* * *
অভিযানকারীরা অপরাধের আলামত স্বরূপ শাবের সুরাহী, মুদ্রাভর্তি থলে এবং অর্ধ নগ্ন দুই তরুণীসহ গ্রেফতারকৃত হিন্দুদেরকে সুলতানের সামনে পেশ করলো। সুলতান মদের সুরাহী, থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা, দুই তরুণীর দিকে চোখ বুলালেন। তারপর ছয় বছর ধরে মুলতানে কর্মরত কর্মকর্তার প্রতি তাকালেন। তার মুখ থেকে তখনো শরাবের গন্ধ বেরুচ্ছিলো। অভিযানকারীরা নক্সা আঁকা কাগজটি সুলতানের হাতে তোলে দিলো।
তুমি যদি আনাড়ি হতে, বয়স কম হতো, মূর্খ হতে তাহলে আমাকে বলতে হতো, তুমি কি অপরাধ করেছো- ধৃত কর্মকর্তাকে বললেন সুলতান।
তুমি কি করেছে এবং কি কাজে লিপ্ত হয়েছিলে এর পরিণতি কি হতে পারে এটা তুমি জানো। আমি আশা করবো, তুমি সবকিছু খোলাখুলি বলে দেবে। তোমার অপরাধ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তুমি অমার্জনীয় অপরাধ করেছো। তুমি শুধু সালতান, তে গযনীর বিরুদ্ধাচরণ করোনি, আমার বিরোধিতা করোনি, তুমি ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এই অপরাধের কি শাস্তি হতে পারে সে সম্পর্কেও তুমি ওয়াকিবহাল। এখন তুমি ঈমানকে নিলাম করে যা কিছু অর্জন করেছে, তা সবিস্তারে বলে ফেললো। আল্লাহ হয়তো তোমাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
যদি না বলো, তাহলে তোমাদের মতো লোকদের কাছ থেকে কিভাবে কথা বের করতে হয় তা যে আমাদের জানা আছে তা তুমি ভালোেই জানো। তুমি যাদের সাথে আঁতাত করেছে, আমার হাত থেকে তোমাকে বাঁচানোর ক্ষমতা তাদের নেই। এসব সুন্দরী নারী, মুদ্রার থলে আর শরাবের সূরাহী আল্লাহর পাকড়াও থেকে তোমাকে মুক্তি দিতে পারবে না।… বলো ।
সুলতানের কথা শেষ হতে না হতেই সেই বেঈমান কর্মকর্তা সুলতানের পায়ে পড়ে মাথা তার পায়ে রেখে দিলো।
সুলতান দ্রুত তার পা সরিয়ে নিয়ে বললেন- সরে যাও, তোমার নাপাক শরীর আমার পায়ে লাগাবে না। আমি অযু অবস্থায় থাকি, আগামীকাল রোযা রাখবো।
ধৃত হিন্দুদের দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুলতান বললেন- তোমরা কি করছিলে? দেরি না করে দ্রুত বলতে থাকো। এটাই হবে তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তরুণীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এদেরকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি কক্ষে আটকে রাখো।
হিন্দুদের একজন হাত জোড় করে আবেদন করলো- মহারাজ সুলতান! এই তরুণীদের একজন আমার মেয়ে। আর অন্যজন একজন সম্মাণিত ব্যক্তির কন্যা। এদের কোন অন্যায় নেই।
তোমাদের কি জোর করে সেই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো? তরুণীদের জিজ্ঞেস করলেন সুলতান। তোমরা কি জানতে কি করতে হবে তোমাদের?
হ্যাঁ, জানতাম আমরা। দৃঢ়কণ্ঠে বললো এক তরুণী। আমাদেরকে জোর করে সেখানে নেয়া হয়নি। এতে আপনি মনে করবেন না, দেহব্যবসা আমাদের পেশা। আমরা অভিজাত ঘরের মেয়ে। আমরা ধর্মের সেবিকা। আমরা যা করেছি, ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করেছি। আমরা আমাদের সেইসব ধ্বংস প্রাপ্ত মন্দিরগুলোর প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নিয়েছি, যেসব মন্দির আপনি ধ্বংস করেছেন।
তরুণীর কথা শুনে সুলতানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি সেই কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে ভর্ৎসনা মাখা কণ্ঠে বললেন- আমি অধিকাংশ হিন্দুস্তান জয় করেছি, বহু রাজা মহারাজাকে পরাজিত করেছি, হিন্দুদের দেবদেবীদের ভেঙেচুড়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছি। আমার যোদ্ধারা এদের কথিত দেবতাদেরকে পরাজিত করে পদদলিত করেছে; কিন্তু এই অবলা তরুণীদের কাছে তুমি আত্মসমর্পন করে গোটা জাতিকে পরাজিত করার চক্রান্ত করেছো? ছিঃ তোমার মতো নরাধমকে মাটিতে মিশিয়ে দিলেও উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে না।
আমরা এমন জাতির নারী যে জাতির মেয়েরা স্বামীর মৃত্যুতে নিজেদের স্বতীত্ব প্রমাণ করতে জ্বলন্ত চিতায় আত্মহুতি দেয়। নিজের ধর্ম, জাতি ও দেশের প্রয়োজনে আমরা দেহ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করি না, বরং দেশ, জাতি ও ধর্মের জন্য নিজের দেহ ব্যবহারকে আমরা গর্বের বিষয় মনে করি। বললো অপর তরুণী।
এই পৃথিবীতে ইসলাম থাকতে পারবে শা, থাকবেও না। এটাই আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের ধর্মীয় পুরোহিতরা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন- তোমাদের শরীরটাকে একটি লোভনীয় বিষ মনে করে তা দিয়ে শত্রুদের ঘায়েল করো । আপনার কাছে আমাদের একটাই আবেদন, যত দ্রুত সম্ভব আমাদেরকে হত্যা করে ফেলুন, আমাদের কষ্ট দিয়ে হত্যা করবেন না।
আমি তোমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি, নিজ ধর্মের প্রতি ও নিজ জাতির প্রতি তোমাদের প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতার জন্যে। তোমরা সত্যিই তোমাদের জাতি ও ধর্মের জন্যে আত্মনিবেদিতা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার উপর যে ধর্মের ভিত্তি গড়ে উঠেছে এমন ধর্মের মেয়েরা অশ্লীলতা ও সম্ভ্রম বিক্রি করাকে গর্বের বিষয় মনে করবে এটাই স্বাভাবিক। আমি কথা দিচ্ছি- তোমাদের আবেদন রক্ষা করবো…।
* * *
গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তা ও ধৃত হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা সুলতানের কাছে তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবকিছু স্বীকার করল। গযনীর কর্মকর্তাকে চক্রান্তকারীরা হাত করে নিয়েছিলো। ফলে এই কর্মকর্তা হিন্দুদের জানিয়ে দিয়েছিলো, সুলতান মাহমূদ সোমনাথ আক্রমণ করতে যাচ্ছেন এবং তার নির্দেশে গযনীর সেনারা গতিপথ নির্ধারণের জন্যে সেদিকে গেছে।
* * *
চক্রান্তকারী এই গোষ্ঠির হিন্দু নেতারা বিভিন্ন রাজা মহারাজা ও সোমনাথ কর্তৃপক্ষের কাছে আগাম প্রস্তুতির খবর পাঠিয়ে দিয়েছে। ঈমান বিক্রেতা সেনাকর্মকর্তা হিন্দুদের জানিয়ে দিয়েছে, গযনী বাহিনী যখন ভাওয়ালপুর, অতিক্রম করে বিকানির ময়দানে পৌঁছবে তখন তাদের উপর রাতের অন্ধকারে যেনো গেরিলা আক্রমণ করা হয় এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
