সুলতান মাহমূদ তার ভাষণে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন-বিন কাসিমের কথা। তিনি বললেন, মুহাম্মদ বিন কাসিম কতো দূর থেকে কতো কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে হিন্দুস্তান এসেছিলেন। সুলতান বললেন, সোমনাথ মন্দিরে তোমাদের মতো মুসলমানদের ধরে এনে নর বলি দেয়া হয়। মুসলমান তরুণীদের অপহরণ করে সম্ভ্রম লুটে নেয় হিন্দু পণ্ডিতেরা। তাদেরকে সেখানে নগ্ন করে নাচতে বাধ্য করা হয়। মুসলিম তরুণীদের ধরে এনে হিন্দুরা সব ধরনের পাশবিকতার চর্চা করে। এসবের কথা শোনার পরও তোমাদের মনে কি স্বজাতির কন্যা জায়াদের সম্ভ্রম ও জীবন হানির এই পৈশাচিক আখড়া নির্মূল করতে কোন প্রকার দ্বিধা থাকবে? তোমাদের ঈমানী চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধ কি এসব কাণ্ডে সায় দেবে?
সুলতান-নাসিরও শেগুপ্তার ঘটনা সৈন্যদের শুনিয়ে বললেন, সেই নিরপরাধ কুমারী মেয়েটি হায়েনাদের আক্রমণ থেকে নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে কূপে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। সেই মেয়েটির আত্মা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। আমি এই নিরপরাধ মুসলিম তরণীর জীবনহানির প্রতিশোধ নিতে চাই।
সুলতান মাহমূদের বক্তৃতা এতোটাই আবেগঘন ও অনুপ্রেরণামূলক ছিলো যে, গোটা সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে পড়লো, তাকবীরের পর তাকবীর ধবনিতে গোটা ময়দান কেঁপে উঠলো। সৈন্যদের উজ্জীবিত করাই ছিলো সুলতানের উদ্দেশ্য। তাতে তিনি সফল হলেন। পথের দুর্গমতা, কষ্ট ও সম্ভাব্য বাধা প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়ে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সোনাদের তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিলেন।
* * *
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ তার সেনাদের এভাবে রওয়ানা করালেন যে, তার প্রথম সৈনিক থেকে সর্বশেষ সৈন্যের অবস্থানের দূরত্ব ছিলো প্রায় একশো মাইল। যখন তিনি মরু এলাকায় প্রবেশ করলেন তখন বুঝতে পারলেন, তিনি যাত্রাপথ সম্পর্কে এর আগে যথেষ্ট তথ্য সগ্রহ করলেও তাকে যে ধারণা দেয়া হয়েছিলো বাস্তব অবস্থা এর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুলতান অনুভব করলেন, প্রকৃতপক্ষে তার লোকেরা যাত্রাপথের বিপদসংকুল অবস্থার কথা মোটেও বুঝে উঠতে পারেনি।
গযনী সেনারা যখন বিকানীর মরুভূমিতে পৌঁছলো, তখন রিজার্ভ সৈন্যদের পাহারা দেয়ার জন্যে ডানে বামে যে সৈন্যরা ছিলো, রাতের বেলায় তাদের উপর শত্রু সেনারা গেরিলা আক্রমণ চালালো। কিন্তু হিন্দুরা জানতো না গযনী বাহিনীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা আগে থেকেই নিয়ে রেখেছেন সুলতান মাহমুদ। বিভিন্ন দলে বিভক্ত গযনী বাহিনীর মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান ছিলো। কোন এক ফাঁকে বিশাল এলাকা নিয়ে অগ্রসরমান গযনী বাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়লো শত্রু বাহিনী এবং তারা উট ইউনিটে আক্রমণের প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু এর আগেই এদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললো সুলতানের অশ্বারোহী বাহিনীর নিরাপত্তা দল। সকল শত্রু সেনাকে হামলার আগেই হত্যা করলো গযনীর ঝটিকা বাহিনী।
গযনী বাহিনী যখন পাহাড় ও ঘন টিলাময় এলাকায় পৌঁছলো তখন দিনের বেলায় হিন্দুদের তীরন্দাজ বাহিনীর তীব্র আক্রমণের শিকার হলো। হিন্দুরা টিলার আড়াল থেকে একযোগে তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলো। তাতে গযনী বাহিনীর বেশ কিছু সওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
উটের গায়ে তীরবিদ্ধ হলে উটগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে এলোপাথাড়ী দৌড়াতে লাগলো। হিন্দুরা মনে করছিলো, তাদের পেছন থেকে আক্রমণের আশংকা নেই। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে হিন্দুরা পিছন দিক থেকে আক্রমণের শিকার হলো। সংঘর্ষে কিছু হিন্দু মারা গেলো আর কিছু ধরা পড়লো। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সুলতান জেনে নিলেন, পথিমধ্যে আর কোন কোন জায়গায় হিন্দুরা ফাঁদ পেতে রেখেছে? এদের কথামতো তিনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন।
তৎকালীন ঐতিহাসিকদের ধারণা মতে, সুলতান মাহমূদকে তখন অন্তত পাঁচশ মাইল মরু এলাকা পাড়ি দিতে হয়েছিলো এর মধ্যে কয়েকটি ছোট বড় নদীও ছিলো। দীর্ঘ মরু এলাকার কোথাও সবুজের কোন চিহ্ন ছিলো না। ঘোড়াগুলোকে সচল রাখতে দানাদার শুকনো খাবার ও শুকনো ঘাস খাওয়াতে হতো। ফলে ঘোড়াগুলোর জন্যে অনেক বেশি পানির প্রয়োজন হতো। আর মরুভূমির তপ্ত হাওয়ায় অল্পতেই ঘোড়া তৃষ্ণার্ত হয়ে দুর্বল হয়ে যেতো। কিন্তু উটের কোন সমস্যা হতো না। বেশি সমস্যা হচ্ছিল পদাতিক বাহিনীর। তারা এগুতে পারতো না। বালুতে পা দেবে যেতো। মরুভূমি অতিক্রমের পর সর্বপ্রথম লুথোরাওয়া শহরে গমনী বাহিনীকে শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হতে হলো। হিন্দুরা পূর্বেই খবর পাওয়ায় তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। মরু পাড়ের এই শহর ছিলো বিশাল এবং বারো ফটক বিশিষ্ট। সুলতান শহর অবরোধ করে এমন তীব্র আক্রমণ চালালেন যে, শহরের লোকেরা ঘাবড়ে গেল। বশ্যতা স্বীকার করে সাদা পতাকা উড়িয়ে শহরের দরজা খুলে দিল।
সুলতান বিজিত শহর থেকে তার প্রয়োজনীয় পানি ও অন্যান্য রসদের ঘাটতি পূরণ করে নিয়ে আবার সোমনাথের দিকে রওয়ানা হলেন। অবশ্য মরু এলাকায় বেশ কয়েকটি জায়গায় গযনী বাহিনী শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সবগুলোতেই শত্রুবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছে। অবশ্য গযনী বাহিনীরও অল্পবিস্তর ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
