দিকে খনন করা ছিলো গভীর প্রতিরক্ষা খাল।
সুলতান খবর পেলেন, ইতোমধ্যে সোমনাথ রক্ষার জন্যে সোমনাথের বাইরের দুই হিন্দু রাজার সৈন্যরা এসে দুর্গের বাইরে যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। দুর্গের ভেতরে সৈন্যরা ছাড়াও সাধারণ লোকেরাও তীর, ধনুক ও বর্শা নিয়ে দুর্গ প্রাচীরের উপরে অবস্থান নিয়েছে।
শহরের অধিবাসীরা গযনীর সৈন্যদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে। শহরে হিন্দু পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা প্রচার করলো, গযনীর সুলতান অন্যান্য হিন্দু রাজা-মহারাজাদের পরাস্ত করতে পেরেছে তাদের প্রতি শিবদেব অসন্তোষ ছিলো বলে। এখন শিবদেব মুসলমানদেরকে টেনে হেঁচড়ে তার কোলে নিয়ে এসেছেন। তিনি এখন মূর্তিসংহারীদেরকে ধ্বংস করে দেবেন। সোমনাথ দুর্গ অবরোধকালে গযনীর সেনাদের উদ্দেশ্যে প্রাচীরের উপর থেকে শহরের লোকেরা বলছিলো, গযনীর পাপীরা! তোমরা মরতে এসেছে! সোমনাথ তোমাদের পাপের প্রতিশোধ নেবে।
বিরামহীন ভাবে মন্দিরের ঘণ্টা বাজছিল। দশ হাজার পণ্ডিত পালাক্রমে পূজায় লিপ্ত ছিলো। সুন্দরী যুবতী সেবাদাসীরা ভজন গাইছিল এবং নর্তকীরা উদ্দাম নৃত্যে মেতে উঠেছিল। শহরের সব মহিলা জড়ো হয়েছিলো মন্দিরে। সোমনাথের রাজা রায় কুমার কখনো দুর্গ প্রাচীরে আবার কখনো রাস্তায় নেমে শহরবাসীকে প্রতিরোধ যুদ্ধে উজ্জীবিত করছিলো। সোমনাথের নিকটবর্তী রাজ্যের রাজা পরমদেব তার সকল সৈন্য সামন্ত নিয়ে সোমনাথ রক্ষার জন্যে অনেক আগেই সেখানে এসেছিল।
হিন্দুদের উত্তেজনা, উৎসাহ ও উজ্জীবিত শক্তি দেখে সুলতান মাহমূদ গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি অনুভব করলেন, নিজেকে এবং গোটা গযনী বাহিনীকে তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করে ফেলেছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি যথা সম্ভব দ্রুত দুর্গ জয়ের পরিকল্পনা করতে লাগলেন।
তিনি প্রধান সেনাপতিকে বললেন, আবু আব্দুল্লাহ! আগামীকাল জুমআর দিন। আমি সকাল বেলায়ই আক্রমণ শুরু করতে চাই। সেনারা যাতে প্রস্তুত থাকে। তিনি আক্রমণের পরিকল্পনা সবিস্তারে প্রধান সেনাপতিকে বুঝিয়ে দিলেন। আলতাঈও চিন্তাগ্রস্ত। তার চেহারাই বলে দিচ্ছিলো, পরিস্থিতি মোটেও তাদের অনুকূলে নয়।
৫.৫ তারকার পতন ধ্বনি
আজ থেকে প্রায় এগারো’শ বছর আগে তৌহিদী মুসলিম ও পৌত্তলিকতাবাদী মূর্তিপূজারীদের মুখোমুখি সংঘর্ষে সোমনাথ দুর্গের প্রাচীরগুলো কাঁপছিলো। দুর্গের ভেতরে ছিলো হরি-হরিদেবের পূজারীদের ঔদ্ধত্য হুংকার । আর দুর্গের বাইরে ছিলো তৌহিদের জন্য আত্মনিবেদিত গযনী যোদ্ধাদের তাকবীর ধবনি। অবস্থা এতোটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিলো যে, গোটা হিন্দুস্তানই যেন পৌত্তলিকদের জয়ধ্বনি আর তৌহিদের তাকবীর ধ্বনীতে কেঁপে ওঠছিলো। সেদিন সন্ধ্যার পর সুলতান মাহমূদ তার সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের জড়ো করলেন। তিনি সবার চেহারার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন
