কর্মকর্তা হিন্দুদের আরো পরামর্শ দিয়েছিলো, হিন্দুরা যেনো সবসময় গযনী সেনাদের হয়রানীর মধ্যে রাখে এবং উটগুলোকে মেরে ফেলতে বেশি করে তীর ছুঁড়ে। গযনী বাহিনী আরো কিছুটা অগ্রসর হলে স্থানীয় অধিবাসীর পরিচয় দিয়ে সুলতানের কাছে অনুরোধ করবে, তারা গযনী বাহিনীকে সংক্ষিপ্ত পথে সোমনাথ নিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে চায়। এটি ছিলো সুলতানকে বিভ্রান্ত করার ভয়াবহ চক্রান্ত যা ইতোপূর্বে হাভেলীর অভিযানে ঘটেছিলো।
সুলতান চক্রান্তকারীদের মুখ থেকে সকল চক্রান্তের কথা শুনে, তার স্থানীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন, এই চক্রান্তের সাথে যারা জড়িত, তাদেরকে খোঁজে বের করে একটি ঘরে আমৃত্যু আটকে রাখবে। মৃত্যু হলে তাদের মরদেহগুলো বাইরে ফেলে দেবে। এগুলোকে সম্মানে দাফন করার প্রয়োজন নেই। এদেরকে আল্লাহ তা’আলা কেয়ামতের দিন এসব কাফেরেদের সাথেই উঠাবেন।
গাদ্দার কর্মকর্তা সম্পর্কে সুলতান নির্দেশ দিলেন, সেনবাহিনী সোমনাথ রওয়ানা হওয়ার সময় একে একটি শক্তিশালী ঘোড়র সাথে হাত পা বেঁধে রশিতে আটকে দেবে। হেঁচড়ে হেঁচড়ে বেঈমানটা যখন মরে যাবে তখন ফেলে দেবে।
ফরখী ছিলেন সুলতান মাহমূদের সময়ের রাজ কবি। এই কবি সুলতান মাহমূদের সোমনাথ অভিযানের সঙ্গী ছিলেন এবং গোটা অভিযান সম্পর্কে তিনি একটি দীর্ঘ কাব্য রচনা করেছিলেন। তার সেই কাব্যে বর্ণিত হয়েছে সুলতান মাহমূদের কাছে যখন এই ভয়াবহ চক্রান্ত ফাঁস হয়ে গেলো তখন ছিলো রমযান মাস।
সেই রাতে তারাবিহ’র নামাযের পর দীর্ঘ সময় তিনি নফল ইবাদতে মগ্ন রইলেন। সকাল বেলা তার একান্ত সঙ্গীদের বললেন, আল্লাহ হয়তো আমার দ্বারা বড় কোন কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করাতে চান। এজন্যই তিনি রাতের অন্ধকারে আমাকে আলোর দিশা দেখিয়েছেন, নয়তো রাতের আঁধারে এই কেউটে সাপগুলো আমাকে ছোবল দিতো।
পরিস্থিতি ও পথ পর্যবেক্ষণকারী অগ্রবর্তী দল গোটা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে সুলতানকে জানালো- পথিমধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি করবে পানি। দীর্ঘ পথের মধ্যে পানি খুবই দুষ্প্রাপ্য।
পানির সংকট মোকাবেলা করতে সুলতান মাহমূদ সোমনাথ রওয়ানা হওয়ার আগে ত্রিশ হাজার উট সংগ্রহ করে সবগুলোতে পানি বোঝাই করেছিলেন। কারণ পথিমধ্যে শুধু সেনাবাহিনী নয় মাল বহনকারী উট ও ঘোড়াগুলোকেও পানি পান করাতে হবে। এজন্য প্রত্যেক অশ্বারোহীর জন্যেই একটি করে পানি বোঝাই উট বরাদ্ধ করা হয়েছিলো। পানি বোঝাই উট ছাড়াও প্রত্যেক সৈন্যের প্রতি নির্দেশ ছিলো, তারা প্রত্যেকেই যেনো যথাসাধ্য পানি নিয়ে নেয়।
সুলতান মাহমূদ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। কারণ, পথিমধ্যে হিন্দু রাজা মহারাজারা তার বাহিনীর ক্ষতিসাধন করবে এ খবরটি তিনি আগাম জানতে পেরে আগেই সতর্ক প্রস্তুতি নিতে পেরেছেন তিনি।
হিন্দুদের চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ার ফলে সুলতান আরো বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে গতিপথ আগেই নির্ধারণ করে নিলেন এবং সেনাবাহিনীকে নতুন ভাবে বিন্যাস করলেন।
তিনি অগ্রবর্তী বাহিনীকেও বিভিন্ন অংশে ভাগ কর দিলেন। অগ্রবর্তী বাহিনীকে পাহারা দিয়ে নেয়ার জন্যে তাদের দু’পাশে নিয়োগ করলেন ভিন্ন ভিন্ন ইউনিট। এরপর রাখলেন ঝটিকা বাহিনী। যারা থাকবে মূল বাহিনী ও অগ্রবর্তী বাহিনীর মাঝখানে। তবে তারা ডানে বামে মূল সেনাবাহিনী থেকে অনেক দূরে থাকবে। যাতে শত্রু বাহিনীকে মূল বাহিনীর ধারে কাছে আসার অনেক আগেই আটকে দেয়া যায়। রসদ ও পানিবাহী ইউনিটকে অগ্র পশ্চাত ডানে বামে শক্ত পাহারা দিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। রাতের বেলায় চলন্ত অবস্থায় বা যাত্রা বিরতিতে গোটা রাত ব্যাপী চতুর্দিকে সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা করা হলো।
গযনী বাহিনীর তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিলো। প্রথমত এই বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন স্বয়ং সুলতান মাহমূদ। যার সামরিক দূরদর্শিতা ছিলো বিশ্বখ্যাত। দ্বিতীয়তঃ গয়নী বাহিনীর ঝটিকা ইউনিটের সদস্যরা ছিলো সত্যিকার অর্থেই জানবাজ এবং মেধাবী। তৃতীয়ত: প্রতিটি সৈনিক তাদের নেতার জন্যে নয়, ইসলামের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যুদ্ধ করতো। তাদের সামরিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট ছিলো নিষ্ঠা। খুব দ্রুত এবং নিষ্ঠার সাথে প্রতিটি নির্দেশ পালিত হতো।
৪১৬ হিজরী সনের ১২ই শাওয়াল মোতাবেক ১০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর। ঈদুল ফিতরের দু’দিন পর সুলতান মাহমূদ মুলতান থেকে সোমনাথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাযে মূল খুতবার আগে সুলতান সকল সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, প্রিয় ভাইয়েরা! তোমাদের সবাইকে আমি ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মন থেকে তোমরা এ ভাবনা দূর করে দাও নিজ মাতৃভূমি থেকে বহু দূরের এক দেশে আমরা ঈদ উদযাপন করছি। যে যমীনে মুজাহিদদের রক্ত প্রবাহিত হয়েছে সেই যমীন সকল মুসলমানের । যে যমীনে মুজাহিদের আযান ধ্বনিত হয়েছে সেই জায়গা মুসলমানের আপন ভূমি। এই হিন্দুস্তান কাফেরদের তালুক নয় এতে আমাদেরও অধিকার আছে। হয়তো বা এই ঈদ আমাদের কারো কারো জীবনের শেষ ঈদ। আমরা এমন এক অভিযানে যাচ্ছি যা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের জন্যে অন্তিম পরীক্ষা। হিন্দুরা বলাবলি করছে, মুসলমানরা ধ্বংস হওয়ার জন্যই সোমনাথ যাচ্ছে। তোমাদেরকে এখন এমন এক মূর্তি ধ্বংস করতে হবে হিন্দুরা যেটিকে শক্তি দেবতা হিসেবে পূজা করে। তোমাদেরকে সেখানে প্রমাণ করতে হবে, শক্তির মালিক আল্লাহ! পাথরের মূর্তি কাঠামোগতভাবে শক্ত হতে পারে। কিন্তু এর নিজস্ব কোন শক্তি নেই। হিন্দুদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করতে হবে।
